সংখ্যা
ডরনা মানা হ্যায়
চিত্রাভানু সেনগুপ্ত
পিলুউউউ...উঠে আআয়, উঠে আসবি তো?
ধো পাপুকুরঘাটে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির গলার রগ ফুলিয়ে বিশ্রী রকম চিৎকার কানে এসে বিঁধছে। ব্যস্তমুখর জনবহুল এলাকা হলেও দুপুর গড়ানো ভাতঝিমুনি পরিবেশটা কেমন একটু তাল কাটিয়ে তুলছে। একবুক জলে ডুবসাঁতার কাটা ছেলেটিকে লক্ষ্য করে ডানহাতে ধরা চিনকাগজটাকে বারেবারে দেখিয়ে কী যেন একটা বোঝাবার চেষ্টা করল মেয়েটি। ছেলেটি অপলক কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল,
-যাবো না এখন, যাহ্!
ভেজা গায়ে বছর বারো তেরোর মেয়েটি একবার টেনেটুনে নিলো নিজের গায়ের জলে জড়ানো জামাটা। গলার কাছটা ফাঁক করে দুই হাতে ভালো করে ঝেড়ে নিলো পরনের পোশাক। তারপর করুণ চাহনিতে অপলক জলের দিকে তাকিয়ে বলল... তবে মর গে! সকাল থেকে ডাকছি তবু ঢ্যামনামো যায়না। আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে পাকা রাস্তা বরাবর হেঁটে সোজা বাজারের পথে ধরল।
বাজার ভাঙছে সবে, গ্রীষ্মের হাঁসফাঁস গরমের জেরে নাভিশ্বাস তোলা দোকানিরা গুটিয়ে তুলেছে কারবার, সময়ের কিছু আগেই। তবু মানুষের আনাগোনা লেগেই আছে। কর্পোরেশনের ছাপ্পা লাগানো পোশাকে লম্বালাঠির ঝাড়ুখানা হাতে কর্মচারীটি ঝেঁটিয়ে টেনে আনছে জঞ্জাল, পথের দুইপাশে সবজির পচা শাকপাতা, কাগজ, প্লাস্টিক, দড়ি। বড় বড় চটের ছালায় ঢেকে ফেলা হয়েছে আনাজ সাজানো ঝুড়িগুলো। মাছের বাজারের দিক থেকে অলিগলি টপকে একপাহাড় আবর্জনার স্তূপ ডিঙিয়ে ঘিনঘিনে কাদাজল মাখামাখি পায়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছে গজাই। পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবার আগে মেয়েটির হাতে গুঁজে দিয়ে গেল কিছু একটা, -লে মুনিয়ে সামহাল্।
চোখের নিমেষে বস্তুটি জামার তলায় চালান করে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ভাবে পা চালালো মুনিয়াও, সটান সবজির বাজারের ভেতর দিয়ে ফলের দোকানগুলো ছাড়িয়ে বাজারের পিছনের পথ ধরলো। হোক না ভরদুপুর তবু মেট্রোপলিটন এলাকার নিরিবিলি খুঁজে পাওয়াটাই বেশ ঝকমারি। বাজার মানে একটা গোটা দিন শুরু আর শেষের মাঝে কেবল অবিরাম কর্মব্যস্ততা। দোকানির হাঁকডাক, যানের কোলাহল, যাত্রীদের অবিরাম পদচারণ, ঘেয়ো কুকুরের চিৎকার, মাছের দোকানের পাশে ওৎ পেতে থাকা মেনি, গৃহস্থের দর কষাকষি, দাঁড়িপাল্লায় ঠগবাজির কায়দা, ক্যাশ বাক্সের জমা খরচ। চারিদিকে চোখ চালাতে চালাতে গলিঘুপচি আর ফাঁকফোকর পেরিয়ে চলা মোটামুটি জনহীন একটা জায়গা দেখে দাঁড়ালো মুনিয়া। লোকচক্ষুর এড়িয়ে ফ্রকের তলা থেকে বের করে আনলো চকচকে একটা কাঠবাদামী রঙের বটুয়া। হকচকিয়ে আশেপাশের পরিস্থিতি চোখ দিয়ে জরিপ করে নিয়েই মুখখানা বেঁকিয়ে বললে, - সাল্লা বেজম্মা! চুরি করার নেশা লেগেছে। নিজে তো ডুববেই, আমাদের সবকটাকেও ডোবাবে।
চার আঙুলে বটুয়াখানা বার তিনেক নাচিয়েই আন্দাজ করে নিলো মালকড়ির হিসেব। এইবারে মনে হয় বড় হাত মেরেছে হারামীর বাচ্চাটা। চারকোণ বটুয়ার চামড়ার নীচের দিকে খোদাই করা ছোট্ট মোষের মাথাতে চোখ আটকালো। কিন্তু ব্যাগের পেটে তন্ন তন্ন করে খুঁজে অনেকগুলো ভাঁজকরা কাগজ লন্ড্রির বিল, দুটো একশ টাকা, কতগুলো কার্ড ছাড়া কিছু পাওয়া গেল না। হঠাৎ রাগে মাথাটা ঘিনঘিন করে উঠলো, টাকাগুলো বের করে নিয়ে দুটো দোকানের মাঝখানে পরিত্যক্ত জমির হাইড্রেন লক্ষ্য করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ব্যাগটা। ব্যাগটা ঠিক কোথায় পড়েছে লক্ষ্য করেনি মুনিয়া। পরক্ষণেই চোখের সামনে পিলুর মুখখানা ভেসে উঠতেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটলো। গত দেড়দিন কিছু খায়নি পিলু। গেলকাল হনুমান জয়ন্তীতে ভোগের আয়োজনে মন্দির প্রাঙ্গণে তামাম আমীর আদমি থেকে হাপিত্যেশ করে পথে বসে থাকা হাঘরে ভক্তবৃন্দ, কত পথচারী দীনমজুর ভিড় জমালো। পিলু না-জানি কোন রাজকাজে ছিল প্রসাদ ভাগের সময়! সারাদিনে চেয়েচিন্তে যা কিছু জোটে, দলের সবার মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেবার দায়িত্ব মুনিয়ার। বরাবরের মতই খাবার ভাগের সময় মনে করে পিলুর ভাগ সরিয়ে রেখেছিল। অনেক পরে যখন পিলু ফিরলো তখন তার ভাগেরটা আর খুঁজে পাওয়া গেল না। জিজ্ঞেস করেও কারো পেটের কথা টেনে বের করতে পারেনি কেউ। তবে মুনিয়া এবং দলের সকলেই জানে এসব কাজ একমাত্র গজুই করে। ওদের দলে সে-ই একটু ডাকাবুকো। বাঁয় হাতের কাজেও হাতযশ তার বেশি। মাঝেমধ্যে ভালো হাত মারে, তাই দলের আর সকলের উপর রোয়াব ফলায় বেশি। ছিনিয়েও খেতে জানে।
দল বলতে ওরা ছয়জন। গজাই, ভোলা, মুনিয়া, ছুটকি, হোদলা আর পিলু। পিলুটা সক্কলের ছোট, জেদ করে একটু বেশি। সারাদিন যে যেদিকেই থাকুক কালো রাতে রাস্তার একপাশে পরিত্যক্ত একটা ঢালাই পাইপের ভেতর ছেঁড়া চট, দোকানের ফেলে দেওয়া পিচবোর্ডর মোড়ক আর পলিথিন বিছিয়ে গায়ে গায়ে লেগে থাকে ওরা। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইটা ওদের শুরু হয় দলের মধ্যে থেকেই।
ভোলা একটা ভাঙাচোরা গাড়ির গ্যারেজে মোটর মেকানিকের কাজ শেখে, টুকটাক কাজ করে দেয়। কখনো বাজারে মুটেগিরিও করে। হোদলাও করে কিছু টুকটাক, আবর্জনার স্তূপ ঠেলে ভাঙাচোরা সরঞ্জাম কুড়ায়, সস্তার দামে যা পায় তা-ই সেদিন রোজগার। তবে এখন দিনদিন গজাই ওর গুরু কাম ওয়েল উইশার হয়ে উঠছে। ভিক্ষাবৃত্তি ওদের প্রধান রুজি। গায়ের জামাটা খুলে পথচলতি গাড়ির গায়ে দুবার ঘষে দিয়ে জানালার ভেতরে হাত গলিয়ে দেয়। কেউ দুটো টাকা দেয় কেউ দেয় না। সারাদিন বাদে যার যা জোটে একার ভাগের ভাগ কিনে খেলে কারো আধপেটা জোটে, কারো কাছে যা থাকে তাতে খাওয়া হয়না। তাই ওরাই নিয়ম বেঁধেছে, সবার রুজি এক জায়গায় করে যেটুকু জোগাড় হয়, ভাগাভাগি করে খায়। তাতে সিকিবেলা আহার জোটে ওদের। বাকি সময় নেশা করে খিদে ভুলে থাকে। পিলুটাকে নিয়ে বড় মায়া হয় মুনিয়ার। ছোট মানুষ। এখনো চেয়েচিন্তে ভিক্ষা আনার মত চৌকস সে নয়। গজাইয়ের আস্কারা পেয়ে হোদলা আজকাল বড় বেশি মাতব্বরি করে, পিলুটার উপর চড়াও হয়।
রেলবস্তির গলির মুখটা ডিঙিয়ে চলাচলের সময় মুনিয়ার বুকের ভেতর কে জানি ছেনি দিয়ে আঁচড় কাটে। ওই বস্তির খোলে ওর মায়ের ঘর। ক'দিন হল মায়ের জন্য মন কেমন করছে খুব। দিন দশ-বারো হল মায়ের মুখখানা একবারও দেখেনি সে! মায়ের কথা মনে এলেই চোখ ভিজে ওঠে মুনিয়ার। তিনদিন আগে বিনি মাসির মুখে খবর পেয়েছে মা-টা বিছানায় শোয়া। খুব দমের কষ্ট, ওদিকে রক্তও নাকি নেই তেমন শরীলে। বাপ নামের লোকটা বলেছে, এতো পয়সা নেই যে তুকে ভিটাইন খাওয়াব। মনে হল চুপ করে একটু মাকে দেখে আসবে। বাপটা ঘরে নেই। ও ঘরে পা দিয়েছে জানলেই বাপটা চেল্লাবে, মায়ের গায়ে হাত তুলবে। বলবে, যার পাপ তাকে দিয়ে আয় গে, আমার ঘাড়ে ফেলবি তো উসুল করে লিব। ছোট ভাইটাকেও কোলেও নিতে দেয় না। পিলুটাকে দেখলে বারবার ছোট ভাইটার কথা মনে হয় মুনিয়ার। গেলবার পুজোর সময় একবার লুকিয়ে ঘরে গিয়েছিল, বাপটা মাকে ধরে এমন কেলিয়েছিলো, নাকমুখ ফেটে রক্ত বের হয়েছিল সেদিন। মনে হলেই কেঁপে ওঠে মুনিয়া। নিজের মনেই বলে, - থাক্ গে! মায়ের দোরে গিয়ে কাজ নেই। মাও তো তাই বলে,
- ঘরে আসিস না। আমি তোকে মাঝে করে দেখে আসবো। লুকিয়ে খাবার এনে দেয়। মায়ের কথা মনে হলে বুকটা হু-হু করে ওঠে। জামার তলা থেকে নোটদুটো বের করে এনে হাত বুলালো খানিক। আজ একবার রতন শেঠের ডেরায় ঢু মারতে হবে। বাজারের ওপাশে ওর চালের গুদাম আছে। বয়সের মা-বাপ নেই, মুনিয়াকে দেখলেই কেমন করে চেয়ে থাকে। ওর চাহনির দিকে তাকালে গা গুলিয়ে ওঠে মুনিয়ার। ভোলা ওকে পইপই করে সাবধান করে। ভোলার কথা শুনলে মাকে আর বাঁচাতে পারবে মুনিয়া? ভোলা বলে, - মালিক বলেছে ব্যবসাটা একটু দাঁড়িয়ে গেলেই ভোলাকে পারমেন্ট করে লিবে। তখন মালিককে বলে কয়ে মুনিয়াকেও কাজে ঢুকিয়ে দেবে ও। ঠিক একটা কিছু উপায় হয়ে যাবে, তবে সে ব্যবসা কতদিনে দাঁড়াবে জানা নেই। সব সময়ই মালিকের হাতে খুব টানাটানি। ভোলা সাহস দেয়, একদিন সব ঠিক হবে। তবু আজ মুনিয়ার রতনের ঘরে যেতে হবেই। ঘর না থাকলেও মা তো আছে! রতন বলেছে দুপুর দুপুর যেতে। পয়সা দেবে। আর ভাই? ভাইয়ের কথা ভেবেই পিলুর মুখ ভেসে উঠলো। একটা নোট সরিয়ে নিয়ে কোমরে গুঁজে নিলো আলাদা ভাবে। আর একটু এগোলে ওদের ডেরা। পার্কের একপাশে রোয়াক, আগে সিমেন্ট বাঁধানো ছিলো, এখন কালো চকচকে পাথরে মোড়া। ভোলা আর ছুটকি কখন থেকে বসে আছে কে জানে? হাতে মোড়া চিনকাগজের খোলে ভরা ডেনড্রাইট এর আঠা। ঠোঙার মুখের কাছটা মুঠো করে ধরে অল্প ফাঁকা রেখেছে। ফাঁকের ভেতর নাক মুখ গুঁজে শ্বাস টানে আর ছাড়ে। এক বুক কড়া ঝাঁঝালো গন্ধটা ভেতরে ভরে নিলেই চোখে ঘোর আসে, মাথাটা কেমন ঝিমিয়ে পড়ে, সব ভুলে যায়, ভুখও আর আসেনা।
হোদলাটা রাস্তার দিক থেকে পিঠে মুড়িয়ে দুই হাত আর গলাখানা উর্ধ্বমুখী তুলে নাচের ভঙ্গিতে দুলে চলেছে। -হাম তুমকো নিগাহো মে ইস তরহা ছুপা লেঙ্গে... বার কয়েক সেদিক দেখে নিয়ে দমকে দমকে হাসি চাপছে ভোলা।
- সাল্লা! সকাল থেকেই চালু, একেবারে আউট হয়ে রয়েছে।
- এ ভোলা, তোরা পিলুটার কিছু করবি কিনা বল। এত্তো জিদ্ করছে! গম্ভীর মুখে ভোলার সামনে এসে দাঁড়ালো মুনিয়া।
- কেন? স্সে আবার কী করলো?
