সংখ্যা
![]() |
অলঙ্করণ : বিং |
মশারি
শ্যামল কান্তি শিকারী
শিশিদার টিউশন দুটো; আমার একটি। এই ইনকাম নিয়ে আমরা রাজসুখে ছিলাম। তখন নতুন সমাজ তৈ্রীর স্বপ্ন মনের মধ্যে আকর হয়ে ছিল। আমাদের ওখানে নিয়মিত যাতায়াত করত সুমিতদা আর শোভন। মানুষের পরিচয় হয় না। তবু একটু পরিচয় করিয়ে দিই।
পৃথ্বীশ : বাবা হেড মাস্টার। মা তমলুকের বাড়িতে একা থাকেন এবং মানসিক রুগী। সামাজিক অসুখের ভাইরাস আর জীবনের মিহি ফিচলেমি থেকে পাগলরা মুক্ত। আই থিংক ইনডেফিনিট ওয়েতে ওরামনের রিফ্লেকশন দেয়। আমরা ডিক্লেয়ারড সুস্থরা উল্টো করি। যাইহোক স্বামী, সন্তান সবাইকে সন্দেহ করেন এবং শ্ত্রু মনে করেন। যাদেরকে নিয়ে তার সুখে থাকার কথা ছিল তাদেরকে বর্জন করে তিনি পরম সুখে আছেন। নিয়মের বাইরে গিয়ে সুখ পেতে শুরু করেন সম্ভবত পাগল এবং প্রতিভাবানরা প্রথম। আমার সাথে দাবা খেলে পৃথ্বীশ স্নাতক পরীক্ষায় ড্রপ দিল। ড্রপ দেওয়ার মধ্যে আমরা রোমাঞ্চ খুঁজে পেয়েছিলাম। আসলে এক বছর এক্সট্রা হোস্টেলে থাকার জন্য আমরা অপদার্থ হতে রাজি ছিলাম। পৃথ্বীশ মুখভরা সুখ নিয়ে ফ্লেক ধরিয়ে বলত- জানো একজনকে হাজরা মোড়ে দেখলাম। আমি যথারীতি চুপ। একটু নড়ে বসল- ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে; আমায় মাঝে মাঝে দেখে। মোড় অব্দি ফলো করলাম। কিছু না বলায় খচে গিয়ে বলল- কিছু বলছনা যে!
- এগিয়ে চল।
- দূর চলেই এলাম।
পৃথ্বীশ বড় একা ছিল। এ পথেই জীবনের তৃ্তীয় স্রোতে।
এবার আসি অরূপ অর্থাৎ বাপির কথায়। কোন মেয়ে ওর দিকে দুইবার তাকালে ও তার প্রেমে পড়ে যায়। এর মানসীদের বয়সের রেঞ্জ আজও বুঝে উঠতে পারিনি। প্রেমের গল্প শোনার জন্য বাপি উপোস করতেও রাজ়ি ছিল। আরও আবেগময় কিছুর টানে আমাদের সাথে ছিল।
শিশিরদা বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। জীবনের কিছু অব্যক্ত আবেগ নিয়ে ও বেঁচেছিল! অভিমানি, বিগলিত, বীতশ্রদ্ধ -এরূপ বিভিন্ন মানসিক অবস্থায় বাড়ির বউরা কে কেমন করে খুন্তি নাড়ে তা ভাল দেখাত। শিশিরদা আর পৃথ্বীশ খুপরির অরিজিন্যাল ভাড়াটিয়া। আমি আর বাপি চেতলার বস্তি থেকে এখানে এসে উঠি। এখানেই শুভদৃষ্টি হল এক বিশেষ মশারির সাথে।
যাকে নিয়ে গল্প।
মশারিটির একটি দুয়ার ছিল। জীবনে এই প্রথম দেখলাম। বিছানা হওয়ার পর যখন আমি শুতাম শিশিরদা বোরোক্যালেন্ডুলার একটা পুরনো ছিপি আমার দিকে ছুঁড়ে দিত। আমি নাকে গুঁজে পড়ে থাকতাম। মশারি টাঙানো শেষ হলে পাখার বাতাস করতে করতে শিশিরদা বলত- একটু গন্ধকে অতিক্রম করতে পারোনা বিপ্লব করবে কি করে?
