শারদ
সংখ্যা


Story Khonjporibar sharod sonkhya


খুলা কিতাব

প্রতাপ বোস


মস্তে বোসজি” আচমকা সম্ভাষণে চমকে দেখি পোর্টা কেবিনের দরজাটা সটান খুলে দাঁড়িয়ে আছেন একজন হাট্টাগোট্টা বয়স্ক মানুষ। বয়সটা সাদা রঙের খোঁচা খোঁচা কদমছাট চুল, সাদা মোটা লোমশ ভ্রু ও কপালের থরে থরে সাজানো থর মরুভূমির বালির ঢেউয়ের প্রেক্ষিতে বোঝা গেলেও ইস্পাত কঠিন চোয়াল, হাফ হাতা সাদা শার্টের হাতা ফুরে জেগে ওঠা মুগুর ভাজা হাতের গুলি, একটা বোতম খোলা বুকের ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া পেশি আর চকচকে ছুরির মতো শানিত চোখ জানান দিচ্ছে লোকটা বাহুবলি গোছের।


বিহারের কুখ্যাত বেগুসরায় জেলায় আওসি-র কল্যাণে বিখ্যাত এই বারৌনি এলাকা কিছুটা উন্নত হলেও দ্রুত শিল্পায়নের ফলে কন্ট্রাক্টরি রাজ আর উড়তে থাকা কাঁচা টাকার দৌলতে মাফিয়ারাজও বেশ জমিয়ে বসেছে। এই মাফিয়ারাজের অলিখিত ডন সুরজভান সিং। তবে সুরজভান সিং যতটা না নিজে এই অঞ্চলে সক্রিয় তার থেকেও তাঁর নাম ভাঙিয়ে ছোট মেজ বড়ো কুচো সবরকমের মাফিয়ারা এখানে বহাল তবিয়তে রাজ করে চলেছে। 


আওসি-র ন্যাপথা ক্রাকার প্লান্টের একটা প্রজেক্ট আমাদের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি পেয়েছে এবং এলাকা না বুঝে আওসি-র ইআইসি-র কথায় কলকাতা থেকে কন্ট্রাক্টর ফাইনাল করে এবং দাসবাবুর মতো একজন নরমসরম ভালোমানুষ গোছের লোককে প্রজেক্ট ইন চার্জ করে একেবারে লেজে মাথায় মাখিয়ে দই করে ফেলেছে। দাসবাবুর কথায় সেই দই যখন প্রায় ঘোল হতে বসেছে তখন আমার উপর দায়িত্ব পড়ল সাইট ভিজিট করে ব্যাপারটা একটু সাল্টে আসার।


সাল্টে আসার কথায় বারৌনির ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে গিয়ে দেখলাম পাল্টে আমার ঘাড়ে বাঁশ আসছে। তবু উপরওয়ালার নির্দেশ, আসতেই হবে। রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে ও বারৌনিতেও স্মরণ করতে করতে সোজা চলে এলাম বারৌনি। 


জিরো মাইলে হোটেল যুবরাজ ডিলাক্স। সেখানেই সকাল সকাল চেক ইন করে হেভি ব্রেকফাস্ট করেই সাইটে চলে এসেছি। তারপর পুরো তিনঘন্টা দাসবাবুকে নিয়ে পুরো সাইট ঘুরে দেখে গনগনে রোদ আর টনটন ধুলোর ঝড় খেয়ে এবং হালকা লাঞ্চ করে বিশ্রাম নিতে চল্লিশ ফুট বাই দশ ফুটের পোর্টা কেবিনের পেটে সেঁধিয়েছি।


দাসবাবু এর মধ্যেই সাইটের সব সমস্যা উজাড় করে দিয়েছেন, বিশেষকরে এখানকার কন্ট্রাক্টররা তাঁকে কীভাবে উঠতে বসতে চমকাচ্ছে, মানসিক নির্যাতন করছে তার বিশদ বিবরণও দিয়ে দিয়েছেন।


দুই মাফিয়া কন্ট্রাক্টরের বিরোধ, তার সাথে এই মাফিয়াদের হাত থেকে দাসবাবুকে কীভাবে বাঁচানো যায় এই নিয়ে যখন আমি চুল ছিঁড়ছি দেখি ‘বস এসে গেছেন এবার উনি সামলান’ এরকম একটা ভাব নিয়ে দাসবাবু দিব্যি ওরকম একটা কাঠখোট্টা লোহালক্কর ঘামঝড়া জায়গায় ‘দুই নারী হাতে তরবারি’ উপন্যাসটা খুলে পড়তে শুরু করে দিয়েছেন। মনে হয় এঁদেরকেই বইপোকা বলা হয়। 


যাইহোক, ঠিক এই সময় দরজায় দাঁড়িয়ে বয়স্ক ভদ্রলোক আরও একবার হাঁক পেড়ে বললেন, “নমস্তে বোসজি।”


দাসবাবু সাথে সাথে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে হাত ধরে ভদ্রলোককে ডেকে নিয়ে এসে পরিচয় করালেন, “সামশের সিং, আমাদের মেকানিক্যাল কন্ট্রাক্টর।”

ভদ্রলোক মনে হয় এমন পরিচয়ে খুশি হলেন না, ঝোলা গোঁফ পাকিয়ে বললেন,“আপলোগকা নহি দাসবাবু, হম অঞ্জনি সিং কা কনটাকটর হু। অর ওহি সে সরি মোসিবত্ পয়দা হুয়ি হ্যয়।”

“নমস্তে সামশেরজি, আপ বৈঠিয়ে।” আমি প্রতি নমস্কার করে ভদ্রলোককে বসালাম। বললাম আমাদেরই ভুল হয়েছে আওসি-র ইআইসি-র কথায় পুরো কন্ট্রাক্ট অঞ্জনি সিং কে দিয়ে। 


অঞ্জনি ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ট্রাক্টর, আওসি-র রেকমন্ডশনে ইলেক্ট্রিক্যাল মেকানিকাল পুরো কাজটা নিয়ে সামশেরকে মেকানিকাল কাজটা সাব-কন্ট্রাক্ট করেছে। অঞ্জনি এই যে মেকানিকাল কাজেরও মুফতে মধু খেয়ে যাচ্ছে এটা সামশেরের একদম না পসন্দ। এই নিয়ে সাইটে দুই মাফিয়ার ঝামেলা লেগেই রয়েছে, কখন যে কী হয় বুঝতে পারছি না। সবাই বেশ টেনসড। 


কিন্তু আওসি-র ইআইসি-র কথাটা আমার থেকে শুনে দেখলাম সামশের আরও রেগে গেলেন। চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “বহেন চোদ, শালে হারামখোর, হমসে পয়সা লেকে অঞ্জনি কো কাম দিলাতা হ্যয়। হম উসকো ছোড়েগা নহি।”

তারপর উত্তেজনায় কোমর থেকে খাঁটি নাইন এমএম অস্ট্রিয়ান গ্লক পিস্তলটা বের করে টেবিলে রাখলেন। এইসব ক্ষেত্রে নার্ভটা ঠিক রাখা খুব জরুরি। আমি মুহূর্তে পিস্তলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সময় নিয়ে দেখতে দেখতে বললাম, “আরে সামশেরজি, এহি হম ঢুনঢ রহে থে, আজ মিল গয়া, মেরা বেটা কো এহি খিলোনা বহত পসন্দ হ্যয়।”

আমার কথা শুনে সামশের সিং প্রথমে অবাক, তারপর হো হো করে হেসে উঠে পিস্তলটা আমার হাতের থেকে নিয়ে বলল, “বোসজি আপলোগ মজাক বহত অচ্ছে তরিকে সে করতে হো। মুঝে বহত পসন্দ আয়া।”

আমি সুযোগ বুঝে আসল প্রসঙ্গে চলে এলাম,

“সামশেরজি আপ ইতনা বুজুর্গ হ্যয়, ইতনা সমঝদর হ্যয়, আপকো সামনে ইয়ে দাসবাবু কুছভি নহি হ্যয়, উমর মে উও আপকা বেটা য্যায়সা হ্যয়, ফিরভি...” আমি একটু দম নিলাম।

“ফিরভি কেয়া?”

“ফিরভি আপলোগ দাসবাবু কো ইতনা তং করতা হ্যয়, চমকতা হ্যয়, ডরাতা হ্যয়, ইয়ে কিউ?”

বাংলার খাঁটি সরষের তেলে চোখে জল এসে যায় আর মাফিয়ার হৃদয় গলবে না! কিন্তু আমাকে অবাক করে সামশের হঠাৎ বাজখাঁই গলায় বলে উঠল, “আপ কিতাব বিলকুল খুলা রাখেঙ্গে অউর হাম না পড়ে?”

চমকে উঠে দাসবাবু তাড়াতাড়ি তাঁর গল্পের বই বন্ধ করলেন। দাসবাবুর কাণ্ড দেখে মনে মনে হেসে আমি বললাম, “মতলব?”

এবার সামশের হো হো করে হেসে বলল, “দাসবাবু অ্যায়সা হি হ্যয়, বিলকুল খুলা কিতাব য্যায়সা। যব ভি চাহ পড়লো। দেখা না ক্যয়সা ডরকে আপনা কিতাব বন্ধ করা দিয়া। উসকো বলো কিতাব অ্যায়সা খুলা রাখনা সহি নহি হ্যায়। আপ বোল দিয়া, অব সে কহি দাসবাবু কো তং নহি করেগা।”


এদিকের পর্ব মোটামুটি সমাধান করতে পেরেছি এমন একটা আত্মতুষ্টি নিয়ে কলকাতায় ফিরে অন্য কাজে ডুবে গেছিলাম। হঠাৎ মাসখানেক পর খবর এলো সামশেরের বড় ছেলে মার্ডার হয়ে গেছে। আর তার বদলা হিসেবে অঞ্জনি সিং ও আওসি-র ইআইসি-রও লাশ পড়ে গেছে। বুঝলাম সামশেরদের কিতাবও একদম খোলা। লাশ কা বদলা লাশ।


তড়িঘড়ি দাসবাবুকে ফোনে ধরলাম, “আপনি ঠিক আছেন তো?”

দাসবাবু ক্লিষ্ট হেসে বললেন, “হো সকতা হ্যয় ম্যয় খুলা কিতাব হু, লেকেন কিতাব কা কিড়া কো কভি মওত নহি হোতা।”


Story Khonjporibar sharod sonkhya


যে জানে সেই জানে

সৌমী আচার্য্য


রিবৎ করে ভাত মেখে খাবার জন্য নাদুস নুদুস শশীবালার খুব বেশী কিছু চাইনা, একটা ঝাল লঙ্কা কেবল তার দাবী। হরেনদা খুঁজেপেতে লঙ্কাটুকু আনেই। আলুর গোডাউনে নাইট ডিউটি সেরে ভোরে সাইকেল নিয়ে ফেরার পথে বাজার মুখো সব্জিওয়ালাদের থেকেই কিনে নেয় বেছে বেছে। আমার সাথে ওর আলাপ ওই কুয়াশামাখা পথের ধারেই। আজ একটু আগে এসে দাঁড়িয়েছি কদমতলার মোড়ে। দূর থেকে কুয়াশা ভেদ করে টুংটুং করে হরেনদা এসে দাঁড়ায়। ওর মুখে ঘরে ফেরার তৃপ্তি।


-কি খবর মেমদিদি!

-তুমি যে কেন আমায় মেম বলো হরেনদা?

-বোঝো এমন ডুগডুগে চেয়ারা আর মেম কবো না?

-ধুর হাতির মতো মোটা দেখতে পাওনা? সব সময় শুনি। আমায় নিয়ে ব‍্যঙ্গ করে সবাই। এতও মোটা হয়ে বেঁচে কেনো আছি তাই বুঝিনা। তাইতো সকাল সকাল পাঁচ কিলোমিটার হাঁটি আর তোমার বেছে দেওয়া সব্জি সেদ্ধ খাই।

-ও মেম দিদি তুমি মুটা কিডা কয়? আমার শশীবালারে দেকলি বুঝতা, তুমার তো সোন্দর চেয়ারা। হাঢড়গিলে হলি মোটে ভালো দেখায় না। ন‍্যাও ঐ যে ঝকু আসতিছে কী কী নুবা কও বেছেবুছে কিনিয়েদি।

-তুমি আবার সময় নষ্ট করবে কেন? সারারাত ডিউটি করেছো, তোমার যা লাগবে নিয়ে বাড়ি যাও। শশীবালা বউদি চিন্তা করবে। খুব বকবে বাড়ি গেলে।


কেমন যেন উদাস হয় হরেনদা, ঝকুর বস্তা খুলতে সাহায‍্য করতে করতে বলে, “সে কি আর মোর কপাল যে ওয় বকবো! তবে চোখের দিশটিতে ভস্ম করে। তুমারে সব্জি দিই বেছে হেইডা হ্যায় পছন্দ করে। তাছাড়া সময় তো নষ্ট হয়না মেমদিদি, তুমার মন যদি ভরাট হয় তালিই সময় ফসলা। এই যে তুমি নিজেরে মুটা কও তাতি সময় নষ্ট হয় আর ওই যখন তুমি শশীবালার কথা শোনার জন‍্যি, ভুলি কুকুরের মুখে বিসকুট তুলি দেবার জন‍্যি হাঁকুপাকু করো তখন সময় ফসলা হয়।”


আমার ব‍্যাগ ভরে ওঠে টাটকা তাজা সব্জিতে। মন দুই কামরার ফ্ল্যাটের উজ্জ্বল মানুষটার কাছে দৌড়ে যায়। কতদিন যে সে আমায় মুখ তুলে দেখে না! প্রতিদিন হাঁটার আগে বলে আসি, হুম্ টুকু ছাড়া আর কিছু বলার কষ্ট করেনা সে। আসলে রোগা মোটা এসব কোনো বিষয় নয়, ওর মন এখন অন্য কিছু চায়। যে প্রবল পরিশ্রমী ছেলেটাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, সে এখন কেবল শেয়ার মার্কেটের দরদাম নিয়ে মুখ গুঁজে থাকে। আমার নদীতে ডুব দিতে আসে কখনও কখনও। দিন পনেরো আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদেছিলাম। মুখটা বিকৃত করে বলেছিল, “ন্যাকামো করো না। আমরা এখন আর খোকাখুকু নই যে হাতে হাত দিয়ে পেরেম করব।” আমি চিরকাল বোকাই থেকে গেলাম। হরেন কাকাকে দেখি আর নানা ভাবে চেষ্টা করি জানতে রত্নদীপ আমার পছন্দ কিছু মনে রাখতে পেরেছে কিনা। যদিও প্রতিবার হতাশ হই। তিতিরের জন্মদিনে লাল শাড়ি পরে মাথায় যূঁই লাগিয়ে বললাম, “কেমন লাগছে?”

-তোমাকে একদম তোমার মতোই লাগছে।

কথাটা বলে খুব জোরে হাসল। আমার হাসি পেলনা। তিতির আমার মেজদির মেয়ে, ওর জন্মদিনে খেতে বসে আমি কিচ্ছু খাচ্ছি না দেখে মেজদি বকা দিতেই রত্নদীপ মুখ খুলল।

-ভয় পেওনা, অন্য সময় ঠিকঠাক খায়, লোক দেখলে ডায়েট করতে ভালোবাসে।


ফেরার পথে আমি কথা বলা শুরু করার আগেই, “এই শোনো তুমি বোঝো না বলে কেউ আড্ডা মারবে না তা হয় না। একটু কম কথা বল তো। আজকাল তোমার কথা...” আমি জানি আমার কথা ওর ভালো লাগে না। এখন মন খারাপ হলেও নিজের মতো থাকি। হরেনদার কথা মতো সময়কে ফসলা করার চেষ্টা করি।


হরেনদা নিজের প্রয়োজনের সামাণ‍্য জিনিস কেনার পর লঙ্কাটুকু কেনার সময় বাসিমুখে লঙ্কা চেবায়। ততক্ষণে দু'তিনজন সব্জিওয়ালার থলে হাঁ হয়ে গেছে সাইকেলের ক‍্যারিয়ারে। পছন্দ হয়না তার, শেষে পরিতৃপ্ত মুখে হুশ্ হাশ করতে করতে বলে, “ওহ্ মেমদিদি শশীবালা বড়ো খুশি হবে গো আজ। যাই বাড়ি যাই।” নিত‍্যদিন হরেনদা একটা ঝড় তোলে লঙ্কার ঝাল নিয়ে। বোবা শশীবালা ঝাল লঙ্কা খেয়েই নাকি হাঁইহুই আওয়াজ করে দীর্ঘক্ষণ। বোবা বউয়ের এটুকু আওয়াজ কে ঘিরে হরেনদার নিত‍্য কল্পনা।


-আরে মেমদিদি লঙ্কা খেয়ে ওর আনন্দ দেখে কেডা, ওই রুগা কাটির মুতো শরীলে নেচে কুঁদে আনন্দে আমারে জড়ায় ধরে, ঠিক য‍্যান পোত্থম রাত।


যে কথা বলেনা তার শব্দ শুনতে কী মরিয়া চেষ্টা হরেনদার। ওর চলে যাওয়াটা শেষ অবধি দেখি। সাইকেলে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে, “মেমদিদি গো মন খারাপ করোনা, তুমি রাস্তাডা খোঁজো তো, বড্ড খাড়ায় আছও। এবার নিজেরে একডু গোঁত্তা দ্যাও না ক্যান!” বাড়ি আসতে আসতে মনে পড়ে শেষ চিঠিটার কথা। এ্যাথলেট কোচ জয়দীপ স্যার লিখেছেন, আমি চাইলে আবার মাঠে যেতে পারি, প্রাকটিস শুরু করতে অনুরোধ করেছেন। আজ আর হাঁটি না। জগিং শুরু করি। অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছি, মাঠে ফিরতে হলে আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। দৌড় শুরু হয়েছে অজান্তে। হয়তো দ্রুত আমিও সময়কে ফসলা করে তুলতে পারব হরেনদা।



Story Khonjporibar sharod sonkhya


বিসর্জন

সুদীপ হাজরা



 ১


প্রা ত্যহিক এই একই অশান্তি সহ্য করতে করতে এগুলোকেই এখন জীবনের রোজনামচা করে নিয়েছে আলো। আজও তার নিস্তার মিলবে না এই অত্যাচারের কবল থেকে। চতুর্দশী মেয়েটি কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে এসে উঠোন লাগোয়া রান্নাঘরের সামনে দাঁড়ায়। সামনে দণ্ডায়মান মানুষটি বাঘিনীর দৃষ্টি দিয়ে মেপে নিচ্ছে তাকে। হাতের উপর শুকিয়ে যাওয়া কালশিটে দাগটা এখনও দেদীপ্যমান, সেদিকে চোখ পড়তেই শরীরটা সামান্য কেঁপে ওঠে আলোর।


“ভাইটা আজ না খেয়ে ইস্কুল চলে গেল। এমনকি টিফিনটুকুও নিয়ে যায়নি। এবার তুই আমাকে বল যে, এ'রকমটা কেন হলো?” মহিলার ধীর-স্থির কণ্ঠস্বরের মধ্যে অন্তর্নিহিত ভাষাটাই আলোকে জানান দেয়, খানিক পরে ঠিক কী ঘটতে চলেছে। এ যেন শিকারের আগে দু'পা পিছিয়ে এসে বাঘিনীর ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্ত! আলোর মুখে কোনও সাড়াশব্দ নেই। ওর অস্থির চাহনিটা মহিলার হাতে থাকা বাঁশের কঞ্চিটার দিকে নিবদ্ধ। একটু পরেই যে সেটার কয়েকটা আঘাত ওর উপর নেমে আসবে, এটা ভেবেই প্রতি মুহূর্তে শিউরে উঠছে আলো। উত্তেজিত কণ্ঠে মহিলা ফের প্রশ্ন করেন, “আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি, আলো। এ'রকমটা হওয়ার কারণ কী? বলবি, না কি...” হাতের বস্তুটাকে উঁচিয়ে ধরলেন তিনি।


ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে আসে আলো। “আসলে মামি, আজ আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। তাই উঠতে একটু...”

“শরীর খারাপ, হ্যাঁ! শরীর খারাপ লাগছে তোর?” আলোর সামনে এগিয়ে যেতে যেতে মহিলা বলে চলেন, “প্রতিদিন এই একই নাটক ফেঁদে পার পেয়ে যাবি ভেবেছিস? দাঁড়া, আজ তোর মজা দেখাচ্ছি!” গর্জে উঠলেন তিনি। আর পরক্ষণেই... “মুখপুড়ি! বদমাইশ মেয়ে! এই কারণে তোকে এতদিন ধরে পুষছি! আমারই খাবি আবার আমার ছেলেকেই উপোস করিয়ে মারবি! ভেবেছিস কিচ্ছুটি বুঝি না, ঘাসে মুখ দিয়ে চলি আমি! আজ তোকে মেরেই ফেলব...”


আলোর মুখে কোনও টুঁ-শব্দটিও নেই। প্রতিদিনের এই মারগুলো আঘাত হানতে হানতে ওর শরীর থেকে  ব্যথাটাকেই যেন কেড়ে নিয়েছে। আর তাছাড়া শব্দ করেই বা লাভ কী! নির্বাক প্রতিবেশীরা তো আসবে শুধুমাত্র দৃশ্য দেখতে, তাড়িয়ে তাড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করে আবার যে যার মতো ফিরে যাবে। আলো এইসব অনেকদিন আগেই বুঝে গেছে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে মামির মারের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর মতো কেউ নেই। আলোর সজল চোখদুটো কী যেন একটা ভেবে চলে। দাদান যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ওর গায়ে হাত দেওয়ার সাধ্য কারুর ছিল না। আর তিনি চলে যাওয়ার পরপরই ওর এই দূরাবস্থা! ওর কেবলই মনে হয়, আজ যদি মা বেঁচে থাকত তাহলেও কি এমনই পরিণতি হতো ওর? আলোর চোখ বেয়ে কান্না গড়িয়ে পড়ে। ওদিকে ক্লান্ত হয়ে কঞ্চিটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন মামি। বোবা পাথরে আর কতক্ষণই বা কেউ লাঠি পিটতে পারে! ক্রুদ্ধস্বরে তিনি বলে চলেন, “হ্যাঁ রে, এত মানুষ মরে আর তোর মরণ হয় না? বলি আর কদ্দিন বুড়ো মামাটার ঘাড়ে বসে রক্ত চুষে খাবি? অলক্ষুনে মেয়ে একটা! তোকে তো কোনওদিন বিয়ে দিয়ে বিদায় করতেও পারব না আমরা। যে তোর মুখের দিকে তাকাবে সে-ই অক্কা পাবে। হুহ্, কালো মেয়ের নাম নাকি আলো!”

“এমন করে বোলো না গো মামি। আমার খুব কষ্ট হয়। তোমরা আশ্রয় না দিলে আমি কোথায় যাই বলো তো?”

“যেখানে খুশি যা। জাহান্নমে যা গিয়ে! তবে আমাদের ঘাড় থেকে নেমে এবার একটু রেহাই দে আমাদের। তুই হলি আমাদের জীবনের কাঁটা। তাই যতদিন তুই আমাদের জীবনে থাকবি, ততদিন আমরা শান্তিতে বাঁচতে পারব না।”

আলোর মুখ বাক্যহারা, ঠোঁটদুটো অসাড় হয়ে গেছে। ওর ভাবলেশহীন দৃষ্টিটা আবার কী যেন ভাবতে থাকে। এই কারণেই বুঝি চার বছর বয়সে দাদান তাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল! সেই থেকে এতটা বড় করে তুলেছে শুধু কি এই দিনগুলো দেখানোর জন্যই? এর চেয়ে তো ঢের ভালো ছিল, মায়ের সাথেই সেদিন যদি তাকে দাহ করে দিত। অন্তত জীবনের প্রতিটা বাঁকে বাঁকে অপেক্ষমান এই পীড়াগুলো তো ভোগ করতে হতো না তাকে!


মামির কর্কশ স্বর আলোর ভাবনায় ছেদ ফেলে। “অনেক নাটক দেখিয়েছিস মুখপুড়ি। ওদিকে রান্নাঘরে অনেক কাজ পড়ে আছে। আর সময়ের কাজ যদি সময়মতো না হয়েছে তবে... পরশুদিনের কথাটা আশাকরি ভুলিসনি এখনও!”


একটা বিপদ সংকেতের প্রাবরণ টেনে চলে গেলেন মামি। অসুস্থ শরীরেও নিজেকে একপ্রকার জোর করেই রান্নাঘরের দিকে টেনে নিয়ে যায় আলো। একটু এদিক থেকে ওদিক হওয়ার পরিণাম সে বিলক্ষণ জানে!


 


আজ থেকে থেকেই হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ছে আলোর। প্রতি রাতেই মা ওর চুলে বিলি কেটে দিত, গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত। ওর এখনও আবছা আবছা মনে পড়ে, মা বলে চলেছে, “তারপর? তারপর রাজকুমার ইয়া বড় একটা তলোয়ার দিয়ে শয়তান রাক্ষসীকে মেরে ফেলল আর রাজকুমারীকে নিয়ে পক্ষীরাজে চড়ে প্রাসাদে ফিরে এলো। এরপর একটা শুভদিনে রাজকুমারের সঙ্গে রাজকুমারীর বিয়ে হয়ে গেল।” মা চলে যাওয়ার পর ওর জীবনটাই যেন ফিকে হয়ে গেছে। রঙিন মুহূর্তরা ওর চারপাশকে ঘিরে থাকে, অথচ ওকে স্পর্শ করার আগেই সব রঙ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এই পরশু যেমন দুপুরে মধুমিতা, মীনাক্ষী আর পায়েল -তিনজনে মিলে ওদের বাড়ির উঠোনে এক্কা দোক্কা খেলছিল। আলোও গিয়ে যোগ দিল তাদের সঙ্গে। হঠাৎই সকলের চেঁচামেচিতে কখন যেন মামির ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমচোখদুটো রগড়াতে রগড়াতে প্রবল চিৎকার করে বেরিয়ে আসেন তিনি। বাকিরা তাঁকে দেখে দৌড়ে পালিয়ে যায়। তখন সব রোষ গিয়ে পড়ে বেচারি আলোর উপরে। এমনিতেই তাঁর বিচারে আজ রান্নায় ত্রুটি হওয়ায় মনঃক্ষুন্ন ছিলেন তিনি আর এখন ওর জন্যই কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়া... মামি ওর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেলেন ওকে। তারপর একটা দেওয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে সজোরে ওর মাথাটাকে ধরে ঠুকতে লাগলেন। আলোর কপাল কেটে রক্ত বেরিয়ে আসে। পাশ থেকে এমন অমানুষিক দৃশ্য দেখেও নির্বিকার মুখে তাকিয়েছিলেন মামা, আর ভাই তো মামিকে আরও মারার মদত জুগিয়ে যাচ্ছিল। আসলে এই পৃথিবীতে আলো সম্পূর্ণ একা, বেচারির কথা চিন্তা করার কেউ নেই। নাহলে কি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাইয়ের খাবার তৈরি করে দেওয়া থেকে শুরু করে সময়মতো সমস্ত রান্না করা, কুয়ো থেকে জল তোলা, ঘর মোছা, জমিতে গিয়ে মামার খাবার পৌঁছে দিয়ে আসা, তিনবেলার এঁটো বাসন ধুয়ে রাখা -রুটিনমাফিক সবকিছু করার পরেও বেধড়ক মার জোটে ওর কপালে! আর তার মধ্যে কোনওদিন একটা কিছুর অন্যথা হলে তো আর রক্ষা নেই! ভীত, ব্যথিত কিশোরী মেয়েটার অবসর বলতে এই রাত্রিটুকু। অন্ধকার বড্ড ভালো লাগে আলোর। কারণ একমাত্র অন্ধকারেই চিন্তা আসে, আর এই চিন্তাদের ডানায় ভর করে মাও আসে ওর মনে, সুন্দর স্বপ্ন আসে আর... না, রাজকুমার ওর স্বপ্নে আসেনি কোনওদিন। ওর স্বপ্নে অন্যকিছু আসে।




চরাচরের নিয়মমাফিক ব্যস্ত স্রোতে প্রতিদিনই অন্ধকার গহ্বরে ঘুমিয়ে পড়ে নিশ্চুপ রাত্রিগুলো। অথচ আলোর চোখে ঘুম নেই। ওর বিনিদ্র চোখদুটো কী যেন খুঁজে চলেছে অতলান্তিক অন্ধকারের মধ্যে। আলো নিজেও জানে, এই নির্জন রাতগুলোই তার জীবনের উজ্জ্বল দীপশিখা, পরদিন সকাল হতেই সব আলো নিভে গিয়ে আবার অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে। কাল কী হবে না হবে, সে'সব ও জানে না। কিন্তু আজ অযথা ঘুমিয়ে জীবন থেকে একটা সুখের রাতকে নষ্ট হতে দিতে চায় না আলো। গতকালের মতো আজও হয়তো কেউ অপেক্ষা করে বসে আছে তার জন্য। কাল ও সাহস করে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। কিন্তু আজ দেখা হলে নিশ্চয়ই আলাপ করবে ও। আলোর মতো নিঃসঙ্গ একটি মেয়ে এর চেয়ে বেশি আর কী চায়! এমন একজন বন্ধু, যার স্রোতে নিজের সমস্ত একাকীত্বের অন্ধকারকে বিসর্জন দিয়ে একটুখানি স্বস্তির বাতাস উপভোগ করা যায়। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে আলো। ওদের বাড়ি থেকে ঘাটলাটা বেশি দূর নয়। মেয়েটিকে কাল ঘাটলায় একটা সিঁড়ির উপর বসে থাকতে দেখেছে আলো। আজ সে আদৌ আর আসবে কি না, তা আলো জানে না। তবুও একরাশ কৌতূহলকে মনের অন্দরে সঙ্গী করে এগিয়ে যেতে থাকে ও। মিনিট তিনেক হাঁটার পর সেখানে পৌঁছে কিঞ্চিৎ অবাক হলো আলো। গতকালের ন্যায় আজও মেয়েটি একইভাবে অদূরের সিঁড়িটার উপর বসে আছে। আলো এগিয়ে যায় তার দিকে। কাছে গিয়ে পিছন থেকে মৃদু স্বরে ডেকে ওঠে, “এ কী! কে তুমি? এত রাতে এখানে বসে কী করছ?”

মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে আলোর দিকে ফেরে। “তার উত্তর তোমায় কেন দিতে যাব বাপু? আর তুমি কে? নিজেই বা এত রাতে কী করতে এসেছ এখানে?”


আলোর আশান্বিত মুখটা কী রকম যেন নিরাশ হয়ে উঠল। সামনের মানুষটির থেকে এই ধরনের প্রত্যুত্তর বোধহয় আশা করেনি ও। কিন্তু মেয়েটার গলার স্বর অনেকটা ওরই মতো, উচ্চতাও প্রায় এক, শুধু মুখটাই অন্ধকারের প্রাবল্যে ঠিক করে দেখা যাচ্ছে না। বোধহয় ওর সমবয়সীই হবে। আলোর নরম কণ্ঠস্বর বলে ওঠে, “আমার নাম আলো। আর তুমি?”

“বোসো।” মেয়েটি মাঝখান থেকে একটু পাশে সরে আলোকে বসার জায়গা করে দিল। তারপর নিজেও বসল। “আমি ছায়া। অন্ধকার ছায়াও বলতে পারো আমায়।”

শেষ কথাটার মানে আলো বুঝতে পারে না। পূর্ব প্রসঙ্গেই ও জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা ছায়া, তুমি এত রাতে এখানে কী করছ?”

মেয়েটিকে নিরুত্তর দেখে আলো সামান্য বিরক্ত হলো। কিছুক্ষণ পর ছায়া পুকুরের সচল জলের দিকে আঙুল নির্দেশ করল। বলল, “ওই যে... দেখতে পাচ্ছ?”

“কী?”

“ভালো করে দ্যাখো।”

মেয়েটি যে ঠিক কী বোঝাতে চাইছে, তা বোধগম্য হয় না আলোর। ওর চোখে কেবল পুকুরের কালো জলরাশিটাই ধরা পড়েছে।

“কি, দেখতে পেলে না তো?”

“না, মানে... আমি তো কিছুই...”

আলোকে আমতা আমতা করতে দেখে ছায়া বলে ওঠে, “আরে, তুমি আলো হয়ে আলোকে দেখতে পাচ্ছ না? পুকুরের ওই মাঝখানটায় তাকাও, দ্যাখো একটা তারার ছবি ফুটে উঠেছে।”

“হ্যাঁ, কিন্তু...”

ছায়ার নির্দেশিত দিকটায় তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখতে পায় আলো। তারপর ওর চোখ চলে যায় আকাশের দিকে। আকাশের মাঝ বরাবর একটা তারা ভীষণ উজ্জ্বল। চাঁদ না থাকার কারণে সেটার দীপ্তি যেন ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র আকাশটাতে। পুকুরের জলে সেটারই ভাস্বর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।

“কি, দেখলে তো এবার?”

উপর-নিচে ঘাড় নাড়ে আলো। ওর কৌতূহলী দৃষ্টিটা জলের দিকে তাকিয়ে অবিরাম ভেবে চলেছে যে, এই সাধারণ একটা জিনিস দেখানোর মধ্যে এমন কী ব্যাপার আছে।


ছায়া আবার বলে ওঠে, “জানো আলো, এই পুকুরপাড়টা আমার ভীষণ প্রিয়। এই সিঁড়িটার উপর ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে। তাই তো সেই ভালোলাগা মেটাতেই রোজ রাতে ছুটে আসি এখানে। দিনের বেলা তো আর আসতে পারি না!”

“কেন? দিনে আসতে পারো না কেন?”

“আসলে আমার মা আমায় কোথাও বেরোতে দেয় না। সারাদিন নানা রকম কাজ দিয়ে ঘরের মধ্যে আটকে রাখে। বাইরে বেরোতে দেখলেই খুব মারে। তাই তো দিনের আলোয় আমি আসতে পারি না, আলো। রাত হলে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন আমি চুপিসারে চলে আসি এখানে, আর জলের দিকে তাকিয়ে থাকি। এই রাতটাই আমার কাছে দিনের আলোর মতন!”

ছায়ার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে ওঠে আলো। তার জীবনের সঙ্গে এই মেয়েটির জীবনের এত মিল! বিষয়টা ভাবায় তাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “কিন্তু তোমার মা এমন করেন কেন?”


মেয়েটি আবারও কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকার পর বলে, “আসলে আমি হলাম আমার মায়ের সৎ-মেয়ে। আমার জন্মদাত্রী মা কবেই আকাশের তারা হয়ে গেছে। এই মা আমাকে সংসারের আগাছা মনে করে। তাই আমায় খুব মারে, খুব অবহেলা করে। জানো আলো, প্রতিদিন আমি কেবল অপেক্ষা করে থাকি, কখন রাত হবে আর কখন আমি এখানে চলে আসতে পারব।”


আলোর মনটা কেমন যেন দুঃখের কান্নায় ভিজে ওঠে। ওর জীবনটাও যে ছায়ারই মতো, একইরকম। সারাদিন শুধু মার, বকা, অবহেলা, শাসনের বেড়াজাল, আরও কত কী! “তোমার দুঃখটা আমি বুঝতে পারছি, ছায়া। মা হলো আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ঢালের মতো। আর যখন সেই ঢাল সরে যায় তখন জীবনটাই যেন তোলপাড় হয়ে যায়। আমারও মা নেই। এখানে আমি মামা, মামির আশ্রয়ে থাকি। সারাদিন শুধু অপমান আর লাঞ্ছনাই জোটে এই পোড়া কপালে। জানো ছায়া, আমার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে একটা মস্ত চাকরি করার। কিন্তু মামি আমাকে বইখাতার মুখটাই দেখতে দিল না আজ অবধি। আমি যখন আমার আশেপাশের সকলকে ইস্কুলে যেতে দেখি, তখন আমারও ভীষণ ইচ্ছে করে ওদের মধ্যে নিজেকে দেখতে। কিন্তু কিছুতেই এই পোড়া মুখ খুঁজে পাই না সকলের ভিড়ে। আমার বয়সী ছেলেমেয়েরা যখন মাঠে-ঘাটে খেলে বেড়ায় তখন আমি বাসন মাজি, কিংবা রান্না করি, আর না হয় মামির হাতের মার খাই। কিন্তু আজ যদি মা আমার সাথে থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই আমার জীবনটা এ'রকম ছন্নছাড়া হয়ে যেত না। তোমার মতো আমার জীবনেও ছুটি বলতে এই রাতটুকু। সারাদিনের সমস্ত দুঃখ, কষ্টকে বুক থেকে বার করে একটু যেন শান্তি খুঁজে পাই এই অন্ধকারে।”


আলো আপন খেয়ালে বলে চলেছে কথাগুলো। ওদিকে ছায়া নীরব, নিশ্চুপ হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে পুকুরের দিকে। তার ঠোঁটের এককোণে সামান্য একটু প্রশান্তির হাসি ফুটেছে। আলো তার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, “ছায়া? এত মন দিয়ে কী দেখছ?”

“মাকে দেখছি।” নির্বিকার উত্তর করে সে। আলোর কিছু বোধগম্য হয় না। জলের দিকে পুনরায় আঙুলের ইশারা করে ছায়া বলে চলে, “ওই যে দ্যাখো আলো, জলের মধ্যে যে তারাটিকে খুব সুন্দরভাবে বোঝা যাচ্ছে, ওই তারাটিই হলো আমার মা।”


কিছুক্ষণ আগের সেই উজ্জ্বল তারাটাকে নির্দেশ করে ছায়া। আলোও কিছুক্ষণ স্থিরচোখে তাকিয়ে থাকে জলের দিকে। পুকুরের সচল স্বচ্ছ জলের মধ্যে কিছু একটাকে যেন খুব গভীরভাবে খুঁজে চলে সে।



“অ্যাই হতচ্ছাড়ি মেয়ে! ওঠ বলছি... এখনও পড়ে পড়ে মরার মতো ঘুমোনো হচ্ছে! ওঠ...”

মুখের উপর হঠাৎই জলের ছিটে পড়াতে চোখ খুলে তাকায় আলো। ভোর হয়ে গেছে। পাখিদের কলকাকলিতে চারিদিক মুখরিত। বাতাসে একটা স্নিগ্ধ শীতল মেদুরতা বিরাজমান। মামির মুখের দিকে চোখ পড়তেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসে আলো। ওর চোখদুটো অনবরত মামির হাতের দিকে তাকিয়ে কিছু একটাকে খুঁজে চলে। আবারও কর্কশ স্বর ভেসে আসে, “নবাবনন্দিনী আমার! উনি পড়ে পড়ে ঘুমোবেন আর সাততাড়াতাড়ি উঠে ওঁর সব কাজ আমি সেরে রাখব যেন! আজ যে ছোট ভাইটার জন্মদিন, সে খেয়াল আছে মুখপুড়ির! শোন আলো, আজ আমি এই শুভদিনে কোনও অশান্তি চাইছি না। তার মানে এটা যেন ভেবে বসবি না যে, মামি তোর সমস্ত অন্যায়কে ক্ষমা করে দেবে। যা, এক্ষুণি একবার ঘোষদের বাড়িতে যা, গিয়ে দেড় কেজি দুধ নিয়ে আয়। আর হ্যাঁ, গিয়ে আবার জনমের মতো সেঁটে থাকবি না ওখানে। এদিকে কিন্তু অঢেল কাজ পড়ে আছে।” কথাকটাকে আলোর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন মহিলা। আলোর সরল কৌতূহলী মনটা এখনও ভাবনায় বিভোর হয়ে রয়েছে গত রাতের মায়ায়। ও এখন সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হয়ে গেছে, এই স্বপ্নটা শুধুমাত্র কাল রাতেই নয়, প্রতি রাতেই আসে। শুধু সকাল হলেই সবকিছু কেমন যেন তালেগোলে একাকার হয়ে যায়। স্বপ্নটা যেন ওর প্রতি রাতের বন্ধু। কিন্তু ছায়া আসলে কে, তার বাড়ি কোথায়, সে কী করে না করে -এইসব আলো জানে না। জানার আগ্রহও প্রকাশ করে না। ও শুধু জানে, ‘ছায়া’ মেয়েটি ওরই মতো, ওর একাকীত্বের বন্ধু, যার সঙ্গে সাত-পাঁচ না চিন্তা করে আপন খেয়ালে কথা বলা যায়, মনের দুঃখগুলো ভাগ করে নেওয়া যায় নির্দ্বিধায়। বাস্তব জগৎকে পিছনে ফেলে কবে যে স্বপ্নজগতের মায়াভূমিতে নিজের একটা বসত তৈরি করে নিয়েছে, তা আলোর মনে পড়ে না। শুধু স্বপ্নের শেষটুকুই ওর কোনওদিন দেখা হয়ে ওঠেনি। তার আগেই কোনও না কোনও ভাবে ঘুমটা ভেঙে যায়। আর ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরটাও যেন বড্ড ক্লান্ত লাগে। আজও সারা শরীরে অদ্ভুত একটা ব্যথা অনুভব করতে পারছে আলো। হঠাৎই মামির নির্দেশবাণী মনে পড়াতে তাড়াতাড়ি মেঝে থেকে বিছানা গুছিয়ে কলঘরের দিকে এগিয়ে যায় ও। তারপর চোখেমুখে জল দিয়ে দুধের ক্যানটা নিয়ে ঘোষদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। যেতে যেতে ওর অস্থির চোখদুটো এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করে যেন খুঁজতে থাকে কিছু একটা। কিন্তু না, তাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছে না আলো।




আজ বোধহয় আর ঘুম আসবে না আলোর। ওর মায়াময় চোখদুটো নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘরভরতি প্রগাঢ় অন্ধকারে। চোখের কোণ বেয়ে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে নামছে বালিশের কোলে। আজ সকালে দুধ নিয়ে ফেরার সময় আচমকাই একটা উঁচু পাথরে হোঁচট খেয়ে ওর সাথে সাথে দুধের ক্যানটাও মাটিতে পড়ে যায়। সমস্ত দুধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কী ঘটতে চলেছে, আলো সেটা জানতই! কিন্তু আজ প্রথমবার মামাও তার গায়ে হাত তুলেছে। স্থূল, মাংসল হাতের আঘাতে ঠোঁটের একটা পাশ সামান্য ছড়ে গেছে তার। তবে শরীরের চেয়েও বেশি আঘাত আছড়ে পড়েছে আলোর মনে। তাছাড়া মামা-মামির আলোচিত শেষ কয়েকটা কথাও কানে এসেছে তার।


“আর না, আর আমি এসব সহ্য করব না! ওই আপদকে এক্ষুণি তুমি বিদায় করো বলে দিলাম। ও আমাদের সংসারে শনি হয়ে এসেছে।”

মামা একটু অসন্তুষ্ট হয়েই বলেন, “আরে, এভাবে বিদায় করো বললেই তো আর করা যায় না। কোথায় বিদায় করব ওকে?”

“কেন? ওর মাতাল বাপটা তো এখনও বেঁচে আছে। ওখানেই রেখে এসো মুখপুড়িকে। আমি আমার সংসারে এই ঝামেলাকে আর রাখতে পারব না।”

“কিন্তু...”

“কী কিন্তু? ভাগ্নির প্রতি দরদ দেখি একেবারে উপচে পড়ছে তোমার!”

“না, তা নয়। ওর বাপটাকে তো তুমি জানো। মাতালটা পারে না এমন কোনও কাজ নেই। ওর জন্যই তো আমার বোনটা অকালে চলে গেল। তারপর আমার বাবা আলোকে এ বাড়িতে নিয়ে আসে। কিন্তু এখন ওকে পেলে ওই শালা হয়তো কোনও কসাইয়ের কাছেই বেচে দেবে ওকে।”

মামি এবার একটু চেঁচিয়ে ওঠেন, “তাতে তোমার কী? আমাদের এসব ভেবে কী লাভ? আজ আমি একটা কথা স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, কাল যদি তুমি ওই আপদকে এই বাড়ি থেকে বিদায় না করো তাহলে আমি নিজেই ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যাব এখান থেকে।”


অগত্যা মামার কাছে রাজি হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনও উপায় থাকে না। সন্ধ্যার দিকে উনি একবার আলোর ঘরে এসে কথাখানা জানিয়ে গেছেন ওকে। বেচারি মেয়েটির সেই থেকে দু'চোখ গলে অবিরাম জল পড়ছে। রাতের দিকে ভাই একবার ওকে খাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছিল। কিন্তু আলো জানিয়ে দেয়, খিদে নেই ওর। আর থাকবেই বা কী করে! মামা-মামির হাতে আজ কম তো চড়-থাপ্পড় খায়নি মেয়েটা! তবে আলো এখন এসব কিছুই ভাবছে না। ওর মন পড়ে আছে অন্য কোনও পৃথিবীতে। কিন্তু আজ যে কিছুতেই ওর ঘুম আসবে না, আর ঘুম না এলে সে-ও তো আসতে পারবে না। কাল সকাল হতেই ও এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। তারপর অচেনা নতুন জায়গায় সে যদি আর না আসে? যাবার আগে যদি একটিবার দেখা হতো তার সাথে... আলোর মনে বিচিত্র সব ভাবনা একত্রিত হয়ে মায়াজালের বিস্তার ঘটিয়েছে। ধীরে ধীরে ব্যথাহত শরীরটাকে চাগিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় ও। তারপর অতি সন্তর্পণে পিছনের দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে।


পূর্ণিমার সুপ্রভ কিরণ পুকুরের সচল জলরাশির উপর পড়ে যেন কাটাকুটি খেলে চলেছে। ঘাটলাটি একেবারে নিস্তব্ধ। আলো সেখানে পৌঁছে কাউকেই দেখতে পেল না। অগত্যা ও নিজেই গিয়ে বসল ঘাটলার একটা সিঁড়িতে। পুকুরের জলে কিলবিল করে স্রোত খেলে বেড়াচ্ছে। জলের উপরিভাগ চাঁদের আলোয় আংশিক আলোকিত। জল ছুঁয়ে উঠে আসা ফুরফুরে বাতাসটা ওর চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। হঠাৎই পিঠের উপর একটা ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করে সেদিকে ফিরে তাকায় আলো। ছায়া এসেছে! আনন্দে উঠে দাঁড়ায় ও। চাঁদের আলোতে আজ ছায়ার মুখাবয়ব স্পষ্ট! বিস্মিত চোখে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আলো জিজ্ঞেস করে, “এ কী! কে তুমি?”

“তোমার বন্ধু, ছায়া।” সামনে থেকে নরম স্বর ভেসে আসে।

“কিন্তু তোমাকে যে হুবহু আমার মতোই দেখতে!”

ছায়া এবার হেসে ওঠে। তারপর হাসি থামিয়ে বলে, “কারণ আমি যে তুমিই, আলো। আর তোমার মধ্যেই আমার বাস।”

“মানে?” সরল আলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

সে বলে চলে, “তোমার মনের অন্তর্নিহিত দুঃখ, কষ্ট, একাকীত্ব, ভাবনা, ভালোবাসা মিলিত হয়ে আমায় সৃষ্টি করেছে আলো। আমি হলাম তোমার মনের সেই পৃথিবী যেখানে তুমি তোমারই বয়সী অন্য এক আলোকে নিজের বন্ধু হিসেবে পাশে পাওয়ার আশা রাখো। আমি আর অন্য কেউ নই; তোমার মধ্যে বসবাস করা তোমারই অন্তরাত্মা। আলোর মধ্যে যেমন ছায়া অবস্থান করে, আমিও তোমার ভিতরে সেই অস্তিত্বকেই বহন করে চলেছি।”


আলোর এসব কিছুই বোধগম্য হয় না। একটা স্বপ্নের মায়াকে বুকে আঁকড়ে ও কেবল চিন্তাই করে চলে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পিছনে ফেলে কখন যে ও বাস্তবের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, কিশোরী মেয়েটার কাছে তা হিসেবাতীত।


ধপ করে সিঁড়িটার উপর বসে পড়ল আলো। অন্তরাত্মা এসে বসল ওর পাশে। ডানহাতের তর্জনী উঁচিয়ে সে ইশারা করে জলের দিকে। আলো ঘুরে তাকাল সেইদিকে। দেখল, পুকুরের শান্ত জলরাশি ক্রমশ যেন উত্তাল হয়ে উঠছে। মাঝ বরাবর চোখ যেতেই ও দেখে, সমস্ত জলরাশি মিলিত হয়ে কিছু একটা যেন তৈরি করে চলেছে। চাঁদের জ্যোৎস্নায় ধীরে ধীরে সপ্রতিভ হয়ে উঠতে থাকে সেটা। একটা মুখাবয়ব। এই মুখটা আলোর চেনা, ওর মায়ের মুখ। দু'চোখ বেয়ে কান্না নেমে আসে ওর। স্বপ্ন আর বাস্তব কখন যেন ওর দুনিয়ায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে! ওর মতো দেখতে মেয়েটিকেও নিজের পাশে দেখতে পায় না আর। আলো এবার উঠে দাঁড়ায়। একসিঁড়ি দুইসিঁড়ি করে এগিয়ে যেতে থাকে জলের উপর ফুটে ওঠা মুখটাকে ছুঁতে।


ভোর হতেই বহু মানুষজনের একটা ভিড় জমে গেছে পুকুরপাড়টি ঘিরে। পুকুরের জলটা আজ আর সচল নেই, বরং শান্ত স্থির হয়ে গেছে। জলের মধ্যিখানে ভেসে থাকা লাশটার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে সকলে। লাশটাকে দেখে সকলের এমন মনে হচ্ছে, যেন কিছুক্ষণ আগে কোনও দেবী প্রতিমার সদ্যই বিসর্জন হয়েছে সেখানে।





Thriller story Khonjporibar sharod sonkhya


ছায়া

পল্লবী সরকার 




সৌ গত একদৃষ্টে পর্দাটার দিকে তাকিয়ে শুয়েছিল। সাদা মখমলের রেশমের পর্দা। হালকা হাওয়ায় মৃদুমন্দ দুলছে। কত শান্ত এখন পর্দাটা। কোনো দাগ নেই, কোনো অস্পষ্টতা নেই। স্থির, প্রায় স্বচ্ছ পর্দা। এই পর্দা দেখে কেউ কি বলবে, সময় অসময়ে এটা কতটা অশান্ত হয়ে ওঠে? 


ঘড়িতে এখন বাজে রাত এগারোটা। রাতের খাবার এখনো খায়নি সৌগত। অনেকক্ষণ আগেই রান্নার লোক নীলিমা রান্না করে দিয়ে চলে গেছে। গিয়ে খেয়ে নিলেই হয়। অযথা রাত করার কোনো মানেই হয় না। পর্দার দিক থেকে চোখ সরিয়ে উঠে পড়ল সৌগত। ঘরের হলুদ জোরালো আলোটা জ্বালিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দুটো পাত্র চাপা দিয়ে রাখা আছে, আর একটা ক্যাসারোল। রাত্রে রুটি খাওয়া অভ্যাস সৌগতর। তাই নীলিমা তার পছন্দমত রুটি বানিয়ে রেখে যায় সন্ধ্যেবেলা। দেরি না করে খেতে বসে গেল চুপচাপ। রুটি, আলুরদম। আজ সকালে মাছ খায়নি সে। নীলিমা ওটাও গরম করে রেখে গেছে। মনটা ঘোরানোর জন্য টিভি খুলল। কাজও দিল। মন ঘুরল। পুরনো দিনের একটা ভূতের সিনেমা চলছে একটা হিন্দি চ্যানেলে। বড় প্রিয় সিনেমা এটা ওর। কয়েক মিনিট লাগল মজে যেতে। তারপরেই মন ঘুরে গেল একদম অন্যদিকে। ভূতের সিনেমা এমনিই খুব ভালোবাসে সৌগত। ভৌতিক জগৎটা এমনিই ওর কাছে বড় প্রিয়। তাই আরোই গোগ্রাসে গেলে এইসব সিনেমা। সত্যিই কি ভূত বলে কিছু হয়? এই প্রশ্নটা অল্পবিস্তর সবার মনের মধ্যেই আছে,তা কে না জানে? কেউ কেউ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। সৌগত একটা সময় খুব চর্চা করত এসব নিয়ে। কিন্তু সেটা খুব বেশিদিন টানতে পারেনি। কলেজে থাকতে যতটুকু সময় দিতে পারত, যতটা পাগলপারা হতে পারতো নিজের শখের পেছনে, চাকরি জীবনে একবার ঢুকে গেলে এই ছোটার ইতি ঘটে যায়। ভূত খোঁজার শখ তখন ভূতের সিনেমায় এসে আবদ্ধ হয়। আর মনে হয় না খাটুনি সয়ে ভূত খুঁজতে যাবে। কিন্তু ভাবনাটা মন থেকে সরাতে পারে না সৌগত। হয়তো তার এই ভাবনা থেকেই সে একদিন এই রহস্য ফাঁস করে ফেলবে। আর রহস্যের কি শেষ আছে জীবনে? 


তার এই একার বাসায় যে একটাও ভূত নেই, সেটা কি নিশ্চিত করে বলতে পারবে সৌগত? পারবে না। ওই যে পর্দায় মাঝে মাঝে উঁকি দেয়, ওটা কি? কার অশরীরী? ওই ছায়ামূর্তিটাকে দেখলেই তো কেমন হৃৎকম্পন শুরু হয়ে যায় ওর! মনে হয় যেন গিলে খেতে আসছে ওকে! ছায়ামূর্তিটা যে সাধারণ নয় বুঝতে পারে ও। না হলে কেনই বা এরকম শরীর খারাপ লাগবে ওর? ছায়ামূর্তিটা এক জায়গায় স্থির থাকে না কখনো। এধার ওধার নড়াচড়া করে। কখনো ধীরগতিতে কখনো বা দ্রুত। কি চায় ছায়াটা? প্রথম প্রথম ঘরে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে তো খেয়াল করল অশরীরীটা ওর সাথে সাথে ঘুরছে! দিনের বেলা ভূত আসে না শুনেছিল, কিন্তু এই অশরীরী তো দিনক্ষণও মানে না! কি দিন, কি রাত, যখন তখন দেখা দেয়! 



নাহ্, কোনোভাবেই অশরীরীটাকে নিরস্ত করা যাচ্ছে না। আজ প্রায় তিন মাস হতে চলল যত্রতত্র তার সঙ্গ নেওয়া কোনোভবেই ছাড়ছে না ছায়ামূর্তি। আজকাল বাইরে বের হতে ভয় লাগে সৌগতর। এই করে কতদিন যে অফিস কামাই হয়েছে তার ঠিক নেই। কিন্তু যে আতঙ্ক তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে, সেটা থেকে ছাড়া পাবে কিভাবে? আজ টানা পাঁচ দিন হতে চলল সে অফিস যায়নি। একনাগাড়ে বসে আছে ঘরের মধ্যে। কেন হচ্ছে এরকম? সূর্যের আলো একদম সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু কেন? তবে কী অশরীরীটা তার শরীর দখল করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে? কি করা উচিত এখন ওর? 


বেলটা আচমকাই বেজে উঠল। রাতের ঘুম উড়ে গেছে। কোনোরকমে টলতে টলতে গিয়ে দরজা খুলল সৌগত। অফিসের কলিগ ঋতম, কাছেই থাকে। এতদিন অফিসে আসছে না দেখে নিশ্চয়ই খোঁজ নিতে এসেছে। ঋতমের সৌগতর অবস্থা দেখে চোখ কপালে উঠে গেল। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে এসে সৌগতকে ধরে নিল। উদ্বেগ মেশানো কন্ঠে বলে উঠল, “এ কি অবস্থা? কি হয়েছে তোর?”

সৌগত কোনোরকমে উত্তর দিল, “কিছুই বুঝতে পারছি না রে!”

“মানে? তোর চেহারা দেখলে তো যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে এখন!”

“ভয় পাবে মানে? তাহলে কি ও আমার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে ক্রমশ?” কাঁপতে লাগল সৌগত। 

“কে কার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে? কি বলছিস এসব?”

সৌগত ঢোঁক গিলে বলল, “কিছু ভালো লাগছে না রে! কেমন যেন ভয় লাগছে! মনে হচ্ছে, এই বুঝি আমাকে গ্রাস করে ফেলবে!”

ঋতম সৌগতকে বেডরুমে এনে বিছানায় বসালো। তারপর খুব শান্তভাবে বলল, “তুই একটু স্থির হ আগে। তারপর আমাকে বল কি হয়েছে।”

সময় নিল সৌগত। তারপর পর্দার দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, “ওখানে থাকে ও। প্রায়ই ওখান থেকে উঁকি মারে।”

ঋতম কপাল কুঁচকে বলল, “কে থাকে ওখানে? উঁকি মারে মানে?”

কোনো উত্তর এল না। সৌগত একদৃষ্টে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। “ওখানে থাকে ও...”

“কি বলছিস আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না! এরকম কথার মানে কি?”

“ও সব সময় আমার সাথে সাথে ঘোরে! আমি না চাইলেও ঘোরে! কিছুতেই ছাড়তে চায় না আমাকে!”

ঋতম সৌগতকে ছেড়ে সাদা রেশমের পর্দাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ভালো করে চেক করল পর্দা সরিয়ে সরিয়ে। সন্দেহজনক এমন কিছুই নেই যা দেখে সৌগতর এরকম অবস্থা হতে পারে। সৌগতর কাছে আবার ফিরে এসে বসল ঋতম। সৌগত এখনো পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে। 


“কিচ্ছু নেই পর্দায়। কেউ নেই ওখানে! তোর মনের ভুল সব!” ঋতম আশ্বাস দিল। 

“না রে আছে! তোকে দেখা দিচ্ছে না!”

“তোর ডাক্তার দেখানো দরকার সৌগত।”

সৌগত ভুরু কুঁচকে তাকাল, “ডাক্তার?”

“হ্যাঁ। সাইকায়াট্রিস্ট। ইমিডিয়েট দরকার।”

সৌগতর কি তাহলে মনের রোগ ধরল? 



ডাক্তারের হাজার ওষুধেও কোন লাভ হচ্ছে না। হবেও না। সৌগত জানত। অশরীরীকে কখনো ওষুধ মারতে পারে? ডাক্তার তো নিজের মতো করে একটা রোগও নির্ণয় করে ফেলেছে তার। সেই মত প্রত্যেক মাসে নতুন রিপোর্ট আর ওষুধ জমা হচ্ছে বাড়িতে। এই সমস্ত ওষুধ কিছুদিনের জন্য ভীতিটা কমিয়েছিল। যতদিন সে শুয়ে ছিল। কিন্তু যেদিন থেকে সে বিছানা ছাড়ল, সেই দিন থেকে আবার ‘তার’ আবির্ভাব শুরু হল। আজ পাঁচ মাস হয়ে গেল ঘরে বসে আছে সৌগত। 


এখন রাত দশটা। দু'হাত দিয়ে মাথা খামচে ধরে বসে আছে সে। একবার উঠে ঘরের হলুদ আলোটা জ্বালবে ভেবেছিল। কিন্তু সাহস হচ্ছে না। এখন তো তার আলো দেখলেই যেন ভয় লাগে। এই অশরীরীর নিয়মকানুন যে একদম উল্টো! অন্ধকারে কখনো দেখা দেয় না সে! যেই আলো জ্বালবে সৌগত,অমনি পর্দায় এসে উঁকি দেবে। ওই পর্দাটায় যতটা স্পষ্ট দেখা যায় অবয়বটা,ততটা আর কোথাও নয়। কিন্তু এভাবে সর্বত্র সৌগতকে ওর অনুসরণ অসহ্য লাগে তার! কি সুখ পায় এভাবে ওকে তাড়া করে বেরিয়ে? কোনো সুখ নেই। তাও তাড়া করে বেড়াচ্ছে! সর্বত্র, সর্বদা। 


 খুব সাহস জুগিয়ে উঠে গিয়ে আলোটা জ্বালালো সৌগত। সুইচ টিপতেই সারা ঘরে হলুদ তীব্র আলো ছড়িয়ে পড়ল। পর্দার সোজাসুজি আলোটা। ওপরেও নয়, নীচেও নয়। এই আলোটার পয়েন্ট অদ্ভুতভাবে দেওয়ালের মাঝ বরাবর। সৌগতর দাদার ফ্ল্যাট এটা। দাদা বিদেশে চাকরি নিয়ে চলে গেল, সৌগত একা রয়ে গেল এখানে। বাবা-মাকে বছর দশেক আগে হারিয়েছে দুই ভাই। সেই থেকে দুজনেই এতদিন দুজনের ভরসা ছিল। কিন্তু দাদা চলে যাওয়ার পর আরোই একা হয়ে গেল সৌগত। যতদিন দাদা ছিল, কখনো এসব অশরীরীর উৎপাত ছিল না। কোথা থেকে উড়ে এল হঠাৎ করে গত কয়েক মাসের মধ্যে, সেটাই তো ভেবে পায় না সে! এই আলোর পয়েন্টটাও দাদার কথামতো দেওয়ালের মাঝখানে করা হয়েছিল। দাদার ছবি আঁকার বাতিক ছিল। আলোর বাঁদিকে ঘরের দরজা দরজার পাশেই রাখা থাকতো দাদার ক্যানভাস। সরাসরি আলোটা ক্যানভাসের ওপর পড়ত। আলোটাও দাদার পছন্দের। ছোট্ট অথচ কি তীব্র! একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকা যায় না একেক সময়। অনেকটা সূর্যের মতো। 


আলোটা জ্বেলে আড়চোখে পর্দার দিকে তাকালো সৌগত। না, এখনো আসেনি সে। কেউ উঁকি মারছে না আপাতত। মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। আলোর সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে চোখ বুজে খানিকক্ষণ থেকে তারপর চোখ খুলল। আজ বোধহয় শান্তির ঘুম ঘুমোবে একটা,অনেক রাত পর। কিন্তু এ কি? ওই তো! ওই তো সে এসে গেছে! স্বচ্ছ রেশমের শ্বেতপর্দায় মূর্তিমান চন্ডালের মত তার কৃষ্ণাবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে! তার মাথায় উস্কোখুস্কো চুলের রেখাগুলো বুঝতে পারছে সৌগত। আবার নিজের দুই হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো খামচে ধরল সে। চোখ বুজে চিৎকার করতে লাগল, “চলে যাও তুমি! চলে যাও!”


সৌগতর চিৎকার গোটা ঘরে ঘুরপাক খেতে লাগল। ছায়াটা প্রবল নড়াচড়া শুরু করেছে হঠাৎ। এক জায়গায় স্থির থাকছে না। সৌগতর মাথায় রক্ত উঠে গেল। যেভাবে হোক ওকে ধরতে হবে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করে সৌগত ছুটে গেল, “তোমাকে ছাড়ব না!”


অশরীরীও ছাড়ার পাত্র নয় সৌগত বুঝতে পারল এবার। তার হুংকারে কাজ দিয়েছে। কারন প্রবল বিক্রমে অশরীরীও ছুটে আসছে এবার তার দিকে। কাছে আসতেই জাপটে ধরলো সৌগত। কিন্তু কাকে? হাতে তো তার রেশমের শ্বেত পর্দা! কিছুই তো এল না আর হাতের নাগালে! কোথায় অশরীরী? আবার চিৎকার করে উঠল সৌগত। উফ্! কি খেলা খেলছে তার সাথে অশরীরী! এভাবে সে কখনো জিততে পারবে না! 



সব চলে গেছে। সব। সৌগতর জীবনে আর কিচ্ছু নেই। চাকরি নেই, বন্ধুবান্ধব নেই, কোনো প্রিয়জন নেই। দাদার ফোন আসে, বুঝতে পারে। কিন্তু ফোন ধরতে ইচ্ছা করে না। ঋতম আসে খোঁজ নিতে। সৌগতর বাড়ির সবথেকে কাছে থাকে ও। তাই মাঝে মাঝে আসে। নিয়ম করে ডাক্তারের সাথে কথাও বলে। কিন্তু তাতে কি লাভ? ডাক্তার পারল এতদিনে ওই অশরীরী কে তাড়াতে? পারলো না। পারবেও না। অশরীরী তাড়ানো ডাক্তারের কাজ নয়। ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সৌগত। কি হবে ওষুধ খেয়ে? কোনো লাভ নেই। এই সাত মাসে তিল তিল করে পাগল করেছে ওই ছায়ামূর্তি তাকে। কোনো কাজে লাগেