শারদ
সংখ্যা






কালের কবিয়াল তারাশঙ্কর

রবীন বসু 





উ‌ নুনের দাউ দাউ আগুনে কিছু একটা জ্বলছে। পাশে দাঁড়িয়ে শীর্ণকায় তরুণ এক নাট্যকার। চোয়াল শক্ত। চোখে বেদনার অশ্রু। আগে অবশ্য কিছু কবিতা লিখেছেন। তা ছাপাও হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। কিন্তু মন ভরেনি। স্বপ্ন নাট্যকার হবার। মনে আশা তাঁর নাটক মঞ্চে মঞ্চস্থ হোক। নিজের লেখা নাটকের খাতা নিয়ে একদিন নামকরা এক নাট্যকারের সঙ্গে কলকাতা গেলেন। তিনি আবার তাঁর আত্মীয় হন। উদ্দেশ্য কলকাতার জনপ্রিয় নাট্যগ্রুপের ম্যানেজারের হাতে পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া। সে ভদ্রলোক পড়া তো দূর কথা, ছুঁয়েও দেখলেন না। উলটে চরম অসম্মান ও অপমান করলেন সেই নাট্যকারকে। তাঁর জন্য উমেদারি করার জন্য। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে তরুণ নাট্যকার সব শুনে নিজেও ভীষণ ব্যথিত ও অপমানিত বোধ করলেন। কলকাতা থেকে গ্রামে ফিরে এই চরম সিদ্ধান্ত। পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন।


সেদিনের সেই তরুণ নাট্যকার কিন্তু পরবর্তীতে ১২টি নাটক লিখেছেন। তাঁর রচিত কাহিনীর নাট্যরূপ দিয়ে অজস্র মঞ্চসফল নাটক অভিনীত হয়েছে। হয়েছে যুগান্তরকারী চলচ্চিত্র। বিশ্ববরেণ্য পরিচালকরা তাঁর কাহিনী নিয়ে ছবি করেছেন। তবু তিনি কবি নন, নাট্যকার নন, বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক শক্তিশালী ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি আর কেউ নন, ‘গণদেবতা’, ‘কবি’, ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি লিখেছেন, “কালো যদি মন্দ তবে, কেশ পাকিলে কান্দো কেনে।”


১৮৯৮, ২৩ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক ভগ্ন জমিদার বংশে সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম। পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা প্রভাবতী দেবী। গ্রামের পরিবেশেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর নিজ গ্রামেরই মেয়ে উমাশশী দেবীর সঙ্গে লেখকের বিয়ে হয়ে যায়। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় আসেন। প্রথমে ভর্তি হন সেন্টজেভিয়ার্স কলেজে। পরে আশুতোষ কলেজ, তখন নাম ছিল সাউথ সুবার্বন কলেজ। কিন্তু কলেজে পড়ার সময় তিনি অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এবং কারবাস করেন। এক বছর পর জেল থেকে বেরিয়ে কিছুদিন কলকাতায় কয়লার ব্যবসা করেন, পরে চাকরি নিয়ে কানপুর চলে যান। সুবিধে করতে না পেরে পুনরায় কলকাতা ফিরে আসেন এবং সমাজসেবা মূলক কাজ ও সাহিত্য চর্চাকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেন। 


কলকাতায় এসে তিনি কিছুদিন বৌবাজারে এক মেসে থাকতেন। এখানে বসে তিনি অনেক বিখ্যাত গল্প রচনা করেন। তাঁর প্রথম রচিত গল্পরসকলি’। তখনকার সাড়া জাগানো ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশ পায় ১৯৩৭। এ গল্প পড়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লেখককে প্রশংসা করেন। এরপর লেখেন ‘অগ্রদানী’, ‘ডাইনি’, ‘ডাক হরকরা’-র মতো সব কালজয়ী গল্প। প্রথমে বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। পরিশেষে টালাপার্কে নিজে বাড়ি করেন। সেখান থেকেও এক সময় আবার বরানগরে চলে যান। 