‘বিপ্লব’ কথাটির এমন পরিণতি দেখে পাশ ফিরে শুলাম। শিশিরদা সহ্যশক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলল। তখন এ্যাঙ্গেল চিৎ হয়ে শুলাম। যেমনটি শোয় স্লাইটলি অভিমানী হয়ে পড়া আদর-খেকো বাঁদর স্বামী স্ত্রীরা। মশারির কম্পন শেষ হলে যখন বিশেষ গন্ধটি ঘরের বাতাসে আর থাকত না শিশিরদা গম্ভীর হয়ে বলত –ছোট ছিপিটা দে, গুছিয়ে রাখি। বাপি প্রথম থেকে নাকে বোরোলিন লাগিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। বোরোলিনের এমন ব্যবহার বোরোলিন কোম্পানি স্বপ্নেও ভাবেনি। পৃথ্বীশ দুই বালিশের মাঝে মাথা গুঁজে প্রাণায়াম করত সে সময়।
একদিন বাদশা প্রাণের আবেগে রাত কাটাতে আমাদের গুহায় আসে। কিন্তু সেদিন আমরা কেউই ছিলাম না। অর্বাচীন জানিত না কি আছে কপালে। যা ঘটেছে তার বিবরণ পাইনি। যেটুকু মনে পড়ে পরের দিন তারাতলায় সাধারন সভার আলোচনার ফাঁকে বাদশা নিচু স্বরে জানাল- কমরেডকেও কারপিন ঘরে রাখার জন্য ধন্যবাদ। দিনে না লাগলেও রাতে লাগবেই।
আমরা আলোর পথযাত্রীরা সাংসারিক ব্যাপার নিয়ে একদিন মিটিং ডাকলাম। সেদিন ঘটনাক্রমে সুমিতদা হাজির এবং প্রশান্তও ছিল। অন্য আলোচনার পর বাপি মশারির কথা তুলল। বাপি বলল, আমাদের এরূপ নোংরা মশারি ব্যবহার করা উচিত নয়। সুমিতদা বিড়িতে একটা টান দিয়ে বলল, এটা এক ধরনের নৈরাজ্যবাদী। এরূপ ছোটখাট জায়গা থেকে আমাদেরকে নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এটা এই সমাজ থেকে পাওয়া একটা পচা ঘা; সারাতেই হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে এই সমাজ… আমি বাধা দিয়ে বললাম- মশারিটা। ন্যাচারাল ডাইভারশন হিসেবে ধরে নিয়ে সুমিতদা গুরুত্ব সহকারে তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে বলতে শুরু করল। হ্যাঁ মশারিটা, মশারি দরকার; কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে.. আমি দাদাকে দিয়ে বললাম, ওরা বলুক। তুমি আবার বোলো। শিশিরদাকে ইশারা করে বললাম, ওই তো মশারির আসল মালিক ও বলুক। স্কুল পালানো ছাত্রের অভিভাবকের মত আমাশাগ্রস্ত মুখ করে বলল- তোমরা এত সিরিয়াসলি নিওনা। ওটা আমি সামনের রোববার কেচে...।
-সিরিয়াসলি না নেওয়াটা এক ধরনের নৈরাজ্যবাদিতা। এখান থেকে জন্ম নিচ্ছে সংশোধনবাদ। চাই সম্যক উপলব্ধি। প্রশান্ত পেশ করল। আমি বললাম- আমার একটা কথা আছে। আমরা নৈরাজ্যবাদী বলে নোংরা না কি নোংরা বলে নৈরাজ্যবাদী? সুমিতদা একটু গীয়ার মেরে বলতে শুরু করল- অবজেকটিভলি নোংরা থাকতে থাকতে নৈরাজ্যবাদী হয়ে পড়েছি; সাবজেকটিভলি নৈরাজ্যবাদী বলে নোংরা।
-দূর্ভাবনা থেকে অনন্তভাবনায় টেনে নিয়ে যাওয়ার ধন্যবাদ জানিয়ে সুমিতদাকে বললাম- আচ্ছা এই দুইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আমাদের গতিমুখ কোন দিকে যাবে?
