শারদ
সংখ্যা


Surrealism contemporary Bengali Poetry


অনুপ ঘোষাল

গাছ হলে, একবার


একবার অন্তত গাছ হব। 

নদীর ধারে সটান দাঁড়িয়ে থাকা গাছ। 


আবির রঙের ছায়া ফেলে রাখি জলে। 

সাদা মেঘ নেয় ক্ষত। আলো অভিমান। 


বাঁয়ে ডালিমের বন। ডানে ডুরে লাল শাড়ি।

নৌকার ছই মেখে মেটে আলো নিবে আসে রোজ।


 ও কি কালজানি? 

 নাকি ঢিলেঢালা বাঁশলই ? 

 

এখানে শব্দ মানে জল-ফড়িংয়ের ডানা।

মুখিয়ে থাকা আলো, জলপাই বনের দিক।


বাকি সব ঘোরতর নির্জন।

অংশত মেঘলা আকাশ।



অনিমেষ গুপ্ত

যে মানুষ মানচিত্র বোঝে

  

যে মানুষ অপেক্ষা বোঝে, সে জানে সব মেঘ গর্ভবতী হয়না। তিথি, পাঁজি ছাড়াই

নারকেলের শাঁসের মতো উৎফুল্লতা লেগে থাকে সেইসব অন্তঃসত্ত্বা মেঘে।

সারা আকাশ বেড়ে অদ্বৈত হাওয়া বয় সারা দিনমান।  মেঘ ফুটে রোদ বেরলে,

একেকটি রোদের গায়ে লেখা থাকে অধিকারীর নাম। ঘর নিকিয়ে, দরজা জানলার

খিল-কপাট খুলে সেই হিরন্ময়ের আসার পথ প্রস্তুত রাখতে হয়।


অপেক্ষা প্রবল হলে সে এক নরম আর কিংখাবী উষ্ণতা আনে, সঙ্গোপনে

কানের কাছে শোনায়— চাইলেও এ মায়ার সংসারে নিজের বলতে রাখা যায়না

কিছু। বাঁচতে গেলে শিখতে হয় নেই-তে বেঁধে থাকার আশ্চর্য্য কৌশল।


যে মানুষ মানচিত্র বোঝে, সেই জানে কোনপথে গেলে মণিকোঠা আর 

কোনদিকে শুধু উলুর বন!






আশিস ঘোষ

অবাধ্য মন


রাখাল মন অবাধ্য চিরকাল। মানুষের এত গালাগাল-

শোধরালো না। একগুঁয়ে, গাঙচিল মর্জিতেই খিল।

বামপন্থা ডানপন্থা সবেতেই দেখেছে ভিড়,

কেবল সিংহদুয়ারে আপনজন-ই অমিল।


যে শরীরে হতচ্ছাড়ার বাস। মাসের আদ্দেক সময় উপবাস-

তবু ঘর ছাড়ল না। দীর্ঘমেয়াদি অন্তবর্তী স্থগিতাদেশ।

ঘুণ-ধরা দরজার ভেজা কাঠে ছত্রাকের বাসা, 

কোনও ফিটন নেই, হাইওয়ে কিংবা এলাচের সুবাস।


রাখাল মন অবাধ্য চিরকাল। মানুষের এত গালাগাল-

শোধরালো না। জোনাকির মিছিলে হেঁটে গেল চিরটাকাল।



খুকু ভূঞ্যা

ভয়ংকর ক্ষুধা পেরিয়ে


প্রদীপ আগুনে নয়, জ্বলে ওঠে বিশ্বাসে

হেজে গেলে বর্ষার ধানের মতো

হাজার হাতের আগলেও সলতে পায় না শিখা,

দশ কোণ  দিয়ে ধেয়ে আসে ঝড়,  মাতাল ঘূর্ণী-

ওলট পালট দৃশ্যের চিত্রপট নিয়ে চোখ চেয়ে থাকে-

পথিকের চলাচল থেমে যায়

রুগ্ন পথ শুয়ে থাকে মৃত সাপের মতো


আগুন ঘর বাঁধে না কখনও

তার প্রেমিকা নেই,  বিরহ নেই

ভয়ংকর ক্ষুধায় ক্ষুধায়  তার মরণ সমর্পণ

দহনে নয়, আলো কুচির মালা নিয়ে এসো

কত কুঁড়ে অন্ধকার, কত কোল হৃদয়- বন্ধ্যা উঠোন

উল্টানো প্রদীপের ধুলোকালি ঝেড়ে এবার তাকে 

উত্তরীয় পরাও, সন্ন্যাসী বাউল -




তৈমুর খান 

মায়ামৃগ


 যত দূরেই থাকো তুমি 

এই অক্ষর এই আঙ্গুলের ছোঁয়া 

তোমাকে বাজাবে।


সদ্য স্নান করা তোমার শরীরে জলবিন্দু 

হয়ে 

গড়িয়ে নামবে বৃষ্টি রেখায়।

অথবা অকস্মাৎ একা একা ভিজে যাবে 

আকাশের নীলে।


তুমি নির্জন ভালোবাসায় সেখানেই এক 

নির্জন চোর  স্বপ্নে ঢুকে যাবে।


 অসম্ভব রঙিন হয়ে উঠবে তোমার গাল

ফ্যাকাসে শীতের ঠোঁটে রোদ মেখে নেবে

তুমি বিহ্বল হয়ে সমুদ্রে এসে 

এক একটা পাতার নৌকা ভাসিয়ে দেবে

দূরে... 


 তোমার চোখের শান্ত নির্জন গভীরে

ভেসে উঠব আমি 


তোমার নিজস্ব বেদনায় আমাকে ছুঁয়ে নেবে।



বনমালী নন্দী

সাদাচিঠি


হল না লেখা

পাখিজানালার মাঠকথা

জানালা শিক্ষক হলে

চোখের মৃত্যু ঘটে

ঠিকানা বিহীন আয়ু

তার ধানমাঠ, বাগান বাড়ি

ব্রততী তোমার মানচিত্রের মুখখানি

মিষ্টি রোদের ফুল

জল অক্ষরে অক্ষরে নদীবক্ষে

নৌকা গান 

সব কিছুই রহে গেল আকাশের নীলখামে

রদ্দুর কলম প্রতিদিন কত চিঠি লিখে 

এক একটি চিঠি দরজার জন্ম দেয়

থাকে বৃষ্টির বিজ্ঞাপন

কিংবা 

আলোর হাল লাঙ্গল 

বযস তেঁতুল পাতায় বাড়ে

ঝরে পড়ে ছায়াচাখে

অশ্রুরা মাটির বাড়ি ঘর বানায়, বাগান ও

পড়ে থাকে জীবন আলপথে

চৈত্রের নামাবলী

ক্রমশ মৃত্যু নামে মেয়েটির 

প্রেমে পড়ি

তুমি সরিয়ে না ছায়াতল

তৃষ্ণার নদীকথা

শরীর চশমা হয়

নিরক্ষর নক্ষত্রের ধানমাঠে

আত্মা হয় বীজধান

নামে উলঙ্গ অন্ধকার 

দেহ দৃষ্টি হারায়

যন্ত্রণাগুলি অবিকল নিঃশ্বাসের শালগ্রাম শীলা

আজ ও একসমুদ্র কালি লেখা হল না

তোমাকে খুব ভালোবাসি




বিশ্বজিৎ দেব

অর্থবছর


ভাঙা সাঁকোটিও জুড়ে যাবে নতুন অর্থবছরে 

জল এসে ঢুকবে পাশের গন্ধর্ব পাড়ায়

টানা মরশুম যেখানে পৌঁছতে পারেনি মৌসুমীবায়ু 

কঙ্কণ কিঙ্কিণি 


বায়ুপ্রকল্পের ঘরে এই নিয়ে

আষাঢের প্রেরণার গান,উপুড় গাত্রবরণ

সামান্য বৃষ্টিতেই বিগলিত 

সর্বাঙ্গের বিনয়ী ছত্রাক 


নতুন অর্থবছরে চামড়ায়

নিজেই সে বেঁধে নেবে ঠাট

বাজনার রেশ ধরে উড়ে এসে বসবে পাতাটি

মুন্ডিত শ্রমণের মত ছায়াদের গাছ



বৈজয়ন্ত রাহা

ধোঁকা


দিকশূন্যপুর থেকে আরেকটু এগোলে তুমি প্রতারণা 

বলে একটি রাস্তা পাবে 

তারপর কয়েক মাইল -

বিরহলোক; 

যেখানে বৃক্ষের মর্মরে ব্যথিত বাতাস বয়ে যায়

মাটি কেঁদে উঠলে ঝরাপাতা চোখের পল্লবে 

শিশিরের ঝাপটা দেয় 

নাদের আলি জনৈক কিশোরকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে 

নীল খামে প্রেমিকার গা বেয়ে রাত্রি নামে 

আগুনের চাদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকে প্রেম 

আর 

বিপরীত বিহারে মগ্ন থাকে কস্তুরী মৃগ। 


আমি নিজেকে একচোখ মেরে সেসব গোপন 

জাদুঘরে তুলে রেখেছি।  



রবিন বণিক 

বোধ

 

এতোটা মৃত্যুর পর হেঁটে যায় বোধ

পায়ে পায়ে জন্মছায়া—

জানো– ও পাড়ার ফুল পিশির কোল ছুঁয়ে প্রতিদিন

এক নতুন অন্ধকার—

জিজ্ঞেস করলে বলে আমি আজন্ম পিরামিড

আমি এক খোলা মিশর

আমাকে শব্দ শেখাও, ধানক্ষেতের শব্দ–

এতোটা মৃত্যুর পরেও হেঁটে যায় বোধও

উড়ন্ত পালকে দীর্ঘ চুম্বন—

দেখো– ফুলপিশির শরীর জুড়ে ঝুলন্ত ঈশ্বর

জিজ্ঞেস করলে বলে আমি এক উড়ন্ত ফানুস

আমি এক সরল মহাকাশ

আমাকে কাব্য শোনাও, অলৌকিক কাব্য


এতোটা মৃত্যুর পরেও হেঁটে যায় বোধ—



শ্যামশ্রী রায় কর্মকার 

সমুদ্র


আমাদের ঠোঁটে ঠোঁটে রুদ্র হলেন মহাকাল

আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে সসাগরা ঢেউ ভেঙে গেল

এসো জানু পেতে এই ঢেউ নাও, এ মগ্নতা নাও

এত যে আবহ গড়ি, জেগেছ কি মন্দার পর্বত? 

তোমাকে ঘটনা ভেবে সরিয়ে দিইনি ইতিহাসে 

বাঁকের তিলের মতো গোপন আলোতে দেখি রোজ

এইসব উন্মোচন, প্রস্তুতিবিহীন চুরমার 

আমাদের ভেতরের কৃষ্ণসার, চাঁদের বাহন




সুমন পাটারী

চা বিক্রেতা


কেটলি থেকে চা ঢেলে একটি লোক

বিক্রি করতে বেরিয়েছে স্টেশনে

আর চায়ের কাপে

বিস্কুটের তলিয়ে যাওয়ার মতো তলিয়ে যাচ্ছে মানুষজন

স্কুল কলেজ ব্যাঙ্ক বিমা সমেত একটি দেশ


সে গাঢ় চা খাচ্ছে কর্পোরেট

আর মেদ নিয়ে চলে যাচ্ছে ব্রিটেনে।





সৌরভ বর্ধন

নারীমুখ


খুব কাছে টানলে স্বাধীন একটি নারীমুখ

অবলীলায় চেয়ে থাকে উন্মুক্ত কৃষ্ণের দিকে;

তাদের একত্রে জুড়ে দিলে অবিকল অখণ্ড দ্বীপ!


অথচ, এই দৃশ্যকে স্থির একটি চিত্র বললে

ক্রোধান্বিত শ্বাপদের মতো পাশে সরে যায় মেঘ,

ঝুপড়ির ভেতর থেকে আকাশে উঠে আসে রোদ, মাথা                                                           ঝিমঝিম 




হারাধন চৌধুরী

পরিগ্রহ


বলেছিলে, তুমি আমার অধরা মাধুরী নও।

দরজা তোমার জন্য দরজা খুলে রাখতে হবে

আমার ঘরে তুমি প্রবেশ করবে, বসবে,‌ ইচ্ছে হলে শোবেও

পায়চারি করবে নদী ও অরণ্য লাগোয়া ব্যালকনিতে

তবে এভাবে ধরা কখন দেবে, তা আমি টের পাব না!


তুমি ততক্ষণই থাকবে, যতক্ষণ পরিচর্যা হবে তোমার

তোমার মনে উপেক্ষা, অনাদরের অনুভব হবে না এক রত্তিও

তোমাকে আমি বিকিকিনির সামগ্রী করে তুলব না কখনো।


বলেছিলে, তুমি চলে গেলে আমার বুঝতে দেরি হবে না।

তুমি কেন বেছে বেছে কবিতার মতো নিষ্ঠুর হতে গেলে—

আর কি কোনো রূপ ছিল না পরিগ্রহের?




ডা. শান্তনু পাত্র

কপালে আলো


রোজ রোজ ভাবি সেই জানালার কথা, লিখে যাবো...

ফাঁকা থাকলেই বাড়ি, চুপিচুপি কিশোরী দাঁড়াতো,  

ভ্রুসন্ধিতে কুমকুম-আলো‌। পড়া ভুলে―

সে আলো দেখতে গিয়ে আনমনা হয়েছি অজান্তে...

মন তো অশ্বের মতো, সামনে পরীক্ষা তাই লাগাম ধরেছি।


সাড়াটুকু না পেয়ে আমার ফিরে গেছে মেয়ে অন্দরমহলে 

সরে গেছে শীর্ণ হাত ঝরোকায় আঁকিবুকি কেটে


ঘুরিয়ে নিয়েছি চোখ, সে লিপির পাঠোদ্ধার তখন করিনি।

সময়ের মেঘ ছোটে, গতি নিয়ে আমিও ছুটেছি...



পঁচিশ বছর পর পুরোনো আবাসে আজ শিকড়ের টানে...

পড়ন্ত বিকেলে খুঁজি বাতায়ন, কুমকুম বাড়ি।

শ্যাওলা জমেছে শুধু, কেউ আর থাকেনা এখানে

জানালাটি আছে ঠায়, পুরোনো স্কেচের দাগ কিছু...

গুহামানবীর মতো কে যেন লিখেছে খুব

 অস্পষ্ট অক্ষরে―

‘সোমলতা আপনাকে বিবাহ করিবে’।




• অলঙ্করণ: গুগল

এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