তিনি কালের কবিয়াল। মানবজীবনের অকৃত্রিম জয়গানই তাঁর সাহিত্য। সমাজের অন্ত্যজ প্রান্তিক মানুষজনের কথা তিনি যেভাবে বলেছেন, তাঁর আগে বাংলা সাহিত্যে তেমন ভাবে কেউ বলেননি। তারাশঙ্কর ছিলেন রাঢ়বঙ্গের মানুষ। লালমাটির দেশ, বাউল কবিয়াল বৈষ্ণব সুফি শাক্ত আর সতীপীঠের দেশ। উত্তর রাঢ়ের জনপদ, তার গ্রাম জীবন, লৌকিক দেবদেবী, চণ্ডিমণ্ডপ, মঠ, ভাঙা দেবদেউল, তান্ত্রিকের আসন, ধর্মঠাকুর— এইসব নিয়ে তাঁর আখ্যানের কাঠামো গঠিত হয়েছে। সেখানকার মানুষের বিশ্বাস, লোকাচার,পালপার্বণ জীবন্ত শরীর পেয়েছে তাঁর কাহিনীতে। রুক্ষ রূঢ় মাটি ও প্রকৃতির গল্প তিনি বলেননি, বলেছেন সেখানকার মানুষের গল্প। বোষ্টম, সাঁওতাল, বেদে বাগদি, কাহার, দুলে—এইসব অন্ত্যজ মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তাদের সরলতা, লোভ, আশাভঙ্গ হিংসা-প্রতিহিংসা ও স্বপ্নের গল্প। গ্রাম ছাড়িয়ে জনপদ ছাড়িয়ে, জেলা প্রদেশ ছাড়িযে এক অখণ্ড ভৌগোলিক বিস্তার পেয়েছে তাঁর সাহিত্য। তিনি আন্তর্জাতিক সীমানায় পৌঁছে গেছেন। বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তাঁর রচনা। দু' দু'বার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হনজীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর।


এই যে আবহমান দেশ, তার মৃত্তিকা প্রকৃতি মানব সম্পদ ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে বিরাজমান, তার কি শুধু সম্পন্ন জমিদার-জোতদার মহাজন স্বত্বভোগীদের? কখনওই না। ভূমিহীন দরিদ্র জনমজুর কৃষকেরও। কারখানার কালিঝুলি মাখা শ্রমিকেরও। এই বোধ তিনি আমাদের মধ্যে জাগিয়েছেন। শিল্প বিপ্লবের ফলে আধুনিক গ্রাম জীবন ভেঙে নতুন নগর জীবন গড়ে উঠছে, এই উদ্যোগ পর্বের স্পষ্ট চিত্র যেমন তাঁর উপন্যাসে আছে, তেমনই ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি প্রথা অবলুপ্তির বিলাপ, নতুন পুঁজির আগমন — মানুষকে এক অনিকেত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত তিনি রেখেছেন ‘জলসাঘর’, ‘অভিযান’ প্রভৃতি গল্পে। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেকার সময়সীমায় রচিত হয় লেখকের প্রথম পর্বের উপন্যাসগুলো। একটা রাজনৈতিক বিশ্বাস তাঁর ছিল, কিন্তু সেই রাজনীতি তাঁর লেখক সত্তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। তিনি সত্যনিষ্ঠ দ্রষ্টার মতো যা দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন, তা স্পষ্ট ঋজু এক ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন। মানব জীবনের ইতিহাস লিখেছেন তারাশঙ্কর। আধুনিক সভ্যতার সর্বগ্রাসী বিস্তার, ধনতান্ত্র ও পুঁজির আগ্রাসনে বাংলার গ্রামজীবনের যে ভাঙন, তা তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত ও জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘গণদেবতা’, ‘পঞ্চগ্রাম’ প্রভৃতি এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য।           