-প্রগতিশীতার দিকে।
বিষন্নভাবে জানালাম- তাহলে বুর্জোয়ারা আমাদের থেকে বেশী প্রগতিশীল। প্রশান্ত রেগে গিয়ে কি একটা বলতে যাচ্ছিল পৃথ্বীশ তাড়াতাড়ি এক কাপ চা দিয়ে বলল- এটা খেয়ে নাও, খারাপ লাগলে বুঝতে বোঝাতে অসুবিধা হবে না।
পরে আবার একদিন বসা হল মশারি নিয়ে। শিশিরদা শুরুতেই বলল- কাচার ব্যাপারটা আমি সিরিয়াসলি ভেবেছি; ত্রিপল কাচা সোডা এনেছি। কাল কাচব। কিন্তু শোব কি করে যদি সারাদিনে না শুকায়।
পৃথ্বিশ বলল- এটা কোন সমস্যাই নয়, একদিন রাতে ‘কচ্ছপ’ জ্বালালেই হল।
বাপি বেঁকে বসল। পেপারে আজ ও ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর খবর পড়েছে। তাই এত ছোটখাট ব্যাপারে রিস্ক নিতে চাইছে না।
ব্যাপারটা গভীরভাবে বিবেচনার আবেদন জানিয়ে ঐদিন মিটিং শেষ করা হল।
সবাই বেরিয়ে যাবার পর পৃথ্বীশ একা শুয়েছিল বিছানায়। হঠাৎ তার মনে হল, গল্ফ মাঠে এত ইঁদুর, এই বিক্রমগড়েও কত ইঁদুর! মশারিটা কাটতে পারেনা। আচ্ছা কার্জন পার্ক থেকে ইঁদুর এনে ছেড়ে দিলে কেমন হয়?
কিন্তু আনব কি করে? দূর ভাল লাগছে না। সব ভাবনার সূতো কেটে দিয়ে টিউশন পড়াতে বেরিয়ে পড়ল।
টিভি টাওয়ারের কাছে পুকুরপাড়ে ক্যাবলার সাথে দেখা।
জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও ভাবনায় এরা থাকে। তাই দুই একটা কথা হয়। পৃথ্বীশ বলল- ক্যাবলা তুই ইঁদুর ধরতে পারিস? ক্যাবলা একগাল হেসে বলল- হ্যাঁ পারি, ল্যাজ ধরলেই হল; ব্যাটার কিসসু করার নেই। পৃথ্বিশ কথা না বাড়িয়ে চলে গেল।
ফেরার সময় শিশিরদা ছিল। ক্যাবলা পুকুরপাড়ে উদয় হল।
পৃথ্বিশকে উদ্দেশ্য করে বলল- কাকু ইঁদুর ধরা শিখবেন? পৃথ্বিশ প্রথমটা থতমত খেয়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে বলল- অ্যাই তুই যা। শিশিরদার দিকে তাকিয়ে বললাম- ওর সাথে মজা করছিলাম। বড় ভাল ছেলেটি। এদের সাথে মেলামেশা বাড়াতে হবে।
শিশিরদা বলল- ঠিকই, এত কাছে তবু খবর রাখি না।
পরে ক্যাবলার সাথে পৃথ্বিশ চুক্তি করল- ক্যাবলা ঘরে ইঁদুর ঢুকিয়ে দেবে; বিনিময়ে একটা খেলনা পিস্তল পাবে। মেহনতী মানুষের হাতে পিস্তল ধরিয়ে দেওয়ার আবেগ পৃথ্বিশের মনে শিহরন জাগাল। ইঁদুর ঢোকানোর কারণ হিসেবে পৃথ্বিশ বলেছিল- ঘরে আরশোলা বেড়ে গেছে। ইঁদুরের আরশোলা খাওয়ার কথা শুনে ক্যাবলা রিয়েলি প্রথমটা ক্যাবলা শেপ নিয়েছিল। পরে দারুণ উত্তেজিত হয়ে পড়ল এবং সন্ধ্যায় যথারীতি ঘরে ইঁদুর ছেড়ে দিল। পৃথ্বিশ মশারিটার উপর খাবার ছড়িয়ে রেখেছিল।
সবাই যখন ঘরে ফিরল লোডশেডিং ছিল। একটা মোমবাতি জ্বেলে পরের দিনের মিছিল নিয়ে কিছুক্ষন আলোচনা হল। পৃথ্বীশ আড়চোখে মশারিটা লক্ষ্য করার চেষ্টা করল। মনে মনে ভাবল কাজের কাজ কিচ্ছু হয়নি। সবাই এক সময় শুয়ে পড়ল। পৃথ্বিশ ভাবছে ইঁদুরটা গেল কোথায়। হঠাৎ ঠক ঠক শব্দ, এবং শব্দটি চলমান। বাপি টর্চলাইট মারল শব্দের দিকে।
ইঁদুর দৌড়চ্ছে আর বোরোক্যালেন্ডুলার ছিপিটা তার মুখে আটকে আছে।
