শারদ
সংখ্যা


এবং খোঁজ, শারদ সংখ্যা


গোলাম রসুল

তিনটি কবিতা




ভাঙচুর


আবার সেই চেতনার পৈশাচিক উল্লাস

চোখের কাঁচের ভাঙচুর

মৃত্যুর জল্লাদ

আমরা একসঙ্গে আছি

ফ্রেমে বাঁধানো আকাশ যার কোণে কোণে ময়লা জমে রয়েছে আর যে জন্য দেখা যায় না আকাশ পশুদের

আমি একটি জগাখিচুড়ী মানুষ

ছোটবেলায় যা যা শেখানো হয়েছিল

সেই সব আসবাব দিয়ে তৈরি


যখন জীবন শহরে রূপান্তরিত হলো

আমি একটি বিরল দুঃখ খুঁজে বেড়াই

যেখানে ঈশ্বরও নৃশংস


উল্লাসের গাছ

যার একটি পাতার কথাও কেউ জানে না

আমি সেই রকম অজানা

আমি একটি ন্যাড়া মানুষ

আমার হাতে বিশাল খুঁটি সে যুগের মরুভূমি পর্যন্ত চলে যায়

আর ঝরে পড়ে বালি


এখান থেকে আরম্ভ জল্লাদের শহর

বাতিস্তম্ভ গুলো উঁচু করে ধরে রেখেছে আলোর তরবারি

আর আমরা গলি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি গল্পের মতো

দুঃখের পুঁজ রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে

আমি গোধুলি সন্ধ্যার স্মৃতি দিয়ে ধুয়ে দিই পাথর

আমার কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না তাও আমি পাল উড়িয়ে দিই গলির ভেতরে

আর একটি পাপের দরজা যেখানে সংযুক্ত হয়েছে অনন্তকাল

সেখান থেকে রাত্রির ভেতর আমি গান গেয়ে ভেঙে ফেলবো এই শহর

শ্রমিকরা যেমন ভেঙে ফেলে




জলপথে বালি বোঝাই নৌকাগুলো


এ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি কোনো মেঘ

আমার অতীতের দিনগুলোও মেঘের মতো

তাই আমি মেঘের প্রতিনিধি হয়ে জলের সাক্ষাৎকার নিয়েছি সমুদ্রের ধারে

বজ্রপাতগুলো সাঁজোয়া কামানের মতো করে রেখে দিয়েছি আমারই ব্যক্তিগত যুদ্ধের জন্য


সন্ধ্যা নামছে নক্ষত্র ঋতুর সন্ধানে

ধর্মহীন মিনারগুলো ডেকে নিচ্ছে জলপথে বালি বোঝাই নৌকাগুলোকে

তারা ছড়িয়ে দেবে একটি শহরের ওপরে কুয়াশা

যেখানে গেরিলা মৃত্যু সহস্র সূর্যকে নিঃশেষ করেছে

একটিমাত্র ফায়ারিং এ

আর সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি নক্ষত্র হয়ে উঠেছে আমার ক্ষত


বৃষ্টি পড়ছে

মৃত চোখের ভেতর থেকে শূন্যের ওপরে

সমস্তটা কান্না দিয়ে গড়া অলীক সিঁড়ি

ঘন্টাধ্বনি গুলো আলগা ঝুলে আছে শতকের পর শতক

হতাশাব্যঞ্জক টাওয়ার

টেলিগ্রাফের ভিজে তার

জড়িয়ে যাচ্ছে অনন্ত কালের কথাবার্তা

 


ডানায়


একে একে বিষণ্ণ ঋতু গুলো কেঁদেছে তাদের

বাজনায়

কে পাঠিয়ে দিয়েছে এত প্রহেলিকা তাদের ডানায়


বৃষ্টি পড়ছে পানীয় জলের মতো যত্ন করে রাখা মেঘ থেকে

যে মেঘের কোনো ঋতু নেই


ওরা অদৃশ্য

ওরা ফিরে আসবে না আর কখনো অদৃশ্য থেকে


বিষণ্ণতার সব দায় ওই ডানায়

ওরা উড়ে যায়



এবং খোঁজ, শারদ সংখ্যা


মেঘ শান্তনু

তিনটি কবিতা




সান্ধ্য


তারপর বিকেল ফুরিয়ে আসে। সব কিছু ঠিক হয়ে যায় একদিন। পুরনো দুঃখের মতো স্নিগ্ধ দোলনচাঁপায় ঢেকে যায় উঠোন। বৃষ্টির পর ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় সেজে ওঠে আকাশ। বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে নিজেকে সুখী মনে হয়। 


মনে হয়, ‘পৃথিবী সুন্দর’। 


আর,

একা চুপ করে বসে থাকার এই নিভৃত পথ, নির্লিপ্ত নিঃসঙ্গ আকাশ সুন্দরতম...


কোনো কারণ নেই তবু 

অঝোর সন্ধ্যায় এক অজানা পাখি অনাথ শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ওঠে...



আবছায়া


যে গল্প লেখা হয়নি

তার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে নবজাতক ফুলগাছ

নীহারিকাপুঞ্জ

সন্ধ্যার বুকে এলিয়ে পড়েছে অন্ধকার 


গল্পের ভেতরে ছোট উঠোন

তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বেলেছ তুমি

কপালে বিন্দু ঘাম 


বারান্দার পাশে রান্নাঘর

ফুটন্ত ভাতের গন্ধ ভেসে আসে 

তারও পাশে শোওয়ার ঘর, চিলতে

রেডিওতে রবীন্দ্রনাথের গান, সারাদিন 


যে গল্প লিখতে পারিনি কিছুতেই

তার প্রান্তে এসে দাঁড়াই–

ফাঁকা ঘর, উঠোনে নেই আলো

কে যেন তুলে নিয়ে গিয়েছে বাগানের সমস্ত ফুল


মধ্যরাতে বাইরে এসে দেখি

পায়ের নিচে অপূর্ব আকাশ পড়ে আছে, ভাঙাচোরা, নক্ষত্রখচিত...



