শারদ
সংখ্যা


তরুণ কবি সম্পাদক প্রকাশক ও সংগঠক সৌরভ বিশাইয়ের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সূর্যকান্ত জানা


সৌরভ বিশাই, বার্তা প্রকাশন, শব্দসাঁকো, সাক্ষাত্কার, interview


সৌরভ বিশাই : জন্ম ১৭ এপ্রিল ১৯৯৬, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভূমিপুত্র। মূল পরিচয় ‘শব্দসাঁকো’ পত্রিকার সম্পাদক রূপে। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বার্তা প্রকাশন’, যা তরুণদের বইপ্রকাশের জনপ্রিয় মঞ্চ। প্রথম লেখা প্রকাশ বিদ্যালয়ের দেওয়াল পত্রিকায়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ‘নাছোড়বান্দা ইন্তেজারি’ (২০১৭), ‘সৎসঙ্গের সামনে অসৎ ছেলের সংলাপ’ (২০১৮), ‘বিন্দি পরা বান্ধবীকে’ (২০১৯), ‘মন্দসুখে সর্বনাশী’ (২০২০), ‘ঘুমিয়েছে চুপ ক্ষতের শহর’ (২০২১), ‘সবাইকে থেকে যেতে নেই’ (২০২২)।


পুরস্কার সম্মাননা : কচিপাতা, অন্বেষা, কবিতা কুটির, আন্তরিক, যুগ সাগ্নিক, নন্দিনী সহ নানান সংস্থার তরফ থেকে যুব সম্পাদক কখনও তরুণ প্রকাশক হিসেবে বেশ কিছু সম্মাননা পেয়েছেন।

বাংলার তরুণদের সবথেকে বড় সাহিত্য শিল্প উৎসব SMLM-এর নির্দেশক পদে বর্তমানে বহাল রয়েছেন।



শুভদীপ মন্ডল, সৌরভ বিশাই, khonjporibar, sharod sonkhya
অলঙ্করণ : শুভদীপ মন্ডল 




খোঁজ : কবিতা লেখা কবে থেকে শুরু এবং তা কীভাবে?

বিশাইবাবু : প্রথমে যা লিখেছিলাম তা হল গল্প। সেটা ২০০৭ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে, গল্পটি রিজেক্ট হয়। তারপর আনন্দমেলায় প্রথম লেখা বের হয়, ২০১১ সালে। সেটি একটি গল্প। তারপর নিজে একটা পত্রিকা বের করি যার নাম ‘আগমনী’ ‌। তার দু'বছর পর আগমনী নাম চেঞ্জ করে হয় ‘বার্তা’ এবং সেটা ষাণ্মাসিক ছিল ৬ মাস অন্তর অন্তর বের হতো। তারপর কলেজে পড়ার সুবাদে, যখন কলকাতায় আসি তখন দেখি বার্তা নামে আরেকটা পত্রিকা আছে তখন নাম চেঞ্জ করে পত্রিকার নাম ‘শব্দসাঁকো’ রাখি। তখন ২০১৪ সাল। ‘বার্তা প্রকাশন’ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ৯ জানুয়ারি মেদিনীপুর লিটল ম্যাগাজির মেলায়।



খোঁজ : মফঃস্বল জেলা শহর থেকে রাজধানীতে সাহিত্য চর্চার ভাবনা কীভাবে হলো, সেই জার্নি কেমন ছিল?