-এই জন্যই পাইনি; আচ্ছা ওর মুখে গেল কি করে? শিশিরদার বিস্মিত আফসোস।
গল্ফ মাঠের ইদুরগুলোর ডেভেলাপমেন্ট হয়েছে; শালা গন্ধ সহ্য করতে না পেরে বোরোক্যালেন্ডুলার ছিপিতে মুখ ঢুকিয়েছে। না ধাবা থেকে ইঁদুর আনতে হবে। পৃথ্বিশ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল।
দোর জানালা সব খুলে দিলাম। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ।
বাপি বলল- যার চোখ বন্ধ কমরেড সে আলোর দেখা পেতে পারে না। একটা বড় ব্যাপার শিক্ষা নেবার আছে।
আমরা শুধু কাঠি মেরে যাচ্ছি। এক সময় ব্যাটা বালিশে ধাক্কা খেয়ে উলটে গেল। এবং ছিপিটা খুলে গেল। সুপারসনিক স্পীড নিয়ে মালটা বেরিয়ে গেল। সবাই স্বস্তি পেলাম।
বাপি বলল- এভাবে সমাজকে উলটে দিলে সে আলোর দেখা পাবে এবং অভাবনীয় গতি লাভ করবে। সঙ্গে সঙ্গে পৃথ্বিশ উপুড় হল। শেষে একদিন মশারী কাচার ব্যপারে স্থির সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। বাপী ও শিশিরদাকে যৌথভাবে দায়িত্ব দেওয়া হল।
বলা হল রাতে গড়িয়া থেকে টালিগঞ্জ ওয়ালিং আছে; তাই রাতে মশারী লাগছে না। এ হেন প্রস্তাবে বাপী খুব আনন্দ পেল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়। জলে যেই ফুট নিয়েছে অমনি এমন গন্ধ ছাড়ল যে বাপি মশারিটি তুলে নিয়ে প্যানের মধ্যে জল ফেলে দিল। এর চারপাশে কেরোসিনতেল ঢেলে দিল। আমরা ভীষণ সমস্যায় পড়ে গেলাম।
প্রশ্ন উঠতে পারে মশারিটি ধোপাবাড়ি দেওয়া হল না কেন? বাপি ধোপাবাড়ির প্রসঙ্গ তুলতে সুমিতদা বলেছিল– এটুকু কাজ প্রলেতারিয়েত হিসেবে আমাদের নিজেদের করার যোগ্যতা থাকা দরকার।
- কিন্তু ধোপা তো শ্রমজীবী মানুষ, তার বাঁচার সুযোগ আর ও বাড়ত। পৃথ্বিশ বলল।
প্রশান্ত সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে উঠল, আমরা পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই; আমরা চাই ওর তাড়না- সেখান থেকে সংগ্রাম- তার বিপ্লব ও মুক্তি। ময়লা মশারি থেকে কি করে মুক্তি পাই, আমি সেই চিন্তাই করছিলাম।
একদিন রেগেমেগে শিশিরদাকে বললাম- আমি কোন কথা শুনতে চাইনা, আজই ধোপাবাড়ি দিয়ে এসো; দুদিন পরে নেব। অসুবিধা হবে না। চারদিন তারাতলায় শিক্ষাশিবির আছে।
শিশিরদা সকাল দশটার দিকে ধোপাবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। কি এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে বসে আছি। ড্র্যাস্টিক পদক্ষেপের মধ্যে একটা বিপ্লবী আবেগ খুঁজে পেলাম। কিছুক্ষণ পরে শিশিরদা মশারি নিয়ে ফিরে এল এবং মালটিকে খাটের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বলল- দুবছর আগে ভাইকে পইপই করে বলেছিলাম- বাবু মশারিটি ধোপাবাড়ি দিয়ে আয়। না, আই টি আই শেষ করে কাচবে। মশারিটি না কি পয়া। রেজাল্ট ভাল হচ্ছে। এদের নিয়ে বিপ্লব! এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে চেয়ারটার কান ধরে টেনে ধপ করে বসে পড়ল।
আমি বললাম, তার সাথে আজকের কি সম্পর্ক?