- ওই য্যে পরশুর পর থেকে জিদ্ যায় না। জলে চুবুনি দিয়ে বসে আছে। বলে আমার ভাগেরটা কে খেল বলতে হবে। নয়তো তুদের মুখ দেখবো না।
- তুই বল, ভোলা খানা এনেছে। তুকে ডাকছে।
- আমি অনেক ডেকেছি, স্সে সুনে কব? এ ছুটকি, তুই গিয়ে বল ভোলাদা ডাকছে।
- হঅ! তুই ডাকলি এলোনা, আমি ডাকলে আসবে? ছুটকি বলল।
ধীরপায়ে কখন যেন পিলু এসে দাঁড়িয়েছে। ভেজা জামাটা গায়ে চুপসে এখনো টপটপ করে জল ঝড়ছে। মুখ দেখে বোঝা গেল মনটা বেশ ভার।
- ল্যেহ্, আমার প্যাকেট দে।
মুনিয়ার হাত থেকে একরকম ছিনিয়ে নিলো চিনকাগজটাকে। মুনিয়া জানে এমন জেদ আর রাগ সে একমাত্র মুনিয়াকেই দেখায়, কারণ মুনিয়াকেই সে সবথেকে বেশি ভরসা করে। মুনিয়া আস্তে করে পিলুর পাশে বসে পা দোলালো কিছুক্ষণ তারপর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল ... এ পিলু, টাকা দিছি, খেয়ে আয়।
পিলুটা ঢ্যাটার মত গোঁ ধরেছে, পলিথিন মুখে ঢুকিয়ে জোরে দুই টান দিয়ে চুপ করে রইল। খুদে চোখদুটোর কোণে খিদে জ্বালা তরল হয়ে জমছে। মুনিয়া পিলুর কাঁধে হাতটা রেখে বলল ... ! দোকানে যাবি? চল না !
পিলুকে একরকম জোর করেই হাত ধরে টেনে তুলল মুনিয়া। কোমরের ভেতর থেকে একটা নোট বের করতে যাবে, গজাই সটান এসে হাজির।
- এ মুনিয়া, আমার টাকা বের কর।
মুনিয়া একশোর একটা নোট বের করে গজাইয়ের হাতে ধরিয়ে বলল ...ল্যেহ্। গজাই আঙ্গুল নাচিয়ে বলল... অউর?
- আর কুথায় পাবো? এইটুকু ছিল।
গজাই চোখ কুঁচকে বলল -ঝুট! এত্তো ভারি ব্যাগে এই ছিলো? টাকা দে বলছি, ভালো হবে না! ব্যাগটা দেখা।
- ফেলে দিয়েছি।
- কেন?
হঠাৎ রাগের বশে নিজের কপাল চাপড়ালো গজু। মুনিয়ার ঘাড় ধরে ধাক্কা দিয়ে বলল... এ তুই কে রে? তুই আমার টাকা কাকে দিলি? ভোলাকে?
- কেন? এতো মোটা ব্যাগ। জামার ভেতর দিয়ে ডেবড়ে ঠেলে উঠছে। সাল্লা তুর চুরির জন্য স্যেষ্যে আমি ফাসবো।
- তোরা বুঝি ধোয়া তুলসী? চুরি করিসনা, চুরির মাল খাস না? সাল্লা মাওয়ালি!
ভোলা বললে... এ মুনিয়া! মেলা বাওয়াল করিস না। তুই সর। গজাইয়ের সাথে আমি বুঝে লিই।
পিলুর কথা ভেবে দুদিন এমনিতেই মটকাটা গরম আছে, তায় আবার সুখটান পড়েছে। গজুর কলারটা টেনে বললে... তুই মাতব্বর আছিস? দুসরোকা হক্ ছিনকে খানা তুর ভালো লাগে? দলের সবার উপর রোয়াব দেখাস। তুই কি মনে করেছিস, সবাই তোকে সালাম ঠুকবে? মন্ত্রীর বাচ্চা নাকি বে?
এই ফাঁকে মুনিয়া চুপচাপ জামার তলায় হাত গলিয়ে অন্য নোটখানা এনে পিলুর হাতে গুঁজে বললে... ভাগ এখন। গজু সালা দেখার আগে ছুট ছুট।
গজাই ডানহাতে মুঠো পাকিয়ে তেড়ে উঠলো... এই হারামীর বাচ্চা! কী বললি? আমি ? আমি খেয়েছি? আমি তোদের খাবার চুরি করি? তাই তোরা আমার টাকা লিছিস?কে লিছে? তুই?
তাপের পারদ চল্লিশ ছাড়িয়ে গিলে খাচ্ছে দুপুরের স্বস্তি। তারি মাঝে ভাঙা সড়কের ঘিঞ্জি আবর্জনার কোল ঠেলে বেড়ে ওঠা দুই নাবালকের নারকীয় খেয়োখেয়ির শব্দ আর খিস্তিখেউরে নাজেহাল করে তুলছে তল্লাট। পথচলতি ভদ্দরলোকেরা নোংরাঘাটা মানুষের বাচ্চাদের পাশ কাটিয়ে তফাৎ রেখে হেঁটে যাচ্ছিল। দূর থেকে দুই একজন দোকানি গায়ের ঝাল মিটিয়ে হুট পারলো... ভাগ সালা! জল ঢেলে দেব গায়ে। রিক্সাওয়ালা পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বলে উঠল... এই বাচ্চা! রাস্তা ছোড়।
- মুনিয়ার মায়ের তবিয়েত বিগড়েছে, পাতাঠিকানা আছে? তু পয়সা দিবি? মুনিয়া আজকাল রতনের ডেরায় যাওয়া চালু করেছে। খবর রাখিস তু?পয়সা দিবি কুথা থেকে? করিস তো গ্যারেজ কা কাম!
- তুই দিবি?
- হ দিব। যিখান থেকে পারি দিব।
ভোলা হেসে বলল ... কাহা সে? চোরি করবি?
- হা করেগা। যো মর্জি করবো। তু ভাগ সালা!( দুই হাত দিয়ে ভোলাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো গজাই)। মুনিয়ার দিকে ফিরে মাথা ঝাঁকিয়ে রোয়াব দেখালে... এএ মুনিয়া! আমায় না বলে কুথাও যাবি না তু। রতনের ঘরেও না। সামঝা?
মায়ের কথায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মুনিয়া। একটা দুইচাকা বাইক এসে দাঁড়ালো ফুটপাথ ঘেঁষে। বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালো ধোপদুরস্ত জামা পরা দুটি তরুণ তরুণী।
- এই শোন, শোন! মারামারি করিস না থাম আগে।
গজাই হঠাৎ ভীতু কেঁচোর মত আড়চোখে চেয়ে সরে গেল বেশ কিছুটা তফাতে।
- এই তোরা মারামারি করছিস কেন? কী নিয়ে?
ছুটকি সংকোচে কুঁকড়ে যাওয়ার মত বলল,
- কুছ ভী নেহি। কুছ নেহি? এমনি এমনি এত্তো মারছিস? দেখি তোদের হাতে কী?
ঝিমুনি চোখে হাতটাকে ততটুকু সম্ভব আড়াল করল ছুটকি।
- এটা কী? তোদের সবার হাতে এক রকম প্যাকেট কেন? কী আছে এতে?
- ডেনড্রাইট।
- কীহ্? আয়িব্বাপ!
তরুণটি তরুণীর কানে ফিসফিস করে বলল ... কুইক, ভিডিও কর।
মেয়েটি চোখ নাচিয়ে হেসে বললে ... ক্যামেরা অন আছে বস। ইউ ক্যারি অন।
- নেশা করিস? এই নিয়ে মারামারি করছিস বুঝি? ও-মাই-গড! বয়স কত তোদের?
হোদলা হঠাৎ ওর গান ভুলে গিয়ে খ্যাক্ খ্যাক্ করে হেসে উঠলে... ওরে গঅড রে! জয় বজরঙ বলি রে! ওরে আল্লাহ রে ! হায়রে যীশু রেএএ! তুরা সব কি রে?
চোখ কুঁচকে এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে কী যেন খুঁজলো, আবার গান ধরল... ভগবান, হ্যায় কাহা রে তু?
গজাই হঠাৎ এগিয়ে এসে হোদলাকে পেছনে ঠেলে বললে, এই হোদল হাট্ যা! এবার বলুন তো স্যার, আপনাদের কী চাই ?
- তোরা সবাই নেশা করিস? কেন করিস?
গজাইকে একটু বেপরোয়াই ঠেকলো - শুধু আমরা নয় স্যার, বড়লোকের বাচ্চারাও নেশা করে। ইস্কুলে যায় না। এখানে বসে নেশা করে। যান ওদেরকেও গিয়ে বলুন। ওদিকে দোকান থেকে নেশার আঠা খরিদ করে।
- তার মানে এখানে নেশার ঠেক বসে তোদের? কিন্তু কেন? তোরা সব এইটুকু-টুকু ছেলেমেয়ে...
- খিদে পায়। ভুখা পেটে কাঁহাতক থাকবো? নেশা করলে দুখ্ ভুলে থাকি।
- এইসব আঠা কোথায় পাস?
- স্সে জায়গা আছে। ওওওই জুতোর দোকানে আর হার্ডওয়ারের দোকানে পাওয়া যায় ডেনড্রাইট, ড্যান্ডি আঠা।
- কত নেয়?
- তিরিশ/চল্লিশ টাকা।
- কোথায় পাস টাকা?
- ভিক্ষা করি। জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে বিক্কিরি করি।
ভোলা টিপ্পনী কেটে কথা ছুঁড়ে দেয়... ও একদম এ ক্লাশ, তৈরি মাল আছে। মাল ইধার উধারও করে স্যার।
তরুণটি বললে, এই টাকা তোরা তোদের বাবা মার হাতে তুলে দিতে পারিস না? বাড়িতে গিয়ে এই টাকায় খাওয়া দাওয়া করতে পারিস না?
গজাইও হাসল ... বাপ মা কোথায় পাব স্যার? আমরা সবাই বেওয়ারিশ মাল আছি। সুদ্ধু ওই মুনিয়ার একটা মা আছে।
- মানে? তোদের কেউ নেই? অনাথ? কোথায় থাকিস তোরা?
বাচ্চাগুলো সমস্বরে বলে উঠল... সোকালে ইদিকে থাকি, রাতে ওই কেলাব ঘরের পেছনে ঢালাই পাইপের ওখানে।
তরুণটি আরো কী যেন একটু ভেবে বললে, আচ্ছা ঠিক আছে, ভিক্ষা তো করিস? সেই টাকা দিয়ে খাবারই খেতে পারিস পেট ভরে। এসব খেলে তো কদিন বাদেই মরে যাবি!
গজাই হাসলে, যেটুকু জোটে খাই তো স্যার। যেটুকু জোটে না, নেশা করি।
- নেশা করতেও তো টাকা লাগে রে! দুটো রুটি হলেও তো জোটে। ভাগ করে খাবি। আরো খাটবি। তা না করে এগুলো করিস কেন?
ওদের কথায় গজাই বেশ একটু কাবু হয়েছে মনে হয়। বাঁধানো শানের উপর উবু হয়ে বসে দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়েছে হঠাৎ। সবার চোখে গজাই খতরনাক, ধান্দাবাজ। চেনাশোনা বেশিরভাগ মানুষের চোখে সে পাক্কা দোনম্বরী, চোর। ভালো মুখে দুটো কথা বলার মত কেউ নেই ওর সাথে। এতো ভালো করে কথা বললে গজুর চোখদুটো তাই কখনো সখনো বেইমানী করে। দুই হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে গজু। তরুণ ছেলেটির নজর হঠাৎ গজাইয়ের হাত দুটোর দিকে গিয়ে আটকালো। কনুই থেকে কবজির মাঝের ছালে সাদায় কালো সোজা পোঁচমারা দাগ।
- ওওই! কী হল তোর? দেখি হাতটা। এগুলো কিসের দাগ?
এক ঝটকায় গজাই হাতটা লুকিয়ে ফেলল। তরুণটি গজুর হাতখানা জোর করে টেনে ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল খানিক... কিসের দাগ এগুলো?
- হাতটাকে কেটেছিলাম।
- কেটেছিলি? তুই কেটেছিলি? কীভাবে কাটলি?
গজু মাথা নাড়লে, -লিজেই, বিলেড দিয়ে।
তরুণটি থতমত খেয়ে বললে, - কেন?
গজু মুনিয়ার দিকে চোখের ইশারা করে বলল- আমি প্যার করি ওকে! আর স্সে ভোলাকে ভালোবাসে।
বিস্ফারিত চোখে তরুণটি তাকিয়ে থাকে খানিক, তারপর মুখ টিপে হাসে। কপালে চাটি মেরে বলে,
- এর মধ্যে তোরা আবার ভালোবাসা করিস? বাপরে, কি ক্যালি! কিন্তু ওর-ও তো হাতে একই রকম কাটা দেখছি। একটা নয় অনেকগুলো পোচ দাগ।
সৃষ্টিতে কিছু অনাসৃষ্টির ধারা বেয়াদবি করে নিয়ম মেনে। জঠরজ্বালা সঙ্গে নিয়ে স্বপ্ন দেখায় মন। রাস্তার হ্যালোজেন আলোয় জেগে ওঠা ঘৃণার পাশে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘর বাঁধে সুখ-দুঃখ, মমতা, মাতৃত্ব আর মহব্বত। বাচ্চাগুলো সবাই হঠাৎ তৎপর হয়ে বলে চলল ... ও ওকে ভালোবাসে আর ও ওকে, ওইদিকের ও ওকে।
তরুণটি ক্যামেরায় তাকিয়ে বললে, - শালা ডেপোমির গাছ পাথর নেই। সব তো বুঝলাম, কিন্তু তোদের কেউ বোঝায় না? এমন করতে নেই! এতো ছোট থেকে তোরা নেশা করলে শরীর থাকবে না।
- নেশা না করলে শরীর ভালো হবে?
মুনিয়ার তীর্যক মন্তব্যের কোন উত্তর দিতে না পেরে হঠাৎ যেন দম কমে যাওয়া পুতুলের মত থমকে দাঁড়িয়ে গেল তরুণটি। কথা ঘুরিয়ে বললে,- চল তোদের কিছু খাওয়াই। তোদের জন্য একটা কিছু করতেই হবে। আমরা বরং খেতে খেতে কথা বলি?
মুনিয়া দোনোমনো করে, চোখের উপরে ডান হাতটা আড়াল করে আকাশ দেখে বেলা মেপে নেয়, তারপর তরুণীর কানের কাছে এসে পুছে, -কটা বাজে?
তরুণী ডান হাতটা ঘুরিয়ে কব্জির ঘড়িটা দেখে নেয়,
- কেন? এখন বাজে ঠিক একটা তেরো।
সময় যত এগোচ্ছে কিসের যেন ডর লেগে আছে মনে। রোজকার কিস্স্যা থেকে আজ দিনটা বেশ আলাদা। আজ মুনিয়া হাতে পায়ে তাকত পাচ্ছে না। রতন শেঠ কতটা চশমখোর তো জানা নেই, কিন্তু একসাথে বেশ কটা টাকা হাতে পেলে মায়ের ডক্টর দিখানোর খরচ উঠে আসব। বুকে অকারণ চাপ, ঘন ঘন শ্বাস ফেলে গায়ের জামাখানা টেনেটুনে নিচ্ছে ঠিকমত। যেতে যখন হবেই তখন মনকো তেজ রাখতে হবে। ওদিকে ওরা সবাই খাবার খেতে ডাকছে। ওদের মত হাড়হাভাতে ফুটপাতবাসীদের খিদের জ্বালা অস্বীকার করে মুফতে এক বেলার দানাপানির লোভ নামঞ্জুর করা বেশ শক্ত। আস্তে আস্তে ভোলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মুনিয়া। ভোলা কানের কাছে ছোট করে বলে, - সেখানে যাওয়ায় মেলা দেরি আছে রে মুনিয়া। দো বাজে এদিকের কাম খতম হয়ে যাবে।
- এ ভোলা, তু আমাকে লিয়ে যাবি?
- আমি? আমায় তো গ্যারেজ যেতে হবে।
- তু আমায় রতনের ঘরের পেছনে ছেড়ে দিলে আমি চলে যাবো।
একটু সময় নিলো ভোলা, ভেবে বলল, - আমি শেঠের ঘর তক যাব না। তেলকল তক্ তুকে ছেড়ে আসবো। ভীতু আছিস নাকি? কুছু হবে না।
গজাইটা বরাবরের তুখোড়, দিমাগ তেজ চলে। ঠগবাজি কারসাজিতে চোখ কান খোলা রাখতে হয়। মাথা নিচু করে বসেও দশদিকের গতিবিধিতে তার নজর থাকে। হঠাৎ মুনিয়াকে ডাক দিলো,- এদিকে সুন যা মুনিয়া।
- কেন? কিসে?
- আছে আছে। কথা আছে। মাসির খবর এনেছি। সুনবি তো সুন, না তো যা।
মুনিয়া খানিক ইতস্তত করে গজাইয়ের কাছে যায়।
ওদিক থেকে ডাক আসছে বারবার... এই তোরা এলি? খাবার কিনে দেব। বাকিরা সবাই এগিয়ে গেল, গজাই হাত তুলে বলল, - হা আমি মুনিয়াকে ওর মায়ের খবর দিয়ে আসছি। তুরা আগা।
মুনিয়ার হাতটা জোর করে টেনে গায়ের কাছে এনে বলল, - রতন তোকে কিতনা দেবে?
- কেন?
- একবেলায় যা দিবে তাতে মাসির সব খরচ চলবে?
- না দো-বার, চার বার যেতে হবে।
- দো বারেও পাবি না রে। রতনকে চিনিস? ও মাল শুধু লুটে লিবে, মহা কঞ্জুস আর আদমখোর হারামী। আমার কথা সুনবি তো সুন। নেহি তো যানে দে।
- কী আছে বোল না।
- কেন? ভোলা নে ক্য়া বোলা? রতনের কাছে যেতে বলেছে? স্সে বলে তুকে তো মহা ভালোবাসে?
মুনিয়ার ঠোঁট কাঁপে, বুকের মধ্যে কে জানি শাবলের কোপে অনবরত পোচ মারে, খুবলে তুলে আনছে কলজেটা। মাথাটা নামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ, মুখে কথা সরে না। গজু খিস্তি মারে, - সালা গালফেন সামহালতে পারে না, উদিকে পোষার ধান্দা আছে! নেহি নেহি, তু যা। ভোলার পা চাট সালি। এহসান মানিস না, কুছু বলবো তো সব সুনে আমাকেই গুন্ডা মাওয়ালি বলবি। তুরা লোকের পা ধরবি, খোসামোদ করবি তবু আপনার মর্জিতে পয়সা কামাই করবি না।
বুক চাপড়ে বলে,-আমায় দেখ! দরকারে ঠিক ইধার উধার করে টাকা দিয়ে আসি। নিজের ইজ্জত রেখে ধান্দা করি, বুঝলি?
সত্যি বলতে মুনিয়াও কেন দমে গেছে মনে মনে। ভোলার এমন মাঝপথে হাত ছেড়ে দেওয়াটা মানতে পারেনি সেও। হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠে গজাইয়ের জামা টেনে বলল... এ গজু! কী কাম আছে বোল না? হামার মা মরে যাবে গজু, পয়সাটা খুব দরকার। কিন্তু আমার রতনের কাছে যেতে ভয় করছে খুব। বোল না গজু, তু যা বলবি সুনে লিব।
কথা বলতে বলতে দুই হাতে চোখদুটো আড়াল করে পথের পাশেই বসে পড়ে। ওকে দেখে চোখ ভিজে আসছে গজাইয়েরও। জামার তলাটা টেনে তুলে চোখ মোছে। তারপর মুনিয়ার হাত ধরে টেনে বলে... সুন, যা বলব, কিসিকো বোলতে পারবি না। সামঝা? ওই লিচুবাগানের বাজারে ছোট বাচ্চু আছে না? বড় মন্তিরির ডান হাত!
- হ্যাঁ।
- বিকেলে ওর ওখানে আমার সাথে যেতে পারবি? কাজ দিবে বলেছে। সাথে টাকা। আমি আজ তুর কথা ভেবেই সিখানে গেলাম রে।
- কী কাজ? কত টাকা দিবে?
- কাজ ওরা বলবে। দুটো ছোট প্যাকেট পাচার করতে হোবে।
- কিস্সের প্যাকেট?
- স্সে বুঝে তুর কাজ লাই। কাউকে কানো কান খবর দিলে চলবে না। ভোলাকেও না। আজ বিকেলে চুপচাপ বেরিয়ে যাবো, তু আলাদা যাবি। আমি আগে যাবো। ওখানেই থাকবো। ডর মৎ।
মুনিয়া তবু কথাটা টেনে ধরে রেখেছে, -বল নারে, কুথা যেতে হবে?
- কাল তুকে নিয়ে যাবো রে। শিয়ালদা থেকে টেরেনে। তু কাছেই যাবি, তুকে পথ দেখিয়ে দিবো। সোনারপুর। আমায় দূরমে যেতে হবে, ঘুটিয়ারি শরিফ।
ভয়ে কুঁকড়ে যায় মুনিয়া, - আমি এসব পারবো না। শক্ত কাম আছে। যদি কেউ ধরে।
- কুনো ভয় নেই মুনিয়া! ওরা সব সিখিয়ে দিবে রে। তুর টাকা দরকার, করতে পারলে একবারে অনেক মালকড়ি পাবি। আর ধরলে ওরাই ছাড়িয়ে লিবে। কুত্তো বড় বেওসা ওদের! তাছাড়া পোলিসের সাথে ওদের জান প্যায়চান আছে। এইসবই তো করে ওরা। মন্তিরির ডান হাত! সুদ্ধু তু রাজী কিনা বোল।
মুনিয়া চুপ করে কি যেন ভাবে। গজাই একটু ধমকের সুরে বলে, - কি রে? রাজী আছিস কি?
মুনিয়া দিশেহারা ভাবেই মাথা নেড়ে দেয়। গজু একটু হেসে মুনিয়ার মাথায় হাত রাখে। - আমি থাকতে তোকে রতনের চাট্ হতে দেব না মুনি। চল্ খাবি। ওরা ডাকছে।
দুই হাত দিয়ে মুনিয়ার গালদুটো ধরে কপালে চুমু খায় গজাই। চোখ কুঁচকে হাসে, বলে, - অউর সুন! ডরনা মৎ কেমন? ডরনা মানা হ্যায়!
প্লেট সাজিয়ে গরম ধোঁয়া ওঠা চাউমিন এলো সবার নামে। থালা থেকে থালায় ক্যামেরা ঘুরে এলো বার কয়েক। এরপর ক্যামেরার ফোকাসে তরুণের মুখ।
- গাইজ, একবার দেখুন এইসব পথচারী শিশুদের অবস্থা। ডেনড্রাইটের নেশায় কিভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আমরা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। ওরা বলছেন, প্রশাসনের হাত পা বাঁধা। আঠা জাতীয় দ্রব্যে নেশা রুখতে আমাদের আইনে কোন নিয়ম নেই। খোলা বাজারে আঠা অযাচিত মেলে। তাই আইনসম্মতভাবে রমরমিয়ে চলছে ডেনড্রাইটের বিক্রিবাট্টা। নেশাসক্ত হয়ে পড়ছে শিশুরা। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের তো কিছু দায় থেকেই যায়। তাই আমরা মাঝেমধ্যেই ওদের খোঁজ নেব। আপনারাও পথেঘাটে এদের দেখলে একটু বুঝাবেন। আপাতত এই পর্যন্তই। আমাদের ভিডিওটি যদি ভালো লেগে থাকে, তবে লাভ লাইক দিন। বেল আইকনটি টিপে আমাদের ব্লগটি সাবস্ক্রাইব করতে ভুলবেন না। আপাতত এইটুকুই। আবার দেখা হবে।
মজমা
নির্মাল্যকুমার মুখোপাধ্যায়
(ক)
‘ভগবান কি মায়া, কভি ধূপ কভি ছায়া’
চি ৎকারটা কানে আসতেই বিষম খেল যুধিষ্ঠির। গেলাসের তলানি চাটুকু গলার ভেতর চলে গেল ঢুক করে। তেতো হয়ে গেল মুখটা। খিঁচিয়ে উঠে বলল,
-আবার ভগবানের নাম নেওয়া হচ্ছে, লম্পট, লুচ্চা, ছোটলোক কথাকার।
বিশু চা ঘুঁটতে ঘুঁটতে বলল,
-কী হল তোমার, সক্কাল বেলা মুখ খারাপ কচ্চ?
হাত কুড়িক দূরের বৃত্তটার দিকে তাকাল যুধিষ্ঠির। মানুষের এক খাবলা জটলা। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল আবার সেই চিৎকার—
-আজকে বাবু সোশুর বাড়ি, মাথার ওপর ছই
কালকে যাবে চারপাইতে, পিছে উড়বে খই।
-শালা তাত্ত্বিক হয়েছে। বেদান্ত আওরাচ্চে আবার।
রাগে গজগজ করতে করতে বিড়ির সামনে পেছনে ফুঁ দেয় যুধিষ্ঠির। বিশু আগুন দেয়। বিড়িতে, কিছুটা যুধিষ্ঠিরের মেজাজেও।
-তত্ত্ব তো তুমিও ঝাড় দাদা।
-ঝাড়ি, আলবাত ঝাড়ি। তাই বলে শেষমেশ মানুষকে ওসব নোংরা বস্তু দেখিয়ে বেড়াই না। যুধিষ্ঠির হালদার সিনায় দম রাখেরে দম। বুজলি?
কথাকটা বলে একটু হাঁফায় যুধিষ্ঠির। ফের তাকায় ওই জমাট মানুষের তৈরি বৃত্তের পানে। ভেতরে যে আছে তার টিকিও চোখে পড়ে না। হিংসে হয়। চোখ কড়কড় করে।
মফস্বল শহরের এই মহকুমা আদালত সকাল সাড়ে নটা থেকে আড়ামোড়া ভাঙ্গে। সার সার চায়ের দোকানগুলোয় আঁচ পড়ে যায়। এগারটা থেকে দুটো হল পিক আওয়ারস। তারপর হাট ভাঙতে থাকে। মুহুরিবাবুরা আদায়ে ব্যস্ত হয়। তারিখ দেওয়া নেওয়া চলে। পেস্কারের সঙ্গে গুজগুজ ফুসফুস সারা হয়।
তিনটের পর বেশির ভাগ উকিল বাবুই বাড়ির পথ ধরেন। চারটে থেকে কোর্টচত্বরে উড়ে বেড়ায় পাউরুটীর খালি ঠোঙা, কলার খোসা, সিগারেটের খালি প্যাকেট, ডিমের খোলা মুখে কিছু কাক।
এগারোটা থেকে দুটো সবচে জমজমাট। এলাকা জুড়ে একটা উম্মম্মম্ম ধ্বনি ওঠে। দেওয়ানি আদালতের দপ্তরি এজলাসের বারান্দায় এসে কোর্ট কাঁপিয়ে হাঁক দেয়,
-বাদী কালিচরণ বিশ্বাস- হাজিইইইইইররররররর।
তার লম্বা হাঁক চত্বরের মাঝে বুড়ো শিব মন্দিরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ট্রেজারি, পোষ্ট অফিস, নাজিরখানা, বার-লাইব্রেরি আর পুলিশব্যারাকের গায়ে আছড়ে আছড়ে পড়তে থাকে।
এইসময়টা হল মজমার মেন টাইম। আসল মওকা। সাক্ষী-সাবুদ, বাদী-বিবাদী, আসামী-ফরিয়াদি তুমি যেই হও হাজিরা তোমার দশটায়। তারপর ডাক আসতে আসতে কারও এগার কারও বারো কারও একটা কারও দুটো। এত সময় মানুষগুলো করে কী? চা বিড়ি খেয়ে খেয়ে আর কাঁহাতক সময় কাটে। অথচ এলাকা ছেড়ে গেলে ডাক শুনে হাজির না হতে পারলে মুহুরি চোদ্দ পুরুষকে তুলবে আর ফেলবে।
কাজেই জমে যাও মজমায়।
হাজারো মজা এই মজমায়। মজমা দেখতে দেখতে মজে যাও একদম। ডাক পড়লে মুহুরিবাবু ঠিক মজমা থেকে তুলে নিয়ে যাবে কাঠগড়ায়। হদিস থাকবে লোকগুলোর।
এই কোর্টে মজমাওয়ালা সাকুল্যে তিনজন। যুধিষ্ঠির, রাঘব আর কেতু। কেতুকে নিয়ে কোন সমস্যা নেই। ও বেচে ‘মুক্তো হাসি দাঁতের মাজন’।
প্রথমেই একটা উঠতি ছুকরি , সম্পর্কে নাকি কেমন ভাইঝি হয় কেতুর, তাকে দিয়ে হাততালি দিয়ে দিয়ে একটা ড্যান্স লাগায়। তাতেই লোক হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ভিড় একটু ঘন হলে মাজনটা ঝাড়া শুরু করে।
ফাস্ট আওয়ারে কেউ মাজন মুখে নেয় না। তখন ভরাপেটে থাকে মানুষজন। তাই ওর টাইম হল বেলা একটা। ওর মোদ্দা ভাষণ হল
-লেকচার শুনে নিয়ে মাজন দিয়ে দাঁত মেজে টিফিনটা সারুন গিয়ে। দেখবেন খাবার দাবারের সোয়াদই পাল্টে গেছে একদম। নুন কে নুন, ঝাল কে ঝাল, ঠিকঠাক লাগচে সব। বেড়ে গেছে খিদে আর দাঁতের জোর।
কিন্তু ঝামেলাটা চলছে যুধিষ্ঠির আর রাঘবের ভেতর। বেশ কিছুদিন ধরে লেগেছে।
-কোনদিন হাতাহাতি হয়ে যাবে, বুঝলি বিশু।
-খবরদার ওকাজ করনা দাদা। রাঘবদার আড়াখানা দেখেচ? তোমার টিপে মারবে একদম।
সত্যি। রাঘবের চেহারাটাই হল ওর আসল পূঁজি। আগাপাশতলা পুরুষ একজন। কে বলবে সাতচল্লিশ পার হচ্ছে। সাজোয়ান টান টান। কিরিম মাখান চকচকে চুল। পেছনে ওলটান। চিরুনির বাড়ি মেরে মেরে শিঙাড়া বানান হয়েছে মাথায়। বেড়ালের মতো চোখ। কপিশ চাউনি।প্রথম যৌবনে মাইক ছাড়াই যাত্রা করতো। সেই বাজখাই আওয়াজ এখনো এ্যাসেট।
পোশাকটাও জব্বর। লাল টকটকে টিশার্টের সঙ্গে নীল জিন্স।কোমারে তবক বসান চামড়ার বেল্ট। পায়ে স্নিকার। কানের ফুটোয় আতর ভেজা তুলো। ইলেকট্রিক ঘড়ি কব্জিতে পিকপিক করছে। কাঁটা নেই শুধু নম্বরেই টাইম।
পায়ের ফাঁকে একটা ঢাউস চামড়ার ব্যাগ।
মাটিতে যুধিষ্ঠিরের মত নীল রঙের তাপ্পিমারা পলিথিন পাতে না কখনও। স্পেশাল সিনারি আঁকা একটা টেবিল ক্লথ আছে রাঘবের। সেইটা পাতে।
আহা, কি সিনারি!! সাগরপারে বালির ওপর সার সার শুয়ে আছে কোপনি সম্বল মেমসায়েবের দল। ওই দেখতেই আদ্ধেক লোক জড়ো হয়, হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
আর যুধিষ্ঠির? পায়ের কাছে রাখা সরঞ্জামগুলোর দিকে তাকায় আরেকবার। রাগে ব্রহ্মরন্ধ্র জ্বলে ওঠে।
রঙচটা একটা ফুল আঁকা তোরঙ্গ। বিয়ের সময় সরলার মায়ের তরফ থেকে জামাইকে দেওয়া একমাত্র দানসামগ্রী। ভেতরে একটা বাচ্চার মাথার খুলি। স্টেনলেশ ষ্টীলের টিফিন কৌটো একখানা। লোলজিহ্বা মা কালীর ফটো। আর ফ্রেমে বাঁধান এক টুকরো বাঁদিপোতার গামছা।
-তোমার এই চল্টা ওঠা বাক্সখানা এবার পাল্টাও দিকিনি। আর তার সঙ্গে ভাল দেখে একখানা ডেরেস বানাও।
বিশু সুযুক্তিই দিচ্ছে। কিন্তু যুধিষ্ঠির নিরুপায়। ভোম্বল ক্লাস সেভেনে, নারানটা ফাইভে। সুমতি এবার টুয়ে উঠল, বাসমতী বুকের দুধ ছাড়েনি এখনও। ওদের জন্য এখুনি চাই বই, খাতা, কৌটোর দুধ। সরলা, সায়া কিনে দিতে না পারায়, লোকজন এলেই রান্নাঘরে সেঁধোয়। ওর এখুনি চাই দু মিটার মার্কিন। খানদশেক টালি এই বর্ষার আগেই পাল্টান দরকার। দরকার একটা ডুগডুগি। গলা খুসখুস কাশির হাত থেকে বাঁচা যায় তাহলে। দরকার এক দরকার দুই দরকার তিন...।
পাকাচুলের লোকজন মজমায় পেলে ভারি মজা করে যুধিষ্ঠির,
-অ দাদু, ষষ্ঠী আছে নাকি এবার?
-কী যে কন?
দাদুর মাড়ি বেরিয়ে পড়ে।
-লজ্জা কীসের? আমিও যামু। তবে সরল্যার পাশে আমারে আর মানায় না। টেরেনের মানুষজন জিগায়, অ মেয়ে কই যাও? বাপের লগে কইলকাত্তায়? জামাইয়ের ছুটি নাই বুজি?
হলুদ বেলাউজের বউঝি লুটিয়ে পড়ে হেসে। হাত ধরে পাশে টেনে বসায় ননদকে। যুধিষ্ঠিরের কান এঁটো করা হাসি চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামতে থাকে মুখের চামড়ার সব গভীর অগভীর খাত বেয়ে বেয়ে।
জনা তিরিশ এই করে জমে গেলেই খুলে যায় তোরঙ্গ। বেরিয়ে আসে ঝকঝকে করোটিখানা। নিঃশব্দে হাসি পিছলোয় যুধিষ্ঠিরের চোয়াল বেয়ে। সে হাসির সঙ্গে করোটির হাড় মাংস চামড়া বিহীন পরলৌকিক হাসিখানা মিলে মিশে এক হয়ে যায় যেন।বাতাসে একটা চাপা অস্বস্তি জড়ো হয়। মেডিকেল কলেজের লাশকাটা ঘর থেকে পাক্কা তিনশো টাকা দিয়ে যোগাড় করা এই বস্তুটিকে অসীম নিষ্ঠাভরে স্টেনলেশ স্টিলের টিফিন কৌটোর ওপর বসায়। সামনে হেলিয়ে দেয় লোলজিহ্বা মা কালীর ফটো আর বারো বাই দশ ইঞ্চির ফ্রেমে বাঁধান বাঁদীপোতার গামছা খানা। মাটিতে গুঁজে দেয় হাফ ডজন জ্বলন্ত ধূপ। জনতা এইসব অদ্ভুত সাজ সরঞ্জামের মধ্যে কোন যোগসূত্র খুঁজে পায়না।
কিন্তু ছোঁড়াটা তো আজও এল না। এতক্ষণে এসে যায়।
বেশি না, মাত্র দিন সাতেক হল নতুন আইটেম শুরু করেছে যুধিষ্ঠির। হেবি হিট। তাসের খেলা, হাত কি সাফাই, টক্কা ফক্কা এইসব খেলায় লোক আজকাল তেমন আর মজে না। পাব্লিক একটু এ্যাকশন চায়। তাছাড়া করোটিটা শেষ পর্যন্ত একটু গা ছমছম ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনা।
আজকাল মানুষ বড় সেয়ানা হয়ে যাচ্ছে। তাই একটু খুন খারাপির ব্যবস্থা রেখেছে যুধিষ্ঠির।
প্রথম প্রথম হাত কাঁপত। ‘সহজ এলোপ্যাথি শিক্ষা’ দেখে কোনটা যে শিরা আর কোনটা যে ধমনী ঠিক ঠাহর হত না। আগে নিজের তারপর সরলার হাতের ওপর বার দশেক প্র্যাকটিস করে তবে খেলাটা পাব্লিকলি দেখাতে শুরু করেছে যুধিষ্ঠির। দারুণ রেজাল্ট।
কিছুই না। একটা সেফটিপিন। চাড় দিয়ে সোজা করা।
-কোথায় থাকে?
নিজেকে প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দেওয়া,
-কেপ্পনের হাওয়াই চটিতে, আর মা জননীদের বেলাউজে। আয়তো খোকা, উঠে আয়। আয় না, কোন ভয় নেই। আয়।
হাঁটুতে ধুলো, আধময়লা হাফপ্যান্ট, নাকি সিকনি নিয়ে যেসব বাপে খেদান মায়ে তাড়ান বালখিল্যরা যুধিষ্ঠির মজুমদারের পহেলা সারির দর্শক, তাদের ভেতর থেকে কালো- কুলো হাড় জিরজিরে ওই ছোঁড়াটার কুনুই ধরে টেনে আনতে হয়। ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আসার একটিংটুকু বড় নিখুঁত ভাবে করে ছোঁড়া। স্টেনলেশ স্টীলের কৌটো থেকে বার হয় একগোছা মাদুলি। ঝকঝকে তামার খোলের গায়ে অশথ গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রোদ্দুর ঝিকমিক করে ওঠে।
-তুলে দাও, যে কোন একটা তুলে দাও মা জননী। কোন ভয় নেই মা।
জয় ক্কালী কামাখ্যাওয়ালি
বাচ্চে লোগ বাজাও জোরসে তালি
অতীব ভক্তিভরে বউদিমনির বাছাই করা মাদুলিটি ছোঁয়ান হয় বাঁদীপোতার গামছা বাঁধান ফ্রেমে, লোলজিহ্বা মা কালীর ফটোর পায়ে এবং করোটির মাথায়। তারপর লম্বা একটা ভাষণ,
-না স্যার, বাত অর্শ একজিমা হাঁপানি চুল্কানি দাদ একশিরা অথবা কারবাংকল—এসব আমার মাদুলিতে সারবে না। পারবেনা- ছাতাপড়া কোন মামলার ফয়সালা দুমাসে করে দিতে। মাফি মাঙ্গে যুধিষ্ঠির—সে পারবে না, পাশের বাড়ির ষোল বছরের ছুকরিকে মাঝ রাত্তিরে আপনার ঘরে এনে দিতে।
তবে বলবেন, ভাই ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, তবে কী পারবে তোমার এই মাদুলি? কি এ্যাকশন আছে এর?
নিজের চোখে দেখে যান স্যার।
দপ করে জ্বলে উঠবে লাইটার। নীল হলুদ আগুন ছুঁয়ে যাবে সেপ্টীপিনের ছুঁচলো মুখ।
-দয়া করে কেউ জায়গা ছেড়ে নড়বেন না। দোহাই কলকাত্তাওয়ালিকি।
প্যাঁক করে সেপ্টিপিনটা এইবার ঢুকে যাবে ছেলেটার ফোরআর্মে। মাসলের ভেতর প্রায় হাফ ইঞ্চির মতো।
-ইসসসসস্।
বউদিমনি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। জনতা নির্বাক। হাতের মুঠোয় বাছাই করা মাদুলি আর মুখে একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালোকুলো ছেলেটা।
-জয় ক্কালী কামাখ্যাওয়ালি
বাচ্চে লোগ বাজাও জোরসে তালি
চটর পটর করে হাততালি পড়ে যাবে।
-লাগছে বাপোই?
-নাঃ।
চোখ বুঁজে একটা ফুঁ। তারপর বিশেষ এক শিরায় চাপ দিয়ে যুধিষ্ঠির তুলে নেবে সেপ্টিপিন। জনগণ হতবাক হয়ে দেখবে পিন বেঁধা চামড়ায় নেই এক বিন্দু রক্তের ছিটে।
সেই ছেলে আজ পরপর তিনদিন গরহাজির। বলা ছিল নিজে আসতে না পারলে বোনকে পাঠাস। কদিন ধরেই গাইগুই করছিল ছেলেটা। একটা পাউরুটী আর এক প্লেট ঘুগনিতে নাকি পেট ভরে না দু ভাইবোনের। বাড়াও। শালা, সব জায়গায় ইনকিলাবি।
এই খেলাটা চালু করে দেওয়ার পর যুধিষ্ঠিরকে আর তেমন গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে হয় না। এর পর শুধু মাদুলির গুনাগুন ঘোষণা। সংক্ষেপে এবং সঙ্কেতে।
-তবে শুনুন স্যার আমার মাদুলির ফাংসান। হিন্দিতে একটা কথা আছে না, মরদ? মানে পুরুষ? পুরুষ কাকে বলে স্যার? নাকের নিচে মোচ থাকলেই পুরুষ? কভি নেহি। আমার কাছে জেনে নিন পুরুষ কাকে বলে—
আঁখ মে শরম
খুন মে গরম
সিনে মে ধরম
ওহি হ্যায় পুরুষোত্তম।
অনেক বাবু আছেন স্যার, অপরাধ নেবেন না, বি এ পাস, দোতলায় বাস, ব্যাঙ্কে চাকরি, বউখান সুন্দরী, লেকিন কোর্টে উঠলেই মামলা খালাস।
যুধিষ্ঠিরের এই সান্ধ্য ভাষা যারা বোঝে তারা মুচকে মুচকে হাসে। যারা বোঝে না তারা হাসি হাসি মুখে বোঝবার চেষ্টা করে।
-অপরাধ নেবেন না স্যার, হিন্দু শাস্ত্রে বলছে,
মাসে এক বছরে বারো
তার কমে যত পারো।
মুসলমান ধর্মে বলছে,
জন্নত সে জব আয়ে ফরিস্তা
তেরা মেরা হোগা রিস্তা
আর আমরা কী করি স্যার? ভাত দিতে পারিনা, কাপড় দিতে পারিনা, সময় নেই অসময় নেই, ঘরে দি খিল।
বেশির ভাগ দর্শক গরীব, কেউ কেউ তাই সায় দিয়ে ফেলে।
-দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখুন, সব কিছু নিয়মে বাঁধা। চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা সব টাইম মাফিক চলছে। এমনকি পশুপাখি জলের মাছ, কীটপতঙ্গেরও একটা সিজিন আছে। আর মানুষ? শালা দুনিয়া কা বেইমান। যখন খুশি তখন?
ভিড় স্তব্ধ, যেন লজ্জিত কুণ্ঠিত এই বেইমানির জন্য।
-আরে বাবা অতই সোজা? পৃথিবী হল মা আর আসমান হল বাবা। আমার আপনার ঘরের মা বুন ঋতুমতী হয় মাসে একবার। আর ধরতীমা হয় বছরে একবার। অম্বুবাচির নাম শুনেছেন? জানেন? কাকে বলে অম্বুবাচি? জানেনা না।
কপালে জোড় হাত উঠে আসে,
-মা জগদম্বা রজঃস্বলা হন ওইদিন। চলে যান কামাখ্যা পাহাড়। কামরূপ এক্সপ্রেসে। মাটি ফেটে লাল রক্ত বার হয় সেদিন। সেই রক্তে চোবান এই গামছা-
অসীম ভক্তির সঙ্গে বাঁদীপোতার ফ্রেম উঠে আসে কপালে।
-আপনার স্ত্রী আমার মা জননী। ঋতুর সাত থেকে দশদিনের মাথায় মায়ের গর্ভে আসবে একটি মাত্র ফুল। আবার চলে যাবে সাতদিন আগে। এক কোটি শুক্রাণুর ভেতর একটি মাত্র বীজ পৌঁছবে ফুলে। তবেই আমার আপনার জন্ম হবে। অত সোজা? জোয়ার আছে, ভাঁটা আছে। কজন জানে, জানলেও মানছে কজন।
জনতা সৃষ্টিতত্ত্বে বিভোর। সাক্ষীর কানে দপ্তরির ডাক পৌঁছয় না। পাব্লিকের এই মুগ্ধতা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে যুধিষ্ঠির। প্রবল অত্মবিস্বাসে ধমকাতে থাকে আত্মবিস্মৃত মানুষগুলোকে।
-করুনগে যা খুশি। কেউ কিসসু বলবে না। ছাগল আপনার। আপনি লেজে কাটুন। কিন্তু মনে রাখবেন দাদারা, ঘর ভরে যাবে কামের ফসলে। মানুষ নয়, পশু জন্মাবে মায়ের গর্ভে। নজরুল রবীন্দ্রনাথ বিবেকাননন্দ আসবেন না আর। আসবে ধর্ষণকারি, নোট জালকারি, পাচারকারি। সোনার বাংলা ছারখার হয়ে যাবে। আপনি ভাববেন—ছেলে এমন হল কেন? আমি তো এরকম ছিলাম না।
বাঁদিপোতায় আরেকটা প্রণাম, আসলে দম নেওয়ার ছুতো—
-আরেক ধরণের সংসার আছে বাবারা। বে হয়েছে পাঁচ বছর, সোনার চাঁদের আর দেখা নাই। এলোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি, কবরেজি ফেল। মানত সিন্নি দন্ডিকাটা সারা। সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরে আপনি খোলেন বোতল। জোতজমি বাড়ি গাড়ি খাবে কে? মা বলছে, খোকা এই বাঁজাটার গায়ে কেরোসিন দিয়ে আরেকটা নিয়ে আয়। মুসলমান ভাই ভাবছেন, তালাক দেব না আরেকটা নিকে সারবো।
লা ইলাহা ইল্লাল্লা আসহাদ উল রসুল উল্লা
আপনার বিবি আমার আম্মাজান। আম্মাজানকে খুশি করুন। সোনার চাঁদ আসবে ঘরে।
হাতের মুঠোয় মাদুলির গোছা আবার ঝিকিয়ে ওঠে,
-এক জোড়া নিয়ে জান, দুজনে একসঙ্গে ধারণ করুন। মাংসটা ওইদিন খাবেন না, পেঁয়াজটা ছোঁবেন না। শ্মশানে কবরখানায় গেলে বাড়িতে ঠাকুরের আসনে অথবা জায়নামাজের নিচে রেখে জান।
জ্জ্যয় কালী কলকাত্তাওয়ালি, বচ্চে লোগ বাজাও তালি।
লেখাচার আমার শেষ। বলবেন যুধিষ্ঠির গ্যারান্টি? আজকাল ওয়ারান্টির যুগ মশাই, তবু বলি বাটার সোল আর যুধিষ্ঠিরের জবান, চিরকাল এদের গ্যারান্টি থেকে যাবে।
এ্যাকশন না হলে জিভ ছিঁড়ে নেবেন এই মিথ্যাবাদি যুধিষ্ঠিরের। আর সবচে পুরনো জুতো যার পায়ে সে মারবে বিশ ঘা।
পার পিস পঞ্চাশ টাকা, এক জোড়া নিলে একশ টাকার ধাক্কা। অত জোরে ধাক্কা আজকে দেব না, আজ মহাছাড়। এক জোড়া পঞ্চাশ টাকা মাত্র। তাড়াহুড়ো করবেন না মাত্র ১০ জোড়া আছে। জায়গায় বসে আওয়াজ দেবেন, পেয়ে যাবেন। মায়ের পায়ে ছুঁয়ে দেব এই স্বপ্নাদ্য মাদুলি। কেল্লা ফতে।
(খ)
চায়ের কাপে শেষ চুমুক মেরে রাঘব বলল,
-ধুস, সব বুজরুকি। ওসবে কিসসু হয়না বুঝলি বিশু। আসল জিনিষ হল পিস্টন। কটা পুরুষের পিস্টন ঠিক আছে বলতো ?
বলেই তুলো দেওয়া সিগারেটে একটা টান দেয়। গলগল করে নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে।
এইসব শুনলে যুধিষ্ঠিরের ভেতরে কোথাও একটা ধাক্কা লাগে। রাঘবের ভেতর সব সময় একটা লোচ্চা ভাব। প্রথমেই একটা গোলাপি রঙের হ্যান্ডবিল বার করে মজমার লোকজনকে বিলি করে ফেলবে। তার ভাষাটাই লফঙ্গা মার্কা। প্রথমেই বড় বড় করে লেখা—
বিবাহিত জীবনে আরও বেশি আনন্দ উপভোগ করুন
যাচ্চলে। বিয়ে কি একটা মজা মারবার জিনিষ? এ হল সৃষ্টিকর্মের গোড়াপত্তন। ভগবানের আদেশ না হলে বিয়ে হয়? কত মানুষ সারাজীবন রোজগারপাতি করেও আইবুড়ো কাটায়।
হ্যান্ডবিলের বডির ভাষা আরও অশৈলী।
আপনি কি পুরুষত্ব হারিয়েছেন? ধাতু দৌর্বল্যে ভুগছেন? কোন গোপন রোগ? ধ্বজভঙ্গ অথবা স্বপ্নদোষ? পুরুষাঙ্গ বাঁকা? তাহলে সেবন করুন ডঃ রাঘব ঢালির মহাশক্তি ঔষধ—মদন মঞ্জরী বটিকা।
ওঃ, লোফারটা আবার ডাক্তার! কি সাঙ্ঘাতিক জালিয়াত!
তারপর বাচ্চাগুলোকে কুকুরের মত তাড়াবে। বার করবে একটা এ্যালবাম। তাতে পাতার পর পাতা খারাপ ছবি। বলবে-
-মেয়েদের কামকেন্দ্র কোথায় থাকে জানেন? এখেনে এখেন আর এখেন।
ছবির ওপর আঙুল রেখে রেখে দেখাবে। ছিঃ। এসব হল গিয়ে গুঢ়গুহ্য তত্ত্ব। সৃষ্টির লীলা। এসব কি হাটে বাজারে আলোচনার জিনিষ?
এতেও নিস্তার নেই। যুধিষ্ঠিরের সামনেই সরলাকে ডেকে বলবে,
- ব্লু ফিল্ম দেখেছ বউদি?
সরলা, একে ভীষণ সরল, তায় আব্রু ঠিক নেই, সরল মনেই উত্তর দেয়,
-আর ফিলিম। তোমার দাদা সেই কবে দেখিয়েছে একবার ‘বেদের মেয়ে জোশনা’।
হতচ্ছাড়া রাঘব হ্যা হ্যা করে হাসে। তুলো গোঁজা সিগারেট এগিয়ে দেয়। যুধিষ্ঠির হাত বাড়ায় না।
-নাও নাও। সারাজীবন তো বিড়ি চুসেই কাটালে। রোববার রাতে চিকেন নিয়ে আসব। সঙ্গে দুটো পাঁইট। ঝাল ঝাল নামিও তো বউদি। একটা চাইনিজ ভিসিপি কিনেছি,ফোল্ডীং স্ক্রিন দেওয়া, তোমাকে ব্লু ফিলমের হাতে খড়ি করিয়ে দেব ওইদিন। বাচ্ছারা ঘুমলে চালু হবে। কেমন?
-সারুক খানের বইও এনো সঙ্গে।
সরলার সারল্য অটুট।
-এ রোববার হবে না, বুঝলি রাঘব, আমি একটু বারাসাত যাব।
রাঘব কপিশ চোখে তাকায়। ওই চোখ দুটোই ওর অস্ত্র। জাদু জানে শালা। যখন গলা নামিয়ে বেড়াল চোখে বলে,
-এক ডোজ খান। গরম দুধে ফেলে। একশো টাকার একটা নোট জলে ভেজান। ঠাণ্ডা পেনিসে জড়ান টাইট করে।
তখন ওর গলার ভেতর থেকে একটা মায়ার জাল উঠে এসে ভিড়টাকে ঢেকে ফেলে একদম।
যখন বলে,
-পনের মিনিট অপেক্ষা করুন। নোট ফেটে চারফালা হয়ে যাবে।
লোক ভাবে সত্যি তাই বুঝি হবে। রাঘব কামবায়ু আরও উস্কে দেয়,
-ডবল ডোজ নিয়ে নিন। তিনবার ম্যায়ফিলে জান হাসতে হাসতে। ব্যান্ডেল থেকে গাড়ি ছাড়বেন সিধা হাওড়া। গাড়ি ভেঙে যাবে তবু হ্যান্ডল ছাড়বেন না।
শালার মুখ তো নয়, যেন কাঁচা নর্দমা। বলেই চলে,
-রাত শেষ হলে ভাবী বলবে–সোয়ামি, আজ নয় অফিসে নাই গেলে। মাংস নিয়ে এসো, ঝাল ঝাল করে রেঁধে দি?
হঠাত চাপা গর্জন ছাড়ে,
-চ্যালেঞ্জ? এই হল আসল শিলাজুত। চ্যালেঞ্জ এনিবডি?
(গ)
-আচ্ছা যুধিষ্ঠিরদা, শিলাজুত জিনিসটা আসলে কী বলতো? সত্যিই কি ওতে কাজ হয়?
যুধিষ্ঠির দেখল ট্রেজারির নগেনবাবু চা খাচ্ছেন বিশুর দোকানে। মাসখানেক হল দুটো মাদুলি নিয়েছেন ধারে। এগার বছর বিয়ে হয়েছে এখনও নিঃসন্তান। প্রশ্নটা কানে জেতেই চা খাওয়া বন্ধ করে কান খাড়া করে ফেলেছে এদিকে। সতর্ক যুধিষ্ঠির তড়িঘড়ি বলে ওঠে,
-পড়াশুনো তো করলিনে। শোন তবে।
পকেটের ভেতর থেকে ডাইরি বার করে একটা ভাঁজ করা পুরনো খবরের কাগজের কাটিং বার করে পড়তে থাকে যুধিষ্ঠির গড়গড় করে,
-গ্রীষ্ম ঋতুতে সূর্যের কিরণ সন্তপ্ত হইয়া পর্বত হইতে নির্যাস বসতঃ যে ধাতুসার বিগলিত হয়, তাহাকে শিলাজুত বলে।
ইহা হিন্দুস্থানে শিলাজুত, মহারাস্ট্রে শিলজিত, কর্ণাটকে কলুবেচরু এবং গ্রেট ব্রিটেনে এস্ফাল্ট অথবা বিটূমিন নামে খ্যাত।
এবার এ্যাকশানটা শোন,
ইহা কফ, মেদ, অশ্মরী, শর্করা, মুত্রকৃচ্ছ, ক্ষয়, শ্বাস, বায়ু, পাণ্ডু, অস্মসার, উন্মাদ, শোথ, কুষ্ঠ, উদরপীড়া ও কৃমিনাশক। মাত্রা–দশ রক্তিকা।
কই? কোথায় লেখা ইহা কামশক্তি বর্ধক? যত সব বুজরুকি।
যাক, নগেনবাবু ফের চায়ে চুমুক লাগালেন। ওদিকে রাঘবের লেকচার এখন শেষের পথে—
-ধৃতরাষ্ট্রের কয় ছেলে দাদা? সাগর রাজার? আমাদের দেশের রাজা রাজড়া মুনি ঋষিদের ছিল অনন্ত যৌবন। কী করে? তারা চিনতেন এই পাহাড়ি শিলাজুত। জানতেন এর মর্ম। ত্রিপুরা, আসাম, শিলং, মেঘালয় থেকে আনা এই আসলি শিলাজুত পাচ্ছেন আমার এই ‘মদন মঞ্জরী বটিকায়’। এক ফাইলে চার ডোজ। রাতে শুতে যাওয়ার আগে। শনি, সোম, বুধ, শুক্র। দাম মাত্র একশ টাকা। দু ফাইল একসাথে নিলে দেড়শ টাকা। আর তিন ফাইল, ফুল কোর্স, দুশো টাকা মাত্র।
একগাল হেসে জুড়ে দেয়,
-মনে রাখবেন দাদা, কামানের বারুদ যদি ভিজে থাকে তাহলে গোলা কি টার্গেটে পৌছায়?
বাপ হতে গেলে হিম্মৎ লাগে। খুশি করতে হয় বউকে, তবেই না বংশরক্ষা।
যুধিষ্ঠির তাড়াতাড়ি বিশুকে বলে ওঠে, লক্ষ্য যদিও নগেনবাবু,
-আসল শিলাজুত চিনবি কী করে?
-তুমিই বলে দাও গুরুদেব।
খবরের কাগজ মুখে তুলে নেয় যুধিষ্ঠির,
-পরীক্ষা করিবার উপায়—বিশুদ্ধ শিলাজুত অগ্নিতে নিক্ষেপ করিলে কখনই ধূম নির্গত হইবে না। করে দেখাক, হিম্মৎ থাকে তো করে দেখাক রাঘব।
নগেন বাবু ফিরে যাচ্ছেন ট্রেজারির দিকে যুধিষ্ঠির চোখ সরায় না। বেশ যাচ্ছিল লোকটা। হঠাত কী ভেবে বাঁক নিল। সেঁটে গেল রাঘবের মজমায়।
(ঘ)
বারাসাতে ভোম্বল নারান আর সুমতি থেকে গেল। একে গরমের ছুটি তায় মামাবাড়ির পুকুরের মাছ আর গাছের আম। যুধিষ্ঠিরের আপত্তি ছিল। ছেলেমেয়েগুলো থাকলে রাঘবের সময় অসময়ে আসা যাওয়াটা কমে।
কিন্তু সরলা দাঁত কিড়মিড় করে জানিয়ে দিল,
-একখান সায়া কিনি দিতে পার না। আবার বড় বড় নেকচার। কটা মাদুলি বেচলে এ-মাসে? জম্মে ওরা আম খেতি পেয়েছে তোমার ঘরে? পুকুরের মাছ পায়? হুঁঃ , মরঅদ!
তখন বড় হৃদয়ে বাজল। স্টেশনের পানের দোকানের আয়নায় নিজের হা-ঘরে চেহারাটা দেখে বড় কষ্ট হল অন্তরে। সারা রাস্তা সরলা গজগজ করেই চলল,
-একদিনের তরেও সুখ দিসো আমায়?
যুধিষ্ঠিরের নিচু মাথা যেন আরও নিচু হয়ে গেল শুনে।
পরের রোববার ঠাকুরনগরে যেতেই হল। বাঁদীপোতার গামছা, মাদুলির খোল, সুতো, সব ফুরিয়ে গেছে। গুরুদেব সব জিনিষ যত্ন করে প্যাক করে দিলেন। বললেন,
-যুধিষ্ঠির, কী হইসে তর? ঘরে অশান্তি বাড়সে?
-না, তেমন কিছু না।
-আমারে লুকাইও না, সব বুজি। সকল ব্যবসায়ই মন্দা আসে পড়তাও আসে। বিশ্বাস হারাইও না। মায়েরে স্মরণ রাইখ্য।
ফেরার পথে যুধিষ্ঠির ভাবতে ভাবতে এল। এই ব্যবসায় আর বোধহয় পড়তা আসবে না। মানুষ এখন কেবল কামশাস্ত্র চায়। রাঘব দু-দুটো বক্স লাগিয়েছে। তাতে গাঁকগাঁক করে হিন্দিগান বাজে। হাতে একটা লাল টুকটুকে মাইক। কত সুবিধে, গলায় কোন চাড় পরে না।
ষ্টেশনের পাশে বলখেলার মাঠের কোণে মজমা বসিয়েছে কেতু। ‘মুক্তো হাসি দাঁতের মাজন’। ওমা ! তার সামনেও মাইক! একপাশে একজন দোতারা আর একজন খমকধারি নেচে নেচে গাইছে বাজাচ্ছে। গাছের ডালে চোঙা ফিট করা। কেতু একপাশে দাঁড়িয়ে পরম নিশ্চিন্তে বিড়ি টানছে। লোক হামলে পড়লেই মাজন বেচা শুরু করে দেবে।
আর যুধিষ্ঠির? সামান্য একটা ডুগডুগির ব্যবস্থা করতে পারল না!
-রাঘব এইছিল নাকি?
-ক্যান আসবে? মরতি?এলে চা পায় এককাপ? যা সুখের সংসার আমার।
সরলা ভাতের থালা নামিয়ে কলতলায় চলে গেল।
যুধিষ্ঠির মাথা নামিয়ে ভাত মুখে তুলতে গিয়ে থমকে যায়। চৌকির নিচে তুলো দেওয়ায় সিগারেটের টুকরো এল কোথা থেকে?
এঁটো হাতেই হামা দিয়ে চৌকির নিচে ঢুকে যায় যুধিষ্ঠির। দু’আঙুলে টিপে ধরে টুকরোটা, তারপর এমন ভঙ্গিতে পিষতে থাকে মেঝেয় যেন ওইটাই স্বয়ং রাঘব ঢালির গলার নলি।
(ঙ)
রাঘব, বিশু, নগেনবাবু, সবাই তাজ্জব আজ। যুধিষ্ঠিরে মজমায় ডবল ভিড় কেন? শিব মন্দিরের বারান্দায়, এমনকি অশথ গাছের গুঁড়ি বেয়ে মানুষজন উঁচু হয়ে উঠে দেখছে। রাঘব উঁকি দিল।
যুধিষ্ঠিরের ডান হাতে একটা চাকু। বাঁ হাতের চেটোয় করোটি। ডজন পাঁচেক মাদুলি ঝুলছে গলায়। মুখের দিকে তাকান যায় না। চোখমুখ লাল। কাঁচাপাকা চুল উষ্কখুষ্ক। টলছে। মনে হয় পেটে দ্রব্যও গেছে। পা দিয়ে ধুলো ছিটিয়ে দিল খানিক। বিকট হুঙ্কার ছাড়ল একটা,
‘হোলি হোলি খুন কি হোলি,আ যা মুণ্ডু আঁখ মিচোলি
চাক্কু সে ভর তেরা লহু, না কোই বেটা না কোই বহু’
বলতে বলতে, প্রকাশ্যেই, জোড়া জোড়া মন্ত্রমুগ্ধ চোখের সামনে, বুকের কাছে জামাটা পড়পড় করে ছিঁড়ে ফেলল যুধিষ্ঠির। তারপর ছুরি দিয়ে এলোপাথাড়ি আঁচড় কাটতে লাগল পাঁজরার ওপর। হু হু করে লাল রক্ত এসে ভিজিয়ে দিল বুকের সাদা লোমগুলো। আর লোম বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে সেই রক্ত পড়তে লাগল পেটের কাছে ধরা করোটির হাঁ করা মুখটার ভেতর।
‘খা পিশাচী রক্ত খা, রোগ বালাই সব ভাগাকে যা
জ্জ্ব্য় ক্কালী কলকাত্তাওয়ালি, খুন মিলেগা খুনকি হোলি’।
রাঘব, কেতু আরও কয়েকজন দর্শক মিলে পড়ে যাওয়ার আগেই ধরে ফেলল যুধিষ্ঠিরকে। জ্ঞান হারানোর আগে তার শেষ কথা-
-নিয়ে যান, সর্বরোগহর মাদুলি। পার পিস দশ টাকা, দশ টাকা, দ...।
পাক্কা কুড়ি দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল যুধিষ্ঠির। রাঘব একটু খাওয়ায় দাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল সেদিন। যাতে গায়ে জোর ফিরে আসে জলদি। রাঘবের দু-দুটো বউ কোমর বেঁধে লেগে পড়েছিল রান্নার কাজে।
খাওয়া দাওয়া সেরে একটা থার্মোকলের বাক্সো যুধিষ্ঠিরের হাতে তুলে দিয়েছিল কেতু। খুলে দেখা গেল একটা হালকা পলিথিনের চোঙা আর তার লাগান মাইক্রোফোন। ব্যাটারিতে চলে।
-নাও, তোমায় আর গলা ফাটাতে হবে না। বুক চিরে রক্ত বার করতেও হবে না। একটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁক মারবে—জ্জয় কালী কলকাত্তাওয়ালি—ব্যাস।
-না, না রাঘব। এ আমি নিতে পারবো না। এর যে অনেক দাম।
-দাম দিতে হবে না তোমার। নগেনবাবুর বউয়ের পেটে বাচ্চা এয়েছে। উনি এটা কিনে দিয়েছেন তোমায়।
আজকাল, স্টেশন চত্বরে, বাটা কোম্পানির সামনের ফুটপাতে, তারক ফার্মেসির শাটারের এক পাশে দিনে দু’বার করে মাইকে ভাসে যুধিষ্ঠিরের গলা। বয়ান একদম আলাদা,
-গ্যাস বার্নার পরিষ্কার করবার পিন নেবেন স্যার? বাড়িতে এখনও যদি জনতা ইস্টোভ থাকে তবে তার ফিতে নিয়ে যান। সায়ার দড়ি লাগবে? কান খুঁচুনি? আসল তামা স্যার। কানে ঘা হবেনা। গেরস্থালির যে কোন জিনিষ স্যার? চায়ের ছাঁকনি? সাবানদানি? যা নেবেন, তিনটে নিলে একটা ফ্রি...।
ইচ্ছে অপূর্ণ রয়ে যায়
ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য্য
বা ড়ি ফিরতেই লতিকার কথার ঝড় আছড়ে পড়ে সুবলের উপর।
কোথায় ছিলে তুমি? ইসকুল ছুটি হয়েছে কোন কালে। বাড়ির কোনো কাজে পাওয়া যায় না, সারাদিন শুধু...
ভ্যানটা উঠানের একপাশে রেখে দুয়ারের সামনে এসে দাঁড়ায় সুবল। হাঁপিয়ে গেছে খুব। জোরে ভ্যান টেনে বাড়ি এসেছে।
কাল চড়ক সংক্রান্তি। ধর্মরাজের পুজো। গ্রামে বিরাট ধুম। ভোরবেলা থেকে পাঁচটা গ্রামের মানুষ পুজো নিয়ে হাজির হবে ধর্মরাজের মন্দিরে। সেই উপলক্ষ্যে আজ ছেলে মেয়েদের নাম ডেকেই স্কুল ছুটি হয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকবে তিনদিন। স্কুলের ঘরে গেটে তালা চাবি মেরে বাড়ি ফিরছিল সুবল। রতন বিশ্বাস ফোন করে। জলের অর্ডার আছে। এখুনি পৌঁছে দিতে হবে কুড়ি জার পানীয় জল। ভ্যান নিয়ে রতনের জলের প্লান্টের দিকে যাচ্ছিলো সুবল। তখন ফোন করে লতিকা। বলে মেয়ের জ্বর। তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো। কি বিপদ! মাঝরাস্তা থেকে তাড়াহুড়ো করে বাড়ি আসে সুবল।
চোত মাসের দিন। সূর্যের তাপে হাড় শুকিয়ে যায়। চমচমে রোদ মাথায় নিয়ে মাইল তিনেক রাস্তা ভ্যান টেনে এসেছে। জল তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। লতিকাকে জলের কথা বললে হাজার কথা শুনিয়ে দেবে আবার। দরকার নেই তার। আগে গা ঠাণ্ডা হোক। তারপর নিজেই নিয়ে জল খাবে। ঘরে আসে সুবল। লতিকার কোলে শুয়ে রয়েছে মেয়ে। রতনকে দেখে লতিকার কাছ থেকে উঠে আসতে চায়। জ্বর গায়ে তুই খেলে বেড়াবি। বলে মেয়েকে জোর করে কাছে টেনে নেয় লতিকা। মেয়ের কপালে গালে গায়ে হাত ছোঁয়ায় সুবল। কোথায় জ্বর? গা একদম ঠাণ্ডা। যতো অলক্ষণে কথা তোর। লতিকাকে বলে সুবল।
ইস, কি বুদ্ধি রে। রোদে পোড়া হাতে মেয়ের জ্বর দেখতে এসেছে! গরম হাতে গায়ের তাত বোঝা যায়? গলা চড়ায় লতিকা। যাও, কিছু করতে হবে না তোমায়। সারাদিন সংসারের কোন কাজে লাগো তুমি। সুধীর মাস্টারের সঙ্গে সমুদ্দুর থেকে সূর্য ওঠা দেখতে যাও। সেই ভালো। ছেলে মেয়ে নিয়ে আমি মরে পড়ে থাকি। লতিকার দু চোখে জল।
এতক্ষণ চুপ ছিল সুবলের মা। কোমরের ব্যথা বলে আজ সকাল থেকে উঠতে পারেনি। ভোর বেলায় উঠানে গোবরগোলা জল দিতে হয়েছে সুবলকে। তুই বাপ নয় সুবল, পাষণ্ড একটা। মেয়ের গা পুড়ছে, আর তুই চললি সুধীর মাস্টারের সঙ্গে নাচতে। পই পই করে বললাম সংক্রান্তির সময় বাড়ির বাইরে থাকতে নেই। ধর্মরাজের রোষ পড়ে সংসারে। ঠাকুর কি বিপদ দিল দেখ দিকি। ঘর থেকে বলে সুবলের মা। শাশুড়ির কথার পোঁ ধরে লতিকা। থাক মা, ছেড়ে দিন। ওসব কথা ওকে বলে লাভ নেই। ভাববে বেড়াতে যাওয়ায় বাধা দিচ্ছি। দেখছেন না বলছে মেয়ের গায়ে জ্বর নেই। নেই তো নেই যাও।
লতিকার কথায় কথা দেয় না সুবল। আবার ফোঁস করে উঠে বলে বসবে কি না কি কথা। যাওয়া হবে না সুবলের। এই কয়দিন অনেক কাঠ খড় পুড়িয়েছে সুবল। তবেই রাজি হয়েছে। নয়ত সুধীর মাস্টারের সঙ্গে চাঁদিপুর যাওয়ায় কিছুতেই সায় দিত না লতিকা।
ঘামে ভেজা জামাটা খুলে বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেয় সুবল। গামছায় গায়ের ঘাম মোছে। রান্নাচালা থেকে সুবলকে উদ্দেশ্য করে নানা কথা বলে চলে লতিকা। বলছি আমার কথা কানে গেলো? নাকি সুধীর মাস্টারের কথাই ভেবে চলেছ। এইবার মুখ খোলে সুবল। শুনছি, বল। যাক তবু শুনে শান্তি যে আমার কথা কানে নিচ্ছো। আমার সাত পুরুষের ভাগ্যি। কাঠের উনুনে ফুঁ দিতে দিতে বলে লতিকা। কাজ আছে। আবার অর্ডারের জল দিতে বামনগাছি যেতে হবে। যা বলার তাড়াতাড়ি বল। বলে সুবল।
হারু ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে এসো। রাত বিরেতে আমি একলা কোথায় ছুটবো। ওদিকে মাও বিছানা নিয়েছে। সব দায় এখন আমার উপর। আবার সন্ধ্যা হলেই তো তুমি...।
আজ রাতে সুধীর মাস্টারের সঙ্গে বেড়াতে যাবে সুবল। ঠিক বেড়ানো নয়। দুদিনের জন্য একটু অন্য রকম কাজে বাইরে যাবে। এদিকে মেয়ের জ্বর। এই অবস্থায় কি হয় কে জানে। আদৌ যাওয়া হবে কি না সে ধর্মরাজ জানে। সুবল মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে দেখেছে। ভিতরে ভিতরে জ্বর থাকলেও হাতের ছোঁয়ায় তা বোঝা যায়নি। দেখা যাক, হারু ডাক্তারের ওষুধ মেয়ের পেটে পড়লে জ্বর ছেড়ে যাবে হয়ত। তাছাড়া সুবল রওনা দেবে সেই রাত নয়টার সময়।
সুধীর মাস্টারের জামাই চাঁদিপুরে ট্রান্সফার হয়েছে সপ্তাহ দুয়েক আগে। হোটেলে ছিল এতদিন। দিন দুয়েক হলো কোয়াটার পেয়েছে। তবে বসবাসের ঠিক উপযুক্ত নয়। মানুষ না থাকলে বাড়ি ঘর যেমন হয় আরকি। কথায় কথায় জামাইয়ের কোয়াটারের অবস্থার কথা সুবলকে বলে সুধীর দিন কয়েক আগে। অচেনা জায়গা। আসবাব সামান্যই। সবই আমার বাড়িতে রয়েছে। নিয়ে যেতে হবে। জামাই তেমন পোক্ত ছেলে নয়। সঙ্গে ছোট্ট বাচ্ছা। ভাবছি সংক্রান্তির ছুটিতে নিজেই যাবো। এখান থেকে কাউকে সঙ্গে নিয়ে...।
এ আর কি এমন কাজ মাস্টার মশাই। দুটো দিন হাতে সময় পেলেই বাড়ির রূপ ফিরিয়ে দেবো। বলে সুবল। চিন্তা মুক্ত হয় সুধীর। সুবল কাজের ছেলে। সুধীর বলে, চিন্তা করিস না সুবল। বিনে পয়সায় খাটাবো না তোকে। দুদিন কাজ করবি দুহাজার টাকা দেবো। গাড়ি করে নিয়ে যাবো তাছাড়া...।
চাঁদিপুরে সমুদ্র আছে। ভোর বেলায় সমুদ্রের বুকে লাল সূর্য ভেসে ওঠে। লাখ টাকা খরচ করলেও অমন দৃশ্য দেখা যায় না, বলে সুধীর। সুধীর মাস্টারের কথা শুনে সুবলের গায়ে সমুদ্রের বাতাস লাগে যেনো।
সমুদ্রের কথা শুনে চনমন করে ওঠে সুবলের মন। সেই ছেলেবেলার সাধ। সুবল তখন ছোটো। সজনেখালি যেতো মায়ের সঙ্গে। মামাবাড়ি। সেখানে মামার কাছে সমুদ্রের গল্প শুনতো। কেমন করে বড় বড় ঢেউ সামলে ডিঙি নিয়ে মাছ ধরে সুবলের মামা। বহুবার বায়না করেছে মামার কাছে, সমুদ্র দেখবে। রাজি হয়নি সুবলের মা। বড় হয়ে যাবি সমুদ্দুরে। তারপর থেকে আর বড় হয়নি সুবল। সমুদ্দুর দেখার ইচ্ছে অপূর্ন রয়ে গেছে। সুধীর মাস্টারের কথা শুনে সেই অপূর্ণ সাধ গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে আবার। মনে মনে ঠিক করে সুবল এ সুযোগ ছাড়া যাবে না মোটেই। বিনে পয়সায় কাজ করবো মাস্টার মশাই একবার সমুদ্দুর দেখবো আমি। বলে সুবল। মোবাইলে সমুদ্র থেকে সূর্যদয়ের ছবি দেখায় সুধীর। অবাক হয় সুবল।
সেদিন রাতের বেলায় চাঁদিপুরের কথা বাড়িতে বলে সুবল। সামনে বসে সব কথা শুনছিল সুবলের সাত বছরের ছেলেটা। জিজ্ঞাসা করে বাবা চাঁদিপুর কোথায়? ছেলের প্রশ্নে হোঁচট খায় সুবল। সমুদ্দুরের কথা শুনে আর শোনা হয়নি সুবলের চাঁদিপুর কোথায়। তবে সমুদ্দুর যখন সজনেখালির কাছাকাছিই হবে। ওই তো ক্যানিং পার হলেই সজনেখালি। তারপরেই চাঁদিপুর। কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলে সুবল। আমি সঙ্গে যাবো বলে সুবলের ছেলে। তুই গেলে সামলাবে কে? আমায় কাজ করতে হবে যে। বলে সুবল। হতাশ হয় সুবলের ছেলে। চেয়ে থাকে বাবার দিকে। ছেলের দিকে তাকিয়ে বুকটা বেজে ওঠে সুবলের। ছেলেবেলার সুবলকে মনে পড়ে। ছেলের মাথায় হাত রেখে আদর করে খানিক।
না না বাপু, অত দূরে গিয়ে কাজ নেই। চাঁদিপুর অনেক দূর। তাছাড়া সংক্রান্তির সময় বাড়ির মানুষ বাইরে থাকবে, সে বড় অমঙ্গলের কথা। বলতে বলতে গলা ধরে এসেছিল লতিকার। পিছিয়ে থাকেনি সুবলের মা। সংক্রান্তি বলে কথা। বাবা ধর্মরাজের পুজো। তোকে পয়সা আনতে অত দুর যেতে হবে না সুবল। সজনেখালি কি এখানে!
মা বউ এক জোট হয়ে বলছে সংক্রান্তি, সংসারের অমঙ্গল...। সুবল বলে সুধীরকে।
সুবলের কথা শুনে হাসে সুধীর মাস্টার। বলে, সংসার মরীচিকারে সুবল। যা দেখিস সব মিথ্যে। যা বুঝিস সে সত্যি নয়। এখানে কেউ কারো পক্ষে নেই। বিপক্ষেও নেই। সবাই এক একটা পক্ষ। নিজের টুকু বুঝে নেয় সবাই। সে ব্যাপারে হিসাবের গড়মিল করে না কেউ। সংসারে নিজের জন্য বাঁচতে চাওয়া বড় কঠিন। অদৃশ্য গণ্ডি টানা আছে চারপাশে। টপকে বাইরে আসা সহজ নয় বড়। এ সত্যি আমি আগেই বুঝেছি।
বড় অদ্ভুত লাগে সুধীরের কথা। কিছুটা বোঝে সুবল। কিছুটা তার বোধের ওপারে থাকে।
পয়সা উপার্জনের চিন্তায় দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে সুবলের। উদয়স্ত হাড় ভাঙ্গা খাটুনি। ভোরবেলায় রতন বিশ্বাসের প্লান্ট থেকে পানীয় জল ভর্তি জার নিয়ে এদিক সেদিক দিতে যায়। সময়ের ভুল চুক হলে কড়া কথা শোনায় রতন। এরই মধ্যে সময় বের করে পাশের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের গেট খুলে ঘর দোর ঝাঁট দেয়। স্কুল ছুটি হলে ঘরে ঘরে তালা মেরে দিতে হয় সুবলকে। এ কাজে মাস শেষে ছয়শ টাকা দেয় সুধীর। মাঝে মধ্যে সুধীর মাস্টারের কাছে নানা গল্প শোনে সুবল।
সুধীর মাস্টারের পায়ের তলায় সর্ষে। স্কুলে ছুটি পেলেই পাহাড় নদী সমুদ্র দেখে বেড়ায়। ফিরে এসে গল্প বলে সুবলকে। সেই সব কথা শুনে বহুদিন শুয়ে আঁধার ঘরে পাহাড়, নদী, ঝর্না দেখেছে সুবল। গভীর রাতে মনের মাঝে ঘুমিয়ে থাকা ইচ্ছেটা সমুদ্রের মত গর্জন করে নাড়া দিয়েছে সুবলকে। ঘুম ভেঙেছে সুবলের। লতিকা বলে, মরণ, সারাদিন জল বেচে রাতের বেলায় যত ভীমরতি হয়। উত্তর দেয় না সুবল। চেয়ে থাকে চার দেওয়ালের মধ্যে ধরে রাখা অন্ধকারে।
রোজ রাতে নানা কথা বলে লতিকার সায় পেয়েছে সুবল। এমনি এমনি ঘুরতে যাচ্ছে না, দুই হাজার টাকা হাতে পাবে। উপার্জনের অর্থ - অঙ্ক সামনে এনে সংক্রান্তির নিয়মের লক্ষ্মণরেখা কেটে বাইরে আসতে চেয়েছে সুবল। পেরেছে। নেহাত দু পয়সা আসবে, নয়তো...। বলে লতিকা।
আজ সকাল থেকে মনে মনে বেশ উত্তেজিত সুবল। শেষ দু তিন দিন রতনের প্লান্টে বাড়তি সময় ধরে কাজ করে দিয়েছে। দু দিন থাকবে না। কাজের ঘাটতি আগাম মিটিয়ে দিয়েছে তাই। নয়ত মাস শেষে মাইনে কাটা যাবে। আজ কাজের মধ্যে বার বার আনমনা হয়েছে সুবল। ঠিক রাত নয়টায় গাড়ি ছাড়বে সুধীর মাস্টারের বাড়ির সামনে থেকে।
পর পর দু গ্লাস জল খায় সুবল। জল তেষ্টা মেটে। চেয়ে থাকে ঘরের দিকে। মেয়ে কোলে নিয়ে বসে রয়েছে লতিকা। সকাল বেলায় কাজে যাবার সময় দেখেছিল উঠোনে বসে খেলছে মেয়েটা। কয়েক ঘন্টার মধ্যে কি এমন হলো। যখনই শুনেছে মেয়ের জ্বর মনে মনে সহস্র বার প্রণাম করেছে ধর্মরাজকে। মেয়ে যেনো সুস্থ থাকে নয়তো যাওয়া হবে না সুবলের। মা বউয়ের কথা কেটে বেরিয়ে যেতে পারবে কিন্তু অসুস্থ সন্তান বাড়িতে রেখে সমুদ্র দেখে শান্তি পাবে না সুবল।
আবার ঘরে ঢুকে মেয়ের কপালে গায়ে হাত ছোঁয়ায় সুবল। সুবলের কাণ্ড দেখে এইবার আগুন জ্বলে লতিকার মাথায়। রেগে উঠে বলে, মিথ্যে বলছি আমি? মেয়ের শরীর নিয়ে রগড় করছি তোমার সঙ্গে? আমি মা। আমি জ্বর বুঝিনে। মেয়ের জিভের তাতে আমার বুক পুড়ে যাচ্ছে। উনি বলছেন জ্বর নেই। যাও যাও। ওষুধ না খেয়ে মরুক আমার মেয়ে। তোমাকে...। বাকি কথা বলতে পারে না লতিকা। গলা ধরে আসে কান্নায়।
জামা গায়ে চড়ায় সুবল। হারু ডাক্তারের বাড়ি যাবে। কি বলবো ডাক্তারকে? জিজ্ঞাসা করে সুবল।
চোখের জল খুঁটে মুছে বলে লতিকা, তাও বলে দিতে হবে? একটা দু বছরের বাচ্ছা মেয়ের জ্বর এলে কি বলতে হয়...। সুবলের মা গলা তুলে বলে আমার ব্যথার ওষুধ আনবি সুবল।
বাড়ির বাইরে পা রাখে সুবল। ঘর থেকে মেয়েটা বায়না ধরে সুবলের সঙ্গে যাবে। লতিকা ধমক দিয়ে চুপ করায় মেয়েকে।
ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফেরে। রতন বিশ্বাস ফোন করে। আমার কথার দাম আছে সুবল। ব্যবসায় কম্পিটিশন প্রচুর। সময় মতো অর্ডার সাপ্লাই করতে না পারলে বদনাম হবে। তুই না পারলে বল, কতো লোক বসে আছে কাজ করবে বলে। রতনের কথায় মৌমাছির হুল। গায়ে জ্বলন ধরে ভীষণ। কিছু বলার উপায় নেই। ভ্যান নিয়ে দৌড় দেয় সুবল। অর্ডারের জল নিয়ে যেতে হবে বামনগাছি। তারপর আবার কোথাও। তারপর...।
ছুটি পেতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবে। বছর বছর চলছে এইভাবে। সংসার সরস রাখতে নিজেকে নিংড়ে নিরস হয়ে উঠেছে সুবল।
বেলা ঢলে এসেছে। বাড়ির পথ ধরে সুবল। বামুন পুকুরের পাড়ে এসে দাঁড়ায়। দূরে দাসেদের তাল গাছের মাথায় লাল সূর্যটা আটকে রয়েছে। একমনে তাকিয়ে থাকে সুবল। মনে মনে একটা খুশির হাওয়া বয়ে যায়। সুধীর মাস্টারের মোবাইলে এমনই লাল সূর্য সমুদ্রের বুকে ভাসতে দেখেছে সুবল। কাল ভোরে নিজের চোখে দেখবে। আরো কিছুক্ষণ চেয়ে দেখে দিনান্তের সূর্যটাকে। প্যাডেলে চাপ দেয় এইবার। বাড়ি গিয়ে জিনিস পত্র গুছিয়ে নিতে হবে। রাত নয়টার মধ্যে...।
তুমি জ্বরের কথা বলেছিলে ডাক্তারকে? উঠানে পা রাখা মাত্র জিজ্ঞাসা করে লতিকা। কেনো? বলেছি তো। বলে সুবল। বলেছো তো জ্বর কমে না কেনো? কেমন ওষুধ এনেছ কে জানে। সুবলের মা বলে হতচ্ছাড়া হারুর ওষুধে কোনো কাজ হয় না। শালা হাতুড়ে। আমার ব্যথা এক ছিদিম কমে নি।
মেয়ের জ্বর কমেনি শুনে হতাশ হয় সুবল। যাওয়া হলো না তবে আর।
তুমি আর একটি বার ডাক্তারের কাছে যাও। বলো জ্বর ছাড়েনি। তুমি থাকবে না। বিপদ হলে আমি কোথায় যাবো বলো। চিন্তিত লতিকা।
হারু ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে এসেছে সুবল। বাচ্চা না দেখে আর ওষুধ দিতে পারবে না। তেমন হলে হাসপাতাল নিয়ে যা। বলেছে হারু। সন্ধ্যে বেলায় মেয়ে নিয়ে বাইরে যাবে না লতিকা। বামুন পুকুরের পাড়ে অপদেবতার বাস। মেয়ের শরীর শুকিয়ে যাবে। যদি যেতেই হয় কাল যাবে হাসপাতাল। তাতে মেয়ের যা হয় হবে। মাথার উপরে ধর্মরাজ আছে।
রাত হয়েছে। সুবল অনেক আগেই সুধীর মাস্টারকে খবর দিয়েছে মেয়ের জ্বর ছাড়েনি। দুয়ারে বসে রয়েছে সুবল। ঘুম ঘুম চোখে ছেলেটা বলে, বাবা যাবে না তুমি? চুপ থাকে সুবল। লতিকা বলে কি করে যাবে? সব কপাল। নয়তো দু হাজার টাকা আসতো সংসারে। এমন দিনেই মেয়ের জ্বর আসতে হয়! ধর্মরাজের চোখ নেই। কাপড়ের খুঁটে চোখের জল মোছে লতিকা।
কোলের কাছে মেয়েকে নিয়ে শুয়েছে লতিকা। সুবলের পাশে ছেলেটা। গাজন সন্ন্যাসীদের চিৎকার শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যায় সুবল।
ভোর হয়েছে। সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে সুবল। পাশে সুবলের ছেলে। টকটকে লাল সূর্য ভাসছে সমুদ্রের বুকে। দুচোখ ভরে সূর্য দেখ। এই হলো সমুদ্র। ছেলেকে দেখায় সুবল। খুব খুশি সুবল। আনন্দে লাফাচ্ছে একরত্তি ছেলেটা। শেষমেষ পিছুটান কাটিয়ে আসতে পেরেছে সুবল।
পশ্চিমপাড়া থেকে ঢাক বাজিয়ে ধর্মরাজের পুজো নিয়ে যাচ্ছে দশ বিশ জনের একটা দল। ঢাকের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় সুবলের। এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল সুবল। উঠে বসে বিছানায়। সুবলের মা উঠোনে গোবরজল ছিটিয়ে দিচ্ছে। গতকালকের অসহনীয় ব্যথা আজ উধাও। মাঝে মাঝে যে মায়ের কি হয় ভাবে সুবল। লতিকা চান করে তৈরি হয়েছে পুজো দিতে যাবে। মেয়েটা কাঁথা ভিজিয়ে শুয়ে রয়েছে। তাড়াতাড়ি করে মেয়েকে কোলে তুলে নেয় সুবল। ভিজে বিছানায় আবার ঠাণ্ডা লাগবে, বলে সুবল। না না কিছু হবে না। তুমি কাঁথাটা বদলে দাও। আমি চান করেছি আর হাত দেবো না। বলে লতিকা। মাটির সরায় পুজোর উপকরণ নিয়ে মন্দিরে যাচ্ছে লতিকা। দেরি হয়ে গেছে। তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বাইরে যায়। ফিরে আসে আবার। প্রণামীর ষোলো আনা নেওয়া হয়নি। কুলুঙ্গির দিকে হাত বাড়ায়। বেতের ছোটো ঝাঁপিটা উল্টে পড়ে। কয়েকটা সিকি, আদুলির সঙ্গে চারটে ট্যাবলেটও পড়ে ঘরের মেঝেতে। ভীষণ অবাক হয় সুবল। ভালো করে দেখে। হারু ডাক্তারের দেওয়া জ্বরের ওষুধ চারটে পড়ে রয়েছে। যেমন দিয়েছিল তেমনই রয়েছে ওষুধ গুলো। কুলুঙ্গির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে লতিকা। চেয়ে আছে মেঝের দিকে। সুবলের দৃষ্টি গেঁথে রয়েছে লতিকার মুখের উপর। এক বোধ্য নীরবতা জমাট হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে ঘরে। মেয়েটার জ্বর ছিল না? একরাশ বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে সুবল। নির্বাক লতিকা। উত্তর নেই তার মুখে। সুবলের প্রশ্নের জবাব হয়ে সজল চোখে দাঁড়িয়ে থাকে লতিকা।