সংখ্যা
![]() |
অলঙ্করণ : বিং |
বহুরূপী
বুমা ব্যানার্জী দাস
দুধটা এবার না দুইলেই নয়। বারবার ডাকছে গরুটা, গলায় হাপসানো ভাব। বাছুরটাকে খুঁজছে। তাও যেন পা উঠতে চায় না বিশুর। ঠায় বসে থাকে বেলগাছটাতে হেলান দিয়ে। গাছটাও তার মতো ক্ষয়াটে, পাতায় পোকা ধরেছে। গোয়ালের ভিতরটা চোখে পড়ছে এখান থেকে। মানে, যেটা একসময়ে গোয়াল ছিল আরকি। এখন কোনরকমে খাড়া থাকা ক’টা বাঁশের খুঁটি। সামনের বর্ষাটা যাবে বলে মনে হয় না।
- বলি, দুইবে, না ওই এঁড়েটার গভ্ভেই যাবে দুধটা? – রান্নাঘর থেকে তীক্ষ্ণ গলা ভেসে আসে। গলার মালকিনকেও সেই সাথে দেখা যায়, ছেঁড়া আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এদিকপানেই আসছে।
- ধড়াচূড়োটা খুললে হয় না, অনেক ঢং তো হল- সামনে এসে দাঁড়ায় কাতু। বেল গাছটার পাতার ফাঁক দিয়ে আসা শেষ দুপুরের রোদ খসখসে কালো গালের উপর যেন জাফরি কেটেছে। হঠাৎ কেমন বেভুল লাগে বিশুর। নাক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে টুকটুকে লাল শাড়ি পরা যেন সেই নতুন বিয়ে হওয়া কাতু এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। কত বছর হলো যেন, দশ, নাকি বারো। কেমন গোলগাল ছিল তখন, কালো হাতদুটোতে মোটা মোটা ধপধপে শাঁখাদুটো চেপে বসেছিল। নাকের ডগায় মস্ত একটা নোলোক, সেখানে আবার টুলটুল করে দুলছে ছোট্ট একটা লাল রঙের পুঁতি। বরণ না কী সবের শেষে মা যখন হাত ধরে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তার ব্যাটার বউকে, হঠাৎ করে তার চোখে চোখ পড়ে গেছিল কাতুর। বুকের ভিতরটা যেন কেমন করে উঠেছিল বিশুর। বাপটা তখন বেঁচে। ছেলের বিয়েতে তার সে কি হাঁকডাক। তা হাঁকডাকটা মানাতোও বটে তাকে। পরদিন ফুলশয্যের রাতে নতুন বউটাকে বুকে সাপটে ধরে একটা ডাক নাম দিয়ে বসেছিল বিশু। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে ডেকেছিল – কাতুসুন্দরী। কাতুর কালো গালদুটোতে কেমন বেগুনী আভা ছড়িয়ে পড়েছিল তখন।
- চোখ চেয়ে ঘুমালে নাকি? কথাটা কানে যাচ্ছেনা? – কাতুর খর গলা ঝনঝন করে ওঠে। গালদুটো ভেঙে গেছে, সেখানে বেগুনি কেন, কোনো আভাই আর খেলে না। হলদে হয়ে আসা শাঁখাদুটো ঢলঢল করছে কব্জির কাছে। হাত বাড়িয়ে কাতুর হাতটা ধরতে যায় বিশু – একটু পাশে এসে বোসনা বউ।
হাত ঘুরিয়ে মুখের একটা ভঙ্গি করে কাতু – অ! তা পেটের চুলো নিববে কী দিয়ে শুনি? এই হাজামজা বেলপাতা দুটো দিই সেদ্দ করে? তোমার গামচাখান তো শুন্যি।