ততোধিক খচে গিয়ে শিশিরদা বলে উঠল- জানো, সংস্কার আর ব্যাখ্যার মাঝে পড়ে আমার সদ্য প্রেমটা ঝাড় খেল। কোন কথা না বলে অপেক্ষার দোসর হলাম।
শিশিরদা বলতে শুরু করল- জানো ধোপা কি বলেছে? মশারিতে হাত পর্যন্ত দেয়নি। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল- আপনি দয়া করে বাইরে দাঁড়ান আর শুনুন ভবিষ্যতে এ ধরনের মাল আনবেন না। মেথরের সাথে যোগা যোগ করুন। পিছন ফিরেছি; তিনটি কুকুর আমার পিছু নিল। অল্প খবরের কাগজে মোড়া ছিল মালটা। খোলার জন্য সেটাও ছিঁড়ে গেছে। ভাবছি সামনে গিয়ে ডান দিকের ডাস্টবিনে ফেলে দেব। কিন্তু কমরেডরা যদি কঠিন কোন ব্যাখ্যা খুঁজে বের করে যাতে আমার দূর্বলতা ধরা পড়ে। দূর! আর ভাল্লাগছেনা। ফেলেই দেব , হঠাৎ দেখি বাম দিকের বারান্দায় সে তন্বীটি যার সাথে আমার রিসেন্ট চোখাচোখি। কুকুর চেল্লাচ্ছে। কয়েকটি কাক মাথার উপর দিয়ে উড়ছে। আস্তে আস্তে বিভিন্ন বারান্দায় সংসারের অবশিষ্টরা শাড়ির অবশেষ দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরুচ্ছে। কুকুরগুলোকে বাগে আনার জন্য বিবেকানন্দের লাইন ধরলাম। রুখে দাঁড়াবার ভঙ্গি করলাম। কিন্তু খেঁকির রক্তই আলাদা। মধ্যবিত্ত বিরোধী পক্ষের মত। ধরেওন সরেও না। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অপদস্ত চার্লি চ্যাপলিনের মত ভান করে যেন বোঝাতে চাইলাম, আমার মর্ম তুমি বুঝবে এ অপদার্থ কুকুরগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কে শোনে কার কান্না! এভাবে লজ্জা আর বিরক্তির মাঝ দিয়ে পথ চলছি এক ভদ্রলোক কুকুর এবং আমাকে জরিপ করে বললেন- প্রবলেম বোধ হয় আপনার ঐ বস্তুটি।
কি ওটা!?
-এক বিশেষগজ কাপড়, ল্যাবে ইউজড হয়। মনে মনে ভাবছি রঙের ব্যাখ্যা ‘বিশেষ’ দিয়ে হল গন্ধের ব্যাখ্যা কি দিয়ে হবে। এদিকে ওনার সাথে একটু কথা বললে একটা স্বাভাবিক দৃশ্যপট তৈ্রী হয়, যাতে তন্বীটি এবং কুকুর উভয় থেকে সাময়িক মুক্তি পাই। ভদ্রলোক কি ভেবে চলে গেলেন। আস্তে আস্তে কেয়ারলেস ভঙ্গীতে এগিয়ে চলছি। কে যেন বলেছিল কুকুর ভয়ে চেল্লায়, সাপ ভয়ে কামড়ায়। মার্কিন জাতির মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য আছে।
এ ভাবনায় নিঃশ্বাস একটু জিরিয়ে নিল। হাজির হল আর এক বিপত্তি। অন্য পাড়ার কুকুররা ডাকতে শুরু করেছে। যেই নিজের পড়ায় ঢুকলাম কুকুর আর ডাকছে না। এরা আমায় চেনে। কুকুর চিনলে যেটুকু করে চেনা মানুষ সেটুকু করে না। ইতিহাস শেষ করে শিশিরদা প্রস্তাব দিল, এ পাড়ায় আর একদিনও নয়।
বললাম- তোমার সোনামুখির কি হবে?