বিশাইবাবু : কবিরা বারবার বলছেন গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার কথা, তরুন রক্ত তো একটা জেদ থাকবেই, অদ্ভুত একটা জেদ। কোন মানুষ সেটা ভালোর পথে নিয়েছে, কোন মানুষ সেটা খারাপের পথেও নিয়েছে। আমি নিয়েছি সেটা সাহিত্য সংস্কৃতির পক্ষে। আমি কলেজে পড়ার জন্য কলকাতায় এলাম তখন অনেক সাহিত্যিক অনেক কবিদের সাথে পরিচিত হলো। যেমন কবিতা পাক্ষিক এর প্রভাত চৌধুরী, পেয়েছি সুধাংশু শেখর দে এর, সান্নিধ্য পেয়েছি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর। যাদের সঙ্গে সান্নিধ্য লাভ করেছি বুঝেছি যে তাদের ভাব ভাবনা চিন্তনের সাথে আমার কোথাও যেন একটা মিল আছে বা সেটা আরো বিস্তার লাভ করেছে। এখানে মনে হয় যে মফস্বল থেকে শুধু উঠে আসা ছেলের ক্ষেত্রে শুধু সাহিত্যের শুধু সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ নয় সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা বোধয় আছে। তখন ওই সালটা ২০১৫ সালের আগস্ট মাস হবে, যখন বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হলাম। ধীরে ধীরে ধ্যান বিন্দুতে আড্ডা একটু একটু করে লিটল ম্যাগাজিন গুলোকে চিনতে শেখা। আমি যখন যাদের কাছ থেকে সান্নিধ্য পেয়েছি তাদের কাছ থেকে প্রচুর কিছু শিখেছি। সাহিত্যিক কবিদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে অনেক প্রথিতযশা। তারা বলেছেন যে ভালো আছে মন্দও আছে, তোমরা ভালোটাই আহরণ করো বেশি। আমি কেমিস্ট্রি স্টুডেন্ট হলেও আমার কিন্তু সাহিত্যের প্রতি ভালো লাগাটাই বেশি ছিল তাই আমার আড্ডা ছিল কলেজস্ট্রিট চত্বরে।



খোঁজ : আপনার জীবনে প্রথম কবি কে?

বিশাইবাবু : আমি মূলত আমি মূলত দু'তিনজন কবির লেখার দ্বারা বা কবিতার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে। অবশ্যই আমি রবীন্দ্রনাথকে এই সেই বৃত্তের বাইরে রাখছি কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে লেখা, তার ধারে কাছে যেতে পারবো না। মূলত তিনজন কবির নাম বলছি, তারা হলেন মনিন্দ্র গুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং জীবনানন্দ দাশ। আরেকজনের নাম না বললেই নয় তিনি হলেন ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়। এই যে চারজন কবির নাম বললাম প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা। তাদের কবিতা পড়ে মনে হয়েছে কবিতাই যেন শীর্ষ সাহিত্য।



খোঁজ : লেখক-সম্পাদকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, লেখা নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলে?

বিশাইবাবু : যখন লেখা নির্বাচন করি তখন অবশ্যই তার গুণগতমান বিচার করি এবং আমি যেহেতু প্রকাশনা করি তখন তার বইয়ের বিপণন কি হবে তার বইয়ের ভবিষ্যৎ কি হতে পারে সে দিকটাও আমার মাথায় রাখতে হয়। সম্পাদক হিসেবে যখন লেখা দেখি সেটা অবশ্যই আমাকে বাণিজ্য দূরে রাখতে হয় তার গুণগত মানের প্রতি আমার সব সময় দৃষ্টি থাকে।



খোঁজ : লেখা নির্বাচনের সময় বানান ভুল না ব্যাকরণ কোনটি বেশি বিরক্ত করে?

বিশাইবাবু : একটা উদাহরণ দিয়েই বলছি। এই শব্দসাঁকো শারদ সংখ্যায় প্রায় দুই হাজারের উপর লেখা এসেছে, তাই লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা যেটা প্রথম মাথায় রাখি সেটা হল নির্ভুল বানান। কারণ বাংলা ভাষাকে আমরা যদি মা মনে করি তাহলে এ বানান ভুলের কারণে আমরা চাইবো না আমাদের মায়ের সম্মান ক্ষুন্ন হোক। মোটকথা আমরা মায়ের পরিপাটি রূপ নির্বাচন করব। বাংলা ভাষা আমরা যদি মা মনে করি তাকে আমরা নিশ্চয়ই ভুল পরিবেশনায় ফেলবো না। ধরলাম দিঘি বানান দিঘি, সুতরাং আমরা এই বানানটি বেছে নেব যা একাডেমি থেকেও গ্রাহ্য। হ্যাঁ এইটা ঠিক আজকালকার জেনারেশনের মধ্যে এটা দেখা যাচ্ছে পড়াশোনা কম উচ্চাশা বা বাতেলা একটু বেশি। একটা কথা রয়েছে যদি ভালো লেখক হতে হয় তাহলে তাকে অবশ্যই একজন ভালো পাঠক হতে হবে। কমা, পূর্ণচ্ছেদ, যতি চিহ্ন এইসব সবকিছু ঠিকঠাক থাকতে হবে। যদি এরকম ভুল ব্যাকরণ বা ভুল বানান থাকে তাহলে আমরা সেগুলো বাদ দিয়ে লেখা নির্বাচন করি।



খোঁজ : গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ইত্যাদির অনুপাতে কবির সংখ্যা বেশি কেন?