তারাশঙ্করের দ্বিতীয় পর্বের উপন্যাসগুলো নগর কেন্দ্রিক। সেখানে মানুষের বহিরঙ্গের নয়, অন্তরঙ্গ জীবনের গল্প বলেছেন। চরিত্রের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, জয় পরাজয়, সম্পর্কের জটিলতা, মনোবিকলন— এ সবই অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। ‘সপ্তপদী’, ‘বিপাশা’, ‘অভিনেত্রী’, ‘ফরিয়াদ’, ‘মঞ্জরী অপেরা’, ‘শুকসারি কথা’, ‘যোগভ্রষ্ট’, ‘আরোগ্য নিকেতন’ প্রভৃতি লেখকের নাগরিক উপন্যাসগুলো চলচ্চিত্রায়ণের জন্য সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে ঠিকই কিন্তু তাঁর ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’, ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, ‘গণদেবতা’, ‘পঞ্চগ্রাম’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’ প্রভৃতি আঞ্চলিক- ধ্রুপদী উপন্যাসগুলো তারাশঙ্করকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন দিয়েছে।


তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় 

এই খেদ আমার মনে - ভালোবেসে মিটল না এ সাধ, কুলাল না এ জীবনে! হায় - জীবন এত ছোট কেনে? এ ভুবনে!


বাংলা সাহিত্যকে তারাশঙ্কর প্রান্তিক মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন কিংবা বলা যায় প্রান্তিক মানুষজন যাঁর লেখায় উঠে এসেছিল, আশ্চর্য দৃঢ়তায়, তাদের ক্ষোভ বঞ্চনা লড়াই আর বিদ্রোহ নিয়ে। তাই কালের নিয়মে অবলুপ্তির পথে যে প্রান্তিক জনজাতি, তাদের জীবনেতিহাস, সংস্কৃতি, তাদের গাথা-গল্প, সংস্কার জনশ্রুতি—সবই তিনি গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর সাহিত্যে সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ এক মেদহীন সরল অথচ ঋজু গদ্যভাষায় বর্ণিত হয়েছে। আপাত নিরস ও রুক্ষ হলেও সে ভাষার অর্ন্তনিহিত মাধুর্য তার আন্তরিক সাবলীলতা আমাদেরকে মুগ্ধ করে।


কথাসাহিত্যক তারাশঙ্করের উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় ৬৫। গল্পগ্রন্থ আছে ৬৩। ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের সংকলন, ৪টি স্মৃতিকথা, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, একটি প্রহসন ও একটি কবিতা সংকলন ‘ত্রিপত্র’। তাঁর রচিত কাহিনী অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রভূত সাফল্যের মুখ দেখায়, তিনি মুম্বাই থেকে ডাক পেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের কাহিনীকার হিসেবে যোগ দেওয়ার। উচ্চ বেতনের প্রলোভন ছিল। কিন্তু যাননি। সাহিত্য রচনায় তিনি সাফল্যের শীর্ষে উঠেছিলেন। পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কার। ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’, ‘সাহিত্য আকাদেমি’, ‘জ্ঞানপীঠ’, ‘শরৎ স্মৃতি পুরস্কার’, ‘জগত্তারিণী স্মৃতি পদক’। পেয়েছেন ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি। ১৯৫৭ সালে চিন সরকারের আমন্ত্রণে সেদেশে সফরে যান। ১৯৫৮ তে অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সঙ্ঘেরের প্রস্তুতি সভায় যোগ দিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন যান। এরপর তাসখন্দে অনুষ্ঠিত অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। তবুও ‘গেঁয়ো’ ‘স্থূল লেখক’ এ অপবাদ সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে।


তারাশঙ্কর ছিলেন জীবন রসিক। অভাব দুঃখ ও স্বপ্ন ভঙ্গের সঙ্গে লড়াই করেছেন আজীবন। আর এই শক্তি তিনি পেয়েছিলেন মা প্রভাবতী দেবী ও স্ত্রী উমাশশী দেবী, তাঁর ‘বড়বৌ’- এর কাছ থেকে। 