-দূর, এই গন্ধগোকুল পরিচয় নিয়ে আর সামনে দাঁড়ানো যাবে না।
এই পরিস্থিতে এক গুরুত্ত্বপূর্ন মিটিং ডাকা হল। বিষয়ঃ মশারি।
শিশিরদাকে সভাপতি করা হল। শিহিরদাই শুরু করল- বন্ধুগন, সমাজের প্রথম সারির মানুষ হয়ে সামান্য একটা মশারি নিয়ে অযথা সময় নষ্ট করছি। এটা আমাদের অক্ষমতা। তাছাড়া আর কিছু নয়। আমি তিনটি বিকল্প রাখছি। সেটা শুনে সবাই সুচিন্তিত মতামত দেবে।
একঃ মশারিটি ফেলে দেওয়া হোক অথবা নষ্ট করে দেওয়া হোক।
দুইঃ কোনো গরীবকে দান করতে পারি।
তিনঃ অন্যথায় এলাকা ত্যাগ করতে পারি।
বাপি বিড়িতে টান দিল। দুটো বান্ডিল খুলে সামনে রাখল। ধুতির দুই মাথা মুছড়ে শরীরের মধ্যে ঢুকিয়ে সমস্যা সমাধানের দৃঢ়তা প্রকাশ করে বলল- ফেলতে বা নষ্ট করতে পারিনা। কারণ বস্তুর উপযোগিতা আর নেই তা কি বলতে পারছি? এ অবস্থায় ফেললে শ্রমের অপচয় ও অপমান হয়। তাছাড়া বস্তুর শেষ পর্যায় বলতে কি বোঝায়। ময়লা হওয়া; হতেই পারে না; ছিঁড়ে যাওয়া, তাও হতে পারে না। মনে রাখবেন আসল উদ্দেশ্য সাধিত হলে ময়ল বা ছেড়া কোন বিষয় নয়। অন্তত ভারতের দিকে তাকালে বোঝে যায়। আর দান? সে তো নীতিবিরুদ্ধ। আমরা দানে বিশ্বাসী নই। এলাকা ত্যাগ মানে পলায়নবাদী মনোভাব। সেটা আমদের শোভা পায় না।
পৃথ্বিশ বলল- কাউকে দান করা মানেও তাকে ছোট করা কেন হবে? আমি আমার ক্ষমতামত কারুর পাশে দাঁড়িয়েছি।
বাপি হেসে বলল- কমরেড বাধ্য হয়ে দিচ্ছ। সাধ করে তুমি দিচ্ছনা। দিলে তা উপহার হত। ঠেলায় পড়ে দেবে; গরীবের সুখী মুখ দেখে নিজেকে মহান ভাববে। এতে দাতা ও গ্রহীতা উভয়কেই প্রবঞ্ছনা করা হয়।
আমি বললাম, উপযোগিতার কথা যদি বল তাহলে আমার প্রস্তব আছে,আর তা হল, এটাকে ছিঁড়ে রান্না ঘরের জন্য কয়েক টুকরো ন্যাকড়া বানিয়ে নিলে হয়।
প্রশান্ত বলল- এটা সংশোধনবাদী মানসিকতা। শিশিরদা সারাক্ষণ মাথা চুলকে যাচ্ছে। বিড়ির ছাইতে এ্যাস্ট্রে ভরে যাচ্ছে। হঠাৎ সুমিতদা এসে হাজির। এসেই বলল- চল সবাই পোস্টার মারতে যেতে হবে।
পথে সুমিতদা সবটা শুনল। কিছু ধোঁয়া স্পেসে পাঠিয়ে দিয়ে মন্তব্যের আঁচড় কাটল- যুক্তি দিয়ে কথা বলা আমাদের অভ্যেস করতে হবে।
আমি বললাম- আচ্ছা সুমিতদা, যুক্তি থাকা, না থাকা আর যুক্তির বাতিক- এ গুলোর মধ্যে কোনটি বেশী খারাপ। - যুক্তি না থাকার থেকে খারাপ কিছু হয় না।
পৃথ্বিশ মনমরা হয়ে শিশিরদার পাশেপাশে চলছিল। একটা বেডিং দোকানের দিকে দুজনের চোখ পড়ল। শিশিরদা বলল- কত নতুন মশারি! কি ভ্যারাইটি! পৃথ্বিশ এক পলক শিশিরদাকে দেখল; তারপর একপাশে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল- জানো এবার তমলুকের বাড়িতে গিয়ে কি হয়েছে! দেখি বাবা নতুন মশারি কিনেছে। রাতে শোওয়ার সময় বাবাকে বললাম- নতুনটা টাঙাবো? বাবা হেসে বলল, এতে জিগ্যেস করার কি আছে। টাঙা। শুঁকে দেখলাম- কি ভাল গন্ধ! মালটাকে পাট করে বালিশের উপর রাখলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়লাম। তারপর বললাম- পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লাম, আর টাঙানো হয়নি। বাবা কয়েল ভস্মের দিকে তাকিয়ে কি ভেবে চলে গেল।
শিশিরদা পৃথ্বিশের পিঠে চড় মেরে বলল- তুই পাগল; বলেই সিগারেটের অবশিষ্টাংশ রাস্তার মধ্যে ফেলে দিল। সুমিতদার চোখে পড়ল। সুমিতদা বলল- বলত কে কাকে নোংরা করল? রাস্তাকে সিগারেট, না কি সিগারেটকে রাস্তা। পৃথ্বিশ বলল- সিগারেটটি রাস্তায় পড়ে এইমাত্র নোংরা হল। প্রশান্ত বলল- এটা সত্যের অংশ মাত্র, তার সমগ্র নয়।
-সমগ্রের খুব দুরবস্থা চলছে। এখন অংশের দিন; শিশিরদা ফোড়ন কাটল। প্রশান্ত রেগে গিয়ে বলল- তোমার মুন্ডু। হেসে বললাম-এটা কিন্তু হতাশাবাদ। শিশিরদা বলল- এর সাথে স্লাইট প্রতিবাদ মেশাতে পারলে হয়ে যাবে শ্লোগানবাদ। পৃথ্বিশ জোরে বলে উঠল-এখন সব বাদ। দেখ শিশিরদা বিকেলটা কি সুন্দর! ঐ বাড়িটার পাশ দিয়ে শিরিষ গাছটার ভিতর দিয়ে ছোট ছোট আকাশগুলো দেখ!
সুমিতদা বলল- আমার অন্য কথা মনে পড়ছে, জানো তোমার স্বপ্নের আকাশ সাম্রাজ্যবাদীরা চুরী করেছে। পৃথ্বিশ চিৎকার করে উঠল- দেখ সাদা পাখিটা নীল আকাশে খেলা করছে।
- কমরেড, পৃথিবীকে দেখার চোখ পাল্টাও। নইলে পিছিয়ে পড়তে হবে; বলেই সুমিতদা পা বাড়াল সামনের দিকে।
আমি একপাশে সরিয়ে নিয়ে এসে পৃথ্বিশসকে বললাম- এই বিকেলটা তোর, ঐ আকাশটা তোর। সাদা পাখিটা তোর জন্য উড়ছে। দেখার এই চোখটা বাঁচিয়ে রাখিস। পৃথ্বিশ আমার দিকে একটু তাকিয়ে বলল- মাঝে মাঝে তুমি কেমন হয়ে যাও।
বললাম-
আমি চাই বা নাই চাই
এখনও পৃথিবী সাজে;
এখন বিদায়ী বকের পাখায় সূর্য ছবি আঁকে।
এভাবেই চলছিল। এই ব্যাখ্যা- ধর্ষিত জীবনে হঠাৎ শিশিরদার ভাই এসে হাজির। ঘরে তখন আমি একা ছিলাম। ওকে সব বললাম। ও তো হেসে খুন। আত্মসম্মানে লাগল। বললাম- শোন তোর মাল তুই নিয়ে যা।
ভাই বলল-এ মাল নিয়ে আমি কি করব গুরু!
- পাতাল রেলের গর্তে ফেলে দে।
- তোমরা ফেলনি কেন? আনোয়ার শা রোড তো কাছে।
- ও গর্তে ফেলার আর ও বড় গর্তে পড়ে গেছি সোনা! ওকে বুঝিয়ে দিলাম কি বলতে হবে। আমি তখনকার মতো চলে গেলাম।
সবাই আসতে ভাই বলল- আমার একটা কথা ছিল।মশারিটা আমি নিয়ে যাব।ওটা আমার খুব পয়া। জানি এটা মানসিক ব্যাপার; কিন্তু অনেক আশা নিয়ে এসেছি। মনে হল পৃথ্বিশ অপ্রত্যাশিত আনন্দ চাপতে না পেরে বাইরে গেল। শিশিরদা বিয়ে বাড়ি থেকে তিনদিন আগের বাসি সিগারেট ধরিয়ে চিন্তান্বিতভাবে বলল- ও যা বলছে তা সত্য, তবে ভাইকে এটা বলতে চাই, মশারিটা এখন আমার নয়,আমাদের। তাই সবার মতামত দরকার।
বাপি বলল- ভাই যেভাবে বিষয়টি উত্থাপন করল বা যে অ্যাঙ্গেল থেকে চাইছে তা ভাববার আছে;(পৃথ্বিশ ততক্ষনে পাশের বাড়ি থেকে খবরের কাগজ যোগাড় করেছে প্যাক করার জন্য। কিন্তু বাপির কথা শুনে দোরের পাশে দাঁড়িয়ে গেল)। যুক্তি মুক্তি আনে কারুর ক্ষেএে। সাধারণ মানুষ মুক্তি ঠিক করে নেয়। যুক্তিকে সেই মতো সাজায়। ভাই দ্বিতীয় পর্যায়ে পড়ে। আমরা স্নেহবশত তার আবেদনে সাড়া দিচ্ছি। কিন্তু সেই সঙ্গে আশা রাখব ভাই আগামী দিনে মানসিক সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠবে এবং বিজ্ঞানমনস্ক হবে। আমার বক্তব্য শেষ। ছোড়দা কিছু বললে বলুক।
- বললাম, সবই ঠিক আছে। তবে ও কাল নিয়ে যাক। এখনই মিটিং আছে, কেনার সময় পাওয়া যাবে না। পৃথ্বিশ জানে রাতে বড় কমরেড সুমিতদা আসবে। যদি মত ঘোরে।
তাই ব্যস্তভাবে বলল- সামনের দোকান থেকে কয়েল কিনে নেব। তাছাড়া ও আজ ফিরতে হবে। ও মাসীমাকে বলে এসেছে আজ ফিরবে। ও তো ওষুধ কিনতে কোলকাতায় এসেছে। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল।
ভাই অসহায়ের মতো সায় দিল। ‘প্রেম রোগ’ দেখতে কোলকাতায় এসেছিল। ঘরভর্তী বামরুগী দেখে ফিরল।
রাতে ফিরে দেখি। শিশিরদা বোরোক্যালেন্ডুলার ছিপিটা ঘোরাচ্ছে। ভাবখানা এরকম। তোকে ফেলতে পারি, রাখতেও পারি। তবে কিঞ্চিত মায়া পড়ে গেছে। পরের দিন টিউশন সেরে শিশিরদা মশারি নিয়ে ঘরে ফিরল। ঘরের মধ্যে তখন বাপী আর পৃথ্বিশ একটা নতুন মশারি টাঙিয়ে দেখছে কেমন হয়েছে।
মশারিটার পরবর্তী ইতিহাস একটু অন্য রকম। ভাই মশারিটা ফেলে দেয়নি। ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠে না। পাঠিয়েছিল এক ঠিকানায়।
এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