পাশে রাখা তেলচিটে শূন্য গামছাটার দিকে আরো একবার তাকায় বিশু। যেন বেশ করে তাকালে গামছাটা চাল, আলু, পেঁপে, তেল, সন্দেশ, খুচরো পয়সায় ভরে উঠবে। ছোটবেলার মতো। শিবরাত্রির তিনদিনের মেলার শেষে মাথা থেকে মস্ত জটাটা খুলতে খুলতে তার বাপ ফুলে ওঠা গামছাটা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলত – নাও, খুচরো যা হয়েছে মাসখানেক চলে যাবে, চালটাও ভালো। আজ বেশি করে ভাত খাব সবাই। শেষদিন বাবা মেলা থেকে না ফেরা পর্যন্ত ঘুমাতো না বিশু। মা পেটমোটা গামছার গিঁট খুলে গোপেন ময়রার মাখা সন্দেশের এক খাবলা দলা পাকিয়ে মুখে তুলে দিলে তবে শান্তি। ঘুম ঘুম চোখে জিভে সন্দেশের সেই সোয়াদ নিয়ে শুতে যেত বিশু। বাবার খুলে রাখা জটাটা থেকে আঠা, ঘাম আর কীসব মেশানো অদ্ভুত একটা গন্ধ উঠত, বোধহয় ভরসার গন্ধ।
তার বাপ ছিল তল্লাটের সেরা সং, চকচকে সাদা রঙ মেখে জটা মাথায় পেলাস্টিকের সাপ গলায় মেলার মাঝে দাঁড়ালে কে বলবে কৈলেশ থেকে আসা মহাদেব নয়। তাদের গাঁয়ের শিবরাত্রির মেলার খ্যাতি ছিল খুব, লোকে বলত ভোলানাথের মেলা। দিন রাত দুই বেলা ধরেই মোচ্ছব। আশপাশের পাঁচ সাতটা গাঁ উজাড় করে লোক আসত ওই তিনটে দিন ধরে, সেই সঙ্গে সঙের দল। তবে বিশুর বাবার মতো কেউ নয়। মেলার ঠিক মাঝখানটিতে হেই বড় মন্দির, তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াতো সং সাজা মানুষগুলো। একবার কলকেতা থেকে একদল বাবু এসেছিল সং দেখতে। সেবার অনেক রাতে গলায় সোনালী মেডেল ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরেছিল বিশুর বাপ শিবপদ বহুরূপী। নাকি তার সাজ, তার হাব ভাবের কাছে অন্য কোনো সং দাঁড়াতেই পারেনি। পরদিন মা মাংস ভাত রান্না করে খাইয়েছিল গোটা গ্রামকে। বিশু তিনবার করে চেয়ে চেয়ে খেয়েছিল। বাবা হাসছিল আর বলছিল মেলার কত লোক মন্দির ছেড়ে তাকেই নাকি এসে পেন্নাম ঠুকেছে।
সেই মেডেলটা আজও রাখা আছে বিশুর বাক্সে।
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে বিশু। মেলার সে রমরমাও আর নেই, সং দেখার গরজও নেই কারুর। কোনরকমে টিমটিম করে টিকে আছে বটে মেলাটা, তবে তার চরিত্তির একেবারে পাল্টে গেছে। কেমনধারার সব খেলনা বিক্কিরি হয় আজকাল, সেসব বিশু আগে চোখেও দেখেনি। খাবারদাবারেরও রকম পাল্টেছে। গোপেন ময়রা গত হওয়ার পর তার ছেলে মিষ্টির দোকানটা তুলে দিয়ে কী সব নুটুল না কীসের দোকান দিয়েছে কয়েক বছর হলো। সেসব দেখলে খাওয়া তো দূরে থাক, গাটা কেমন গুলিয়ে ওঠে বিশুর।