নিছক


বলেছিলাম, অনীহার ফুল অতসী। অকিঞ্চিৎকর তার ফুটে ওঠা অবেলার রোদ্দুরে। বেলা পড়ে আসে। নিঃস্ব অপরাহ্ন জুড়ে অপাপবিদ্ধ আলো..


ফিরবার মন নেই

তবু সহস্র আলোকবর্ষ দূর থেকে ফিরে আসছি

আর 

       ফিরে আসছি...


কিংবা এমন‌ই কথা ছিল–


অপেক্ষা নেই, তবু নিজেকে জ্বেলে রেখেছ...উৎকণ্ঠিত...



এবং খোঁজ, শারদ সংখ্যা

শতদল মিত্র

দুটি কবিতা




স্তোত্র


তখন ছিল সাঁঝবিয়ানো আলো

সাক্ষী তিরতির ধানের সবুজবেলা

আমি জলের দুয়ারে যাই

ছলছল স্বর, রুদ্ধস্রোত-

অ্যাদ্দিন পর আসতে হয়!

এলে যদি এসো স্নানে, শুদ্ধতায়।


আমি আভাং ভিজি হ্লাদিনী জলে

ভাসিয়ে দিই জীর্ণ বাকল

রাত্রির হা-হা হাওয়া

শব্দের ডোমিনিসিদ্ধি-

আহা! কুসুমডিঙাটিও, সাধের ডুবে যায়

মৃত্যুর ওপারে জাগি পুণ্যতর পাপে।


অন্ধ দেখিনি

তারা ফুটেছিল নাকি জন্মের সে নির্জনে!



রাত্রির ভেতর


রাত্রির ভেতর ঘরে বসি

মাথার ওপর ওল্টানো ঊনোন

অমোঘ টানে আমি সেঁধিয়ে যাই বোধিজন্মে

শিরা-ধমনীতে হাওয়ার বাঁশি

নিভন্ত ঊনোনে ছাইচাপা আগুনে তান

স্ফুলিঙ্গ মায়া

রাত্রি জুড়ে তারা জাগে

কথা বলে তারা

শব্দ খোয়ানো আমি

ভাষার বাঁকে ডুব দিই

চেতনায় সৌরঝড়

সঙ্গীত-সংকেত

আর রাত্রিমগ্ন ঊনোনের দপ করে জ্বলে ওঠা

জ্বলে যায় রাষ্ট্রের কল্যাণমুখ

সাংবিধানিক চিতা ভেঙে জাগে

দেশহীন একটাই শব্দ—


খিদে!   


এবং খোঁজ, শারদ সংখ্যা, suvadip maity


শুভদীপ মাইতি

তিনটি কবিতা




বিষন্নতা


অকালশ্রাবণের মতো মলিনতা। অবয়বে জেগে ওঠে ঢেউ।

আমি দৃষ্টিকৃপণ। তীরভূমি ছুঁয়ে দিলে, সিঁথিপথে লৌকিক জল।


জানালার ওপারের শীতল বাতাস মনখারাপ বয়ে আনলে,

সন্ধ্যাফুলের মতো নত হয় মাথা।



শরীর


একটি সাঁকো আজন্ম নতজানু দুইদিকে।

তলপেটে অবিরাম ভেঙে যাচ্ছে জল



তৃতীয় হরিণ


শরীরের ভেতর বয়ে যাচ্ছে উন্মাদ নদী। গ্রহ দোষ ছুঁয়ে যায় কন্যা, অনামিকা।

সমাধি ক্ষেত্রের পরিধি জুড়ে হলুদ ধানের শিষ, পায়রাচালির সরলতা খুলে রাখে দ্বার।


যত্নে রাখলে জন্মদাগের মতো থেকে যায় মানুষ। আদরে সোহাগে মাথা রাখে কাঁধে।

তৃতীয় হরিণের স্থবির ক্ষুরে টুপটাপ ঝরে পড়ে মধ্যবর্তী লালন কথারা


মনিবন্ধে প্রণাম রাখি, কাঁকড়ামাটি, গুমঘরে নড়ে ওঠে ছায়া।

সাক্ষাৎ মৃত্যু তুমি। বন্ধুও

কাচজলে ভেঙে যায় নিমখুন লাবণ্য প্রভা।




এবং খোঁজ, শারদ সংখ্যা, soumen de


সৌমেন দে

রমা ও লহমা




রমা


বেলা বাড়ছে বলে থমকালে কেন

বৃষ্টি নামবে সব বাধা অমান্য করে

আকাশেরও বয়স বাড়ে

মানে গ্রহ নক্ষত্রেরও চেহারা এক থাকে না

রমা, তুমি আমায় চিনলে না 

আমি ধ্রুব!


লহমা


শেষ পাতায় যেতে খারাপ লাগছে

শুরুটা এতটাই ভালো 

মাঝামাঝি এসে ভাবতেই খারাপ লাগছিল 

শেষ হবে।

এটা লহমা নামের মেয়ের গল্প

আরো একটা কষ্ট কুড়ানো মেয়ের উপাখ্যান!


• অলঙ্করণ: বিং

এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