জীবনকে পুরোপুরি ভালবেসে ছিলেন। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো তাই দোষেগুণে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে।


তিনি যেমন মানুষকে ভালবেসেছিলেন, নিজ পরিবার আত্মজনকে ভালবেসেছিলেন, সর্বোপরি নিজের দেশকেও ভালবেসেছিলেন। তাঁর সাহিত্য তাই এক অর্থে দেশ বন্দনা। ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘গণদেবতা’, ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের আখ্যান চরিত্র সেই কথাই বলে। তবু তিনি বার বার বিরূপ সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছেন‌। রক্তাক্ত হয়েছেন। এমনকি ‘সন্দীপন পাঠশালা’ উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হতে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে হেয় করা হয়েছে, এই অভিযোগ তুলে তাঁকে হাওড়ায় শারীরিক ভাবে নিগৃহীত করা হয়। যখন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে বিচার চলছিল, অপরাধীদের চিনতে পেরেও তিনি অস্বীকার করেছিলেন। পরে এ প্রসঙ্গে বলেন, “ওদের ক্ষমা করে দিলুম। আসলে ওরা তো আমার এই দেশের মানুষ। তাছাড়া ওরা স্বেচ্ছায় এ কাজ করেনি, পিছন থেকে ওদের উত্তেজিত করেছিল ও নির্দেশ দিয়েছিল কোনও রাজনৈতিক বড় মাথা।” এই হলেন তারাশঙ্কর। তিনি পুরস্কারে যতটা উচ্ছ্বসিত আনন্দিত, আবার অপমান ও তাচ্ছিল্যে ঠিক ততটাই আহত হন। তবু প্রকৃত জীবন রসিকের মতো মেনে নিয়েছিলেন এই অমৃত ও গরলকে।


বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের যে তিনটি উপন্যাস জনপ্রিয়তায় মিথ হয়ে আছে, তার হল ‘শেষের কবিতা’, ‘দেবদাস’ ও ‘কবি’। রাঢ়বঙ্গের কবিগান ও ঝুমুর নাচের প্রতি তাঁর খুব টান ছিল। তিনি রাত্রি জেগে এইসব পালাগান ও আসরের নাচ দেখতেন। সেই অভিজ্ঞতায় তিনি রচনা করলেন ‘কবি’ উপন্যাস। লুপ্তপ্রায় ঝুমুর ও কবিগানকে অমর করে দিলেন কাহিনীতে। নিতাই কবিয়াল, বসন, ঠাকুরঝি, রাজন আর তাদের জীবনকে নিয়ে এক মায়ার জগৎ তৈরি করলেন। আমার মনে হয় তারাশঙ্কর নিজেই এই কালের কবিয়াল। মানুষ আর দেশ-এর প্রতি আবুক ভালবাসায় তিনি যেন সারাজীবন ধরে জীবনের কবিগান গেয়ে গেছেন। তবু সাধ মেটেনি। কবি উপন্যাসের শেষে কবিয়াল নিতাইয়ের মুখ দিয়ে তাই তিনি বলিয়েছেন, “ভালোবেসে মিটল না সাধ, হায় জীবন এত ছোট কেনে!”




• তথ্য সূত্র
১. ‘আমার কালের কথা’ - তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
২. ‘আমার সাহিত্য জীবন’ - তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
৩. ‘সাহিত্যের সত্য’ — তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
৪. ‘দেশ’ পত্রিকা তারাশঙ্কর সংখ্যা, ২০২৩









ছবি : গুগল




কনকলতা বড়ুয়া
 
দুর্দমনীয় সাহস ও ত্যাগের প্রতীক

পাপড়ি ভট্টাচার্য




৯২৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর অবিভক্ত আসামের দারাং জেলার গোহপুরের বরঙ্গাবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কনকলতা বড়ুয়া। পিতা কৃষ্ণকান্ত বড়ুয়া এবং মাতা কর্ণেশ্বরী বড়ুয়া। ঠাকুরদা ঘনকান্ত বড়ুয়া ছিলেন আসামের দারাং জেলার একজন উল্লেখযোগ্য শিকারি, তিনি তাঁর প্রথম নাতনির নাম রাখেন “কনক”, যার অর্থ ‘সোনার টুকরো’। কনকলতা যে বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন পরাক্রমশালী সাবেক আহোম রাজ্যের ‘দোলকসারিয়া বড়ুয়া’ পরিবারের উত্তরসূরি, যারা ‘দোলকসারিয়া’ উপাধি ত্যাগ করে শুধু ‘বড়ুয়া’ উপাধি ধারণ করেছিল। এই ‘দোলকসারিয়া বড়ুয়া’-রা নিজেদের ভগবান ইন্দ্রের প্রত্যক্ষ বংশধর বলে মনে করতেন এবং আহোম রাজাদের রক্ষীবাহিনির সর্বাধিনায়ক বলে বিবেচিত হতেন।


কনকলতার মা কর্ণেশ্বরী বড়ুয়া তাঁর জন্মের মাত্র কয়েক বছর পরেই মারা যান, ফলস্বরূপ কনকলতার ঠাকুরদার নির্দেশে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন কনকলতার বাবা। কনকলতার সৎমা বাড়িতে এসে কনকলতাকে আপন সন্তানের মতো বড় করতে থাকেন। কনকলতার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশিলা। তবে, কয়েকদিন পরে কৃষ্ণকান্ত বড়ুয়াও মারা যান, কনকলতার বয়স তখন সবে তেরো বছর। বৃদ্ধ বয়সে শক্ত-সামর্থ্য ছেলের মৃত্যুতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ঘনকান্ত, শিকারের থেকে সম্পূর্ণ অবসর গ্রহণ করেন তিনি।


অকালে পিতামাতার প্রয়াণের পর কনকলতা তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তাছাড়া, সেইসময়ে মেয়েদের লেখাপড়া করা সহজসাধ্য বিষয় ছিল না। সমাজ নারীদের শিক্ষাগ্রহণ করে শিক্ষিত হওয়াকে কটূ চোখে দেখত। তারপর, পিতৃমাতৃহীনা কনকলতার পক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর  শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল না, ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার সাথে সাথেই কনকলতার শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। শিক্ষাজীবনে ইতি টানার পর ঠাকুরদা ও সৎমাকে সাহায্য করার জন্য কনকলতাকে পরিবারের আংশিক দায়িত্বও নিতে হয়েছিল।


এদিকে সেইসময় দেশে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলন তীব্রতর হয়। কনকলতা তখন প্রায় অষ্টাদশী। ১৯৪০ এর গণআন্দোলন আসামেও শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল। প্রায় আঠারো বছর বয়সী কনকলতা ব্রিটিশদের শোষণমূলক নীতি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই মাতৃভূমিকে বিদেশি শাসনমুক্ত করতে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন কনকলতা। পারিবারিক দায়িত্ব এবং বাধা সত্ত্বেও, তিনি আন্দোলনে একজন প্রধান স্বেচ্ছাসেবিকার ভূমিকা নিতে এগিয়ে আসেন।


কনকলতা ছিলেন স্বল্পভাষী এবং নম্র তরুণী। তাঁর পরিমার্জিত আচার-ব্যাবহারের কারণে সবাই তাকে ভালবাসত। জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে দীক্ষিত হয়েছিলেন কনকলতা, তিনি বিশ্বাস করতেন যে অহিংস নীতির মাধ্যমে ব্রিটিশদের ভারতের মাটি থেকে বিতাড়িত করা যেতে পারে। তবে, অহিংস নীতির পাশাপাশি দীক্ষিত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী দ্বারা ভারতীয় জনমানসের নিকট প্রচারিত মূল মন্ত্রে, সেই মহামন্ত্র ছিল – “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে” অর্থাৎ “করবো অথবা মরবো”। এই মহামন্ত্রে দীক্ষিত কনকলতা সচেষ্ট হয়েছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসুর “আজাদ হিন্দ ফৌজ”-এ যোগদানের জন্যেও, তবে নাবালিকা হওয়ার কারণে তাঁর যোগদানের জন্য আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।



ঐতিহাসিক গোহপুর পুলিশ স্টেশনের সামনে শহীদ কনকলতা বড়ুয়া এবং মুকুন্দ কাকাটির ব্রোঞ্জের প্রতিকৃতি, ছবি : গুগল 



উনবিংশ শতকের চল্লিশের দশক, যে মহিলা স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষীদের দলে কনকলতা ছিলেন, সেই মহিলা দলের নেতৃত্বে ছিলেন পুষ্পলতা দাস। কনকলতা পুষ্পলতা দাসের কাছে গিয়ে তাঁর নাম ‘মৃত্যুবাহিনী’-তে লেখাতে বলেন। পুষ্পলতা দাস বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, এবং কনকলতাকে পরামর্শ দেন অন্য কোনো উপায়ের মাধ্যমে দেশসেবায় নিযুক্ত হয়ে তাঁর নিজের আত্মবিশ্বাসের উন্নতি করতে। যে সমস্ত উপায়ে ‘মৃত্যুবাহিনীর’ মতো ভয়ানক সংগঠনে কনকলতাকে যোগ দিতে হবেনা, কারণ ‘মৃত্যুবাহিনী’-তে যোগদানকারীর  যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যু ঘটতে পারে। কিন্তু কনকলতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার শিরায় শিরায় রয়েছে দেশপ্রেমের অনুভূতি। আমি আমার দেশকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি, আমি দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করলে আমার জীবন অর্থবহ হবে।” পুষ্পলতা দাস লক্ষ্য করেন, দেশের প্রতি প্রায় অষ্টাদশী এই মেয়েটির গভীর ভালোবাসা। কনকলতার অনমনীয় জেদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে, আর উপায়ন্তর না দেখে, পুষ্পলতা দাস অনেক ভাবনার পর অবশেষে কনকলতাকে ‘মৃত্যুবাহিনীতে’ তালিকাভুক্ত করেন।


১৯৪২ সালে, আসামের দারাং জেলায় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল, তবে আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তোলার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে, একটি বিশাল পদযাত্রার আয়োজন করা হবে এবং সেই পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার জন্য গোহপুর থানায় জাতীয় পতাকা ওড়ানোর উদ্দেশ্যে থানার দিকে যাত্রা করবে। ‘মৃত্যুবাহিনীতে’ তালিকাভুক্ত থাকায় কনকলতাকেও আহ্বান করা হয়েছিল এই পদযাত্রার সর্বাগ্রে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য, আহ্বানে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন কনকলতা। মৃত্যুবাহিনীতে নাম অন্তর্ভুক্তি হওয়ার পর, এবং প্রায় কিছুসময়ের মধ্যেই পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান পাওয়ার পর কনকলতা তাঁর দলনেত্রী পুষ্পলতা দাসকে বলেন, “প্রত্যেক মহিলার অন্তরে দেশপ্রেমের অনুভূতি থাকে। তাঁরা তাঁদের দেশ, তাঁদের জাতিকে ভালবাসে এবং এই ভালবাসার বিনিময়ে আমি, কনকলতা, তেরঙ্গা পতাকা হাতে নিয়ে গোহপুর থানার দিকে মিছিল নিয়ে থানায় প্রবেশ করব।”


মনে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ ও মন্ত্রকে সম্বল করে পদযাত্রায় যোগ দিতে এগিয়ে আসেন কনকলতা। তাঁর নিজের বৃদ্ধ ঠাকুরদার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন কনকলতা বড়ুয়া। নিজের ঠাকুরদাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর নিজকর্মের মাধ্যমে তাঁদের আহোম বংশের খ্যাতি বিদ্যমান রাখবেন, তাঁর কর্ম সর্বদা তাঁর বংশ ও দেশকে গৌরবান্বিত করবে।


ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে আসামের মাটিতে সফল করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৪২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আসামের অসংখ্য যুবক-যুবতীরা সহর্ষে সন্নিবেশিত হয়ে পদযাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন এবং সেই বিশাল পদযাত্রা গোহপুর থানার দিকে যাত্রা করেছিল। সকাল থেকে সূচিত হওয়া এই বিশাল পদযাত্রার সর্বাগ্রে কনকলতা তেরঙ্গা পতাকা নিজের হাতে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হতে থাকেন। বেলা ১১টার সময় পদযাত্রাটি গোহপুর থানার সামনে পৌঁছায়। থানার নিকটবর্তী হতেই পুলিশ পদযাত্রাকে বাধা দেয়। কনকলতা থানার অফিসার ইনচার্জ রেবতী মোহন সোম এবং তার অধস্তন অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের পদযাত্রাকে রাস্তা দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু পুলিশ তাদের আর অগ্রসর হতে দেয়নি। পুলিশের হুংকার উপেক্ষা করে কনকলতা উচ্চস্বরে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি তুলে থানায় ঢুকে পড়েন। ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাককে অমান্য করে ভারতের তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা তোলার চেষ্টা করলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেবতী মোহন সোম তাঁর অধস্তন পুলিশদের গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। কনকলতা বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, তাঁর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও রক্তস্নাত হাতে শক্ত করে তুলে ধরে রেখেছিলেন তেরঙ্গা পতাকাটিকে। দেশের স্বার্থে শহীদ হন কনকলতা বড়ুয়া।


গোহপুর থানায় যাওয়ার সময় বীরাঙ্গনা কনকলতা বলেছিলেন : “আমি আসামের প্রতিটি জমির মূল্য বুঝি। মাতৃভূমিকে শোষণ করার অধিকার কোনো বিদেশীর নেই। আমরা ভারতীয়, আমরা অসমীয়া। আমরা আমাদের উপর কোনো অত্যাচার ও শোষণ সহ্য করব না।”


এই মহান নারী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু দেশের স্বার্থে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে তিনি যে আদর্শ রেখে গেছেন তা আজও নতুন প্রজন্মকে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম শেখাচ্ছে। কনকলতা আমাদের মাঝে চির অমর হয়ে থাকবেন। বর্তমান গোহপুর টাউন সেন্টারের গোহপুর থানার সামনে বারপুখুরির তীরে কনকলতা বড়ুয়ার স্মরণে এক পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। কনকলতার মূর্তিটি শহীদ বীরবালার আত্মত্যাগের একাশি বছর পরেও, তাঁর অপরিসীম সাহস ও আত্মবলিদানের স্বাক্ষর বহন করে চলছে।




তথ্যঋণ :
(১) নীলিমা বৰা, “অকণি বীৰাংগনা কনকলতা”, বনফুল: গুৱাহাটী- ৫, ২০১৪।
(২) গুপ্তজিৎ পাঠক, “আসামিজ ওমেন ইন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স মুভমেন্ট: উইথ আ স্পেশাল এম্ফ্যাসিস অন কনকলতা বড়ুয়া”, নয়াদিল্লি: মিত্তাল পাবলিকেশন্স, ২০০৮।
(৩) “কনকলতা বড়ুয়ার মূর্তি উন্মোচন”, আসাম ট্রাইব্যুনাল, ১লা অক্টোবর ২০১১।
(৪) শিৱনাথ বর্মন, “অসমীয়া জীৱনী অভিধান”, ছ’ফিয়া প্রেছ এণ্ড পাব্লিচার্ছ প্রা:লি:, ১৯৯২।


এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