গেলবারেও দু একটা সং এসেছিল মেলায়, এবারে সব ভোঁভা। মন্দিরের পাশে বোকার মতো খানিক দাঁড়িয়ে থেকে চলে এসেছে বিশু। সং দেখলে লোকে এখন ভিখারী ভাবে। শিবপদ বহুরূপীর ছেলে কিনা ভিক্ষে করবে মেলায়, ছিঃ। তবে লোককেও খুব দোষ দেওয়া যায় না, তার সাজপোশাকের যা হাল।
বাঘছালটা ছিঁড়ে এসেছে, জটাটাও ছিরকুটে। মাথায় পরতে গিয়ে কী ভেবে একবার শুঁকে দেখেছিল বিশু। নাহ সেই ভরসার গন্ধটা আর নেই। এখন জটাটা মাথায় যেন চেপে বসেছে, ভার লাগছে মাথাটা। তবু কিছুতেই খুলে ফেলতে পারছে না সে। কানের মধ্যে এখনো দপদপ করছে কথাটা।
সে তো বাবা যেমন শিখিয়েছিল হাতে ধরে, ঠিক তেমনটাই সেজেছিল। সকাল থেকে চকচকে সাদা রঙ লেপেছিল গা ময়, ভাগ্যিস তলানি রঙটুকু পড়েছিল কৌটোয়, নইলে এই বছর আর রঙ কিনতো কোথা থেকে। ফেঁসে যাওয়া বাঘছালটার ফাঁক ফোকর দিয়ে তার কটকটে নীল হাফ প্যান্টটা দেখা যাচ্ছিল যদিও। জটাটা মাথার উপর যত্ন করে বসিয়ে চটা ওঠা আয়নার দিকে একবার তাকিয়েও নিয়েছিল। গাঢ় কাজলে ভ্রূ দুটো আঁকা, চোখের কোণেও কাজলের ছোঁয়া। তৃতীয় নয়নটাও বড় যত্নে এঁকেছিল সে। নাহ মন্দ দেখাচ্ছিল না তাকে, অন্তত বিশুর তাই মনে হয়েছিল। শিবপদ বহুরূপীর মতো দবদবানি না থাকলেও নেহাত ফেলে দেওয়ার মতো একেবারেই নয়। মেলার মন্দিরের ধারে ত্রিশূলখানা বাগিয়ে ধরে খাড়া দাঁড়িয়ে ছিল বিশু। কেউ বিশেষ একটা গা করছিল না। সে না করুক, কোথাকার একটা বাচ্চা মন্দিরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আঙুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে বলে কিনা – ওই দেখো মা, রঙ মেখে কেমন ভুত সেজেছে। মা টাও তেমন। বেমালুম বলল – চল চল, এখুনি ভিক্ষে চাইবে। ও সব হলো ভিক্ষে করার নানা ফিকির।
মাথাটা ঝাঁঝাঁ করে উঠেছিল বিশুর, আর দাঁড়ায়নি মেলায়।
- দুধটা না হলে, কী বিক্কিরি করে চাল কিনবে শুনি? আমাকে? চালের কৌটোতে তো একটা ধানও পড়ে নেই – কাতুর গলা ঝনঝন করে ওঠে আবার। অসহায় চোখে তাকায় বিশু। সাদা রঙ করা মুখে, আঁকা ভুরুতে চোখের কাজলে কপালের তৃতীয় নয়নে কী ফুটে ওঠে কে জানে। কাতু হঠাৎ নরম গলায় বলে – রঙ ধুয়ে জটা খুলে সুস্থ হয়ে বসোগে, আমি দুধটা দুয়ে যাচ্ছি।
বাছুরটা কোথ্থেকে লাফাতে লাফাতে এসে বাঁটে মুখ লাগায়। কে জানে কেন, আটকাতে গিয়েও থেমে যায় দুজনেই। কেমন একটা মায়া।
- ঘরে চ’ বউ, থাক আজ দুধটা।
আচমকা বৃষ্টি নামে মাথার উপর। পাশের বুড়ো বেলগাছ থেকে টুপ করে পাতা ঝরে পড়ে বিশুর জটার উপর। নিজের শিরা ওঠা রঙ মাখা কেঠো হাতটা কাতুর খসখসে কালো রোগা হাতটার উপর রাখে বিশু।
টালির ঘরে ফেরে কাত্যায়নী আর বিশ্বম্ভর।