বিশাইবাবু : এই কিছুদিন আগে একটা অনুষ্ঠানে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বলেছিলেন যে আমরা যদি আমাদের হাতের কাছ থেকে একটা কোন ঢিল ছুঁড়ি তাহলেও কোনো না কোনো কবির গায়ে লাগবে। কবির সংখ্যায় এতটাই। এক্ষেত্রে বলি কবিতা কাকে বলে তুমি কিন্তু নির্বাচন করতেই পারবে না। আমি তোমাকে ভালবাসি এটাই হয়তো কোন মানুষের জীবনে শ্রেষ্ঠ কবিতা। সে হয়তো এই কথাটি তার প্রেমিকাকে বলেছে সে হয়তো প্রথাগতভাবে কোন কবিতাই লেখেনি, কিন্তু কবিতার পাঠক। এক্ষেত্রে ওই লাইনটি কিন্তু একটি কবিতা। সুতরাং কবিতা কি! কবিতার সংজ্ঞায় যেহেতু ঠিক হয়নি সুতরাং কাকে কবি বলবো কাকে বলবো না সেটা নিয়ে বিস্তার প্রশ্ন আছে। ওই যে মহাপৃথিবীর সম্পাদক শম্ভূ রক্ষিত বলে গেছেন যে “কে কবি আর কে কবি নয় তা আমরা নিজেরাই জানি না”। আবার জীবনানন্দও নিজের পয়সা দিয়ে বই ছাপিয়ে গেছেন তখন কি মানুষ জানত সেটা কবিতা কী না ! অনেক সময় দিতে হয় অনেকটা ভাবতে হয় বলাই যায় যেটা প্রবন্ধ বা উপন্যাস কিন্তু কে কবি নির্বাচন করা খুবই কঠিন। যেহেতু কবিতার সংজ্ঞা নেই, তাই কবির সংখ্যা বেশি হবেই। আমাদের চেতনার প্রথম থেকেই ছন্দ কবিতার প্রতি আগ্রহ থাকে এই যে ধরো আমি আর তুমি এই যে কথোপকথন করছি এই সময় কোন প্রেমিক তার প্রেমিকার খোঁপায় ফুল গুঁজে দিয়ে বলছে আমি তোমাকে ভালোবাসি এটাই হয়তো তার কাছে কবিতা। আমি একবার জয় গোস্বামীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মহাশয় আপনার কোন কোন কবিতা গুলো একটু ভালো বলবেন, উত্তরে তিনি বলেছিলেন কোন কবিতা কেন, আমি যদি দুটো লাইন ঠিক বলতে পারতাম বা লিখতে পারতাম তাহলে হয়তো আর কোন লেখারই প্রয়োজন হতো না আমার। সুবোধ সরকারের একই কথার উত্তর ছিল, - এই জীবনে সেরা একটি লাইন যেদিন লিখে ফেলবো তারপর থেকে আর কবিতা লিখব না। সুতরাং সেই লাইনেরই খোঁজ চলছে।



খোঁজ : কেউ কেউ অভিযোগ করেন, যে পত্রিকায় যত বেশি সংখ্যক লেখকের লেখা ছাপানো যায় সেই পত্রিকার প্রচার ও আর্থিক স্বচ্ছলতা তত বেশি। আপনি একজন সম্পাদক হিসেবে কী বলবেন?

বিশাইবাবু : সম্পূর্ণ বাজে কথা এবং মানুষের ভ্রান্ত ধারণা আমি মনে করি না এর কোন ভিত বা ভিত্তি আছে। তাহলে ধরো আমি প্রথম শ্রেণীর ম্যাগাজিন সেটা দেশ পত্রিকা। দেশ পত্রিকা হাতে গুনতি একটা সীমিত ছাপানো হয় তাহলে সে পত্রিকা গুলো সমাদৃত নয়! দেশ পত্রিকা কিন্তু ৪ থেকে ৫ হাজার কপি বিক্রি হয়। ব্যাপারটা হচ্ছে এগুলো খুব বোকা বোকা টাইপের ভাবনা মানুষের আমার যদি লেখার ভাব এবং চিন্তাভাবনা অন্য ধরনের হয় এবং তা পাঠকের কাছে সমাদৃত হবেই। প্রতিটা পত্রিকায় নির্দিষ্ট একটা চরিত্র আছে আমি যেহেতু লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন করে উঠে আসে একটা ছেলে, যেখানে প্রায় ২৭ হাজারের বেশি ম্যাগাজিন আছে সেখানে জেনে রাখা দরকার একটা পত্রিকার চরিত্র নির্ধারণ হয় সেই পত্রিকার সম্পাদকের চিন্তন মনন এবং বিচক্ষণতার উপর। ধরো সেই সম্পাদক যদি মনে করেন যে এতগুলি অনুগল্প থাকবে বা এতগুলি কবিতা থাকবে তা তাহলে সে যেটা মনে করবে তার যেটা ধারণ ক্ষমতা হবে সে তাহলে সেটা তাই। যে মানুষটা সম্পাদনার ভাবনা এসেছে সেই একমাত্র বলতে পারবে সে কি চায় আমি তার উপর কোন দাগিয়ে দিতে পারব না। যদি পছন্দ না হয় এড়িয়ে যাব এখন মানুষ কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া ভুলে গেছে পরিবর্তে আক্রমণাত্মক হয়ে গেছে।


খোঁজ : আজকাল পত্র পত্রিকায় লেখা আহ্বানের সময় স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয় ধর্মীয় বা রাজনৈতিক লেখা পাঠাবেন না। সাহিত্যের এই দুটি ধারার সঙ্গে দূরত্বের কারণ কী?

বিশাইবাবু : এটা ভীষণ রকম কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। ওদের মনে হয়েছে যে আমরা এত সমস্যার মধ্যে যাবো না। ধরো আমার বেগুনের প্রতি এলার্জি আছে তাহলে আমি বেগুনটা এড়িয়ে যাবো কারণ ওটায় আমার অসুবিধা হতে পারে। তেমনভাবেই কোন সম্পাদক মনে করেছে যে আমার এই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কোন কিছু থাকলে আমার বাধা আসতে পারে। পত্রিকা কর্তৃপক্ষের ক্ষতি সাধন হতে পারে তাই তারা আগাম ভাবে এগুলো করে। আর তুমি রাজনৈতিক রাজনীতি যদি বলি প্রথাগত আমরা যেটা দেখি দল দলাদলি বা এ পার্টিও পার্টি সেগুলো বাদ দিয়েও কিন্তু আমাদের সামাজিকভাবে আমাদের সাংসারিকভাবে এর রাজনীতি কিন্তু সব জায়গায়। ধরো একটি ছেলে একটি মেয়েকে অনেক ভালবাসছে কিন্তু মেয়েটি ছেলেটিকে ভালবাসে না। ছেলেটি তাই সে ভালোবাসায় দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে এটি কিন্তু একটি বিরাট সামাজিক এবং তারপর অন্যরকম রাজনৈতিক একটি বিষয়। আমার চোখের জলও একটি রাজনীতি, আমার দুঃখ একটি রাজনীতি। ধর্মীয় বিষয় হিসেবে সম্পাদক হিসাবে আরেকজন সম্পাদকের বিষয়ে আমি বলতে পারি না। আমার মনে হয় না, রাজনীতির বাইরে কিছু হয়। রাজনীতি ছাড়া কোন লেখা হয়। মনে হয় আর সম্পাদকরা বোধ হয় এটাই বলতে চাইছেন যে যেখানে একটু বিতর্কিত বা বিতর্ক হতে পারে বা গন্ডগোল হতে পারে সেই জায়গাটা একটু এভয়েড করে দিতে চাইছেন। হতে পারে এটা তাদের এডিটোরিয়াল লাইন। তবে রাজনীতি সমাজ ধর্ম এসব বাদ দিয়ে কোন লেখা কোনদিন হয়নি আর হবেও না।



খোঁজ : পত্র পত্রিকার ক্ষেত্রে ‘সৌজন্য সংখ্যা’ কী একটি ঐচ্ছিক বিষয়?

বিশাইবাবু : এটাতে কিন্তু আমি দু'রকমের বক্তব্য রাখতে পারি। যখন আমি লেখক হিসাবে বলব যে বাবু আমি তোমার লেখার পিছনে শ্রম দিয়েছি একটা নিজস্ব টাইম দিয়েছি আর তুমি প্রেসে অর্থ ব্যয় করতে পারছ তুমি আরো অন্য জায়গায় অর্থ ব্যয় করতে পারছ। তুমি তো ভাবো আমাকে একটা সৌজন্য সংখ্যাও তো দিতে পারো অর্থ চাইছি না তো সেই জায়গা থেকে সৌজন্যের সংখ্যা সে আশা করেই থাকে। সম্পাদক সত্তায় বলি যে যেহেতু লিটিল ম্যাগাজিন তাহলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন হ্যাঁ একটা সৌজন্য সংখ্যা নিক, বা আরেকটাও কিনে নিলে ভালো হয় তাতে পত্রিকাটাও বাঁচছে এবং লেখা এগিয়ে যায়।



খোঁজ : ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সাহিত্য চর্চার ভবিষ্যৎ কী ‘আত্মতুষ্টি’?

বিশাইবাবু : আমার তো এটা খুব ভালোই মনে হয়। যাই হোক সন্ত্রাসী কিছু করছি না। সাহিত্যকে কেন্দ্র করে নিজেদের মতো করে তারা লিখে যাচ্ছে এবং খুব আনন্দ পাচ্ছে। একটু সময় দেখো যখন ২০২০ সাল করোনা এসেছিল। মানুষ গৃহবন্দী ছিল তখনই কিন্তু এই ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য যে সোশ্যাল মিডিয়াম বা মাধ্যমগুলো আছে তার মাধ্যমেই কিন্তু সাহিত্য চর্চা বা সংস্কৃতিক চর্চাগুলো হয়েছে সুতরাং এটা একটা অনেক ভালো দিকটা যারা লিখছে সেটা তাদেরও একটা আনন্দের জায়গা তৈরি হয়েছে।



খোঁজ : বইয়ের বিকল্প নেই মেনে নিলাম। পাশাপাশি ইবুক বা ওয়েব ম্যাগাজিনের গুরুত্ব কতটা?

বিশাইবাবু : বলতে বাধা নেই এখন বিশ্বজনীন লাইফ স্টাইল। করোনা মানুষের জীবনে এক অন্যরকম আবহের সৃষ্টি করেছে। করোনার সময় মানুষ কিন্তু এই সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছে একটা সময় দেখা যাবে ২০১৫ কি তারও আগে প্রিন্ট মিডিয়াই সাহিত্য সংস্কৃতির মুখ্য মাধ্যম ছিল এখন তার পাশাপাশি এই ডিজিটাল মাধ্যমে বিশেষ স্থান দখল করেছে। তোমাদের এবং খোঁজ, আবহমান, নব প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা তারা ই-বুক ওয়েব-জিন এইসব প্রকাশ করেছে। করোনা কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছে পড়ার ক্ষেত্রে বা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে দূরত্ব কোন ব্যাঘাত-ই নয়। পড়ার ক্ষেত্রে কোন দূরত্ব নেই। বলা যায় এই ওয়েব জিন বা ইবুকের ফলে মানুষের পড়ার ক্ষেত্রে টা আরো বেশি সহজ হয়ে গেছে। সুতরাং এই মাধ্যমের ভবিষ্যৎ অনেক বেশি। প্রিন্ট মিডিয়ার প্যারারাল ভাবেই উঠে এসেছে এই ডিজিটাল মিডিয়া। এমনকি দেখা গেছে যে প্রিন্ট মিডিয়া গুলো প্রথম সারির তারাও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতি বিশেষ আগ্রহী হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে তাল মিলাতে গেলে আপডেট হতে হয় সেটাই হচ্ছে।



খোঁজ : ট্যাঁকের কড়ি খরচ করলেই আজকাল সঙ্কলন, বই বা পত্রিকার পাতায় নিজের লেখা ছাপানো যায়। সাহিত্যের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো না মন্দ, আপনি কী মনে করেন?

বিশাইবাবু : দেখো সংকলন একটা ভালো মাধ্যম ছিল কিন্তু বর্তমানে সে জায়গাটা ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে হয়। আর একটা কথা সংকলন যে সম্পাদক করে তাকে কিন্তু আমি সংকলক বলেই মনে করি, সম্পাদক হিসেবে দেখিনা। আগে ধরো পত্রভারতী থেকে যেসব সংকলন বেরিয়েছে সেগুলো উপহার পেয়ে অনেক ভালো লেগেছে। বর্তমানে অনেক সংকলন বেরোচ্ছে এবং তার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। হ্যাঁ তুমি যেটা বলেছ ঠিক কথাই যে অনেকেই পয়সা কড়ির পরিবর্তে সংকলন করছে,সেই দৃষ্টিতে সাহিত্যের ক্ষেত্রে বা সাহিত্যের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কতটা উপকারে আসছে তা নিয়ে সন্দেহ বিস্তর আছে।



খোঁজ : সাহিত্যের বাণিজ্যিকরণ বলতে আপনি কী বোঝেন ? আপনার ক্ষেত্রে তার প্রভাব কতটা?

বিশাইবাবু : দেখো যে জিনিসের বাজার দর নেই সে জিনিসের টিকে থাকা খুব কঠিন। যেরকম ইংরেজি ভাষার বাজারদর অনেক বেশি তাই তার চাহিদাও বেশি। কারণ বিভিন্ন সরকারি ডকুমেন্টেশন তাছাড়া প্রায় সব জায়গাই ইংরেজি ভাষা প্রায় লাগেই। এই কারণে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সংখ্যাও বাড়ছে সেটা আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। সেই রকমই আমাদের একটা অনেক বড় সমস্যা হচ্ছে বাংলা বাজারের ক্ষেত্রে। আমি ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি ব্যাঙ্গালোর দিল্লিতে, সেখানে দেখেছি বইয়ের বিজ্ঞাপন বাণিজ্যিকরণ প্রত্যেকটা জিনিসে একটা স্বতন্ত্র ছাপ আছে। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে সেটা কোথাও যেন একটা ফ্যাকাসে আছে ভাব। তাই বাংলা বইয়ের বাজারটা সকলের সাথে তাল মিলিয়ে সাবালক হতে পারেনি, কোথাও যেন একটা নাবালক ভাব রয়েই গেছে। তবে এখন একটা চেষ্টা চলছে নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে তারা নানা সমালোচনা নানা বাধাকে এড়িয়ে ও একটা বাংলাবাজার বা বাংলা কনটেন্টকে অন্যভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। সেটা যেন কোথাও সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় তার সাথে আমরাও সামিল আছি। আরেকটা জিনিস তোমায় বলতে পারি, বাংলা বইয়ের কনটেন্ট কিন্তু অল অভার ভারতে অনেক উপরে। কন্টেন্ট যখন এত উপরে তাই তার বাজারটা তৈরি করার দায়িত্ব আমাদেরকে নিতে হবে এবং আশা করি অদূর ভবিষ্যতে সে বাজারটা গড়ে উঠবে।সেইসাথে বাণিজ্যিকরণ টা অনেক বেশি বেড়েছে। এই কথাটি কিন্তু শুধুমাত্র আমাদের ভারতবর্ষের যে সব জায়গায় বাংলা আছে ও আমাদের পশ্চিমবঙ্গের। আজ যেসব জায়গায় বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আছে বা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয় সেটা নিয়ে বলছি। আমি কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে বলছি না।



খোঁজ : যুব সম্প্রদায়ের অনেকেই আজকাল নিয়মিত পত্র পত্রিকা সম্পাদনা করছেন, একই সাথে পাবলিকেশন হাউস চালাচ্ছেন, এটা সাহিত্যের পক্ষে কতটা আশাব্যঞ্জক?

বিশাইবাবু : যেহেতু আমি বা আমার মত যারা লেখালেখি করে বা সম্পাদনা করে তাই উপার্জন যদি সৎ ভাবে হয় এবং সেটা যদি আমার সাহিত্য কেন্দ্রিক হয় তাহলে আমি কেন সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক দেখাবো না! আমার যদি এই ঝোঁকটা সাহিত্যের প্রতি কাজে লাগাই তবেই তো আগে বাড়বে।বাংলা ভাষা চর্চার একটা বাজে গুণ হল আমরা কোনদিন ভাবি নি যে সাহিত্য চর্চা করে আমরা অর্থ উপার্জন করব বা জীবিকা নির্বাহ করবো। এই কারণেই লেখক কে না খেতে পেয়ে মরে যেতে হয়। আর সম্পাদকরা বহু আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তার পত্রিকা নিয়ে ধুঁকতে থাকে। তাই একটা যদি সফল বাণিজ্যিকরণ হতো তাহলে এই জায়গাগুলো আসতো না। আমরাই যেটা শুরু করেছি, আরো যে প্রচুর নতুন ছেলে মেয়ে উঠে আসছে, এটা একটা রেভিলিয়েশন। আমরা একটা জায়গায় নিয়ে যাব সেই বাংলা বাণিজ্যের বাজার, তাহলে লেখক সাহিত্যিক কবিরাও বাঁচবে। এর ফলাফল বাংলা সাহিত্য পরিষদ আগামী দশ বছরের মধ্যেই দেখতে পাবে। এক্ষেত্রে লেখক এবং প্রকাশকের সম্পর্ক সুন্দর হতে হবে।



খোঁজ : সাহিত্যে পুরস্কার কী সন্দেহজনক?

বিশাইবাবু : দেখো পুরস্কার কিন্তু যে যাকে খুশি দিতে পারে। এতে আমার কোন আপত্তি নেই। এটাই বলা যে পুরস্কার দিচ্ছে এবং যে পুরস্কার নিচ্ছে যে তাদের মাথায় রাখা উচিত যে সেটা কতটা অর্থপূর্ণ হচ্ছে এবং সেটার সে যোগ্য কিনা! পুরস্কার পাওয়া হয়তো অনেকটা সোজা, সম্মান পাও সোজা কিন্তু সে সম্মানটাকে ধরে রাখা কিন্তু অনেকটা কঠিন। যেটা বলতে চাইছি তা হচ্ছে কাজের ধারাবাহিকতারা যদি ঠিক থাকে, তাহলে পুরস্কার সেখানে আসলেও কিবা না আসলেও কি! আজ যদি আমি দশ নম্বরে থাকি আমি আগামীকাল চেষ্টা করব কিভাবে ৮ নাম্বারে উঠে আসা যায়, পরশু চেষ্টা করব কিভাবে ছয় নম্বরে ওঠা যায়। এইভাবে ক্রমশ আমি উপরের দিকে উঠে আসবো। আমি এটাই বলতে চাইছি যে একটা সম্মাননা পেলাম সে সম্মাননার জায়গাটা যদি আমি ধরে রাখতে না পারি সম্মাননা পেয়ে লাভ কি বা কি হলো। আর একটা কথা বলার পুরস্কার দাতা কর্তৃপক্ষ এবং পুরস্কার গ্রহীতা কর্তৃপক্ষ, দুপক্ষকেই দেখতে হবে এ পুরস্কার যেন ও মেমেন্টো বা কোন সার্টিফিকেটের মধ্যে না থাকে।



খোঁজ : শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষা ঐচ্ছিক হলে সাহিত্যচর্চায় কী প্রভাব পড়তে পারে?

বিশাইবাবু : আমার সন্তান কোন ভাষায় কথা বলবে কোন ভাষায় কাঁদবে তা তুমি ঠিক করে দিতে পারো না। আমার ভাষা আমার চর্চা আমার ইতিহাস আমার ভূগোল সেটা আমি আমার ভাষা দিয়ে বিচার করব সুতরাং শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম সে যেকোনো ভাষাই হোক।


এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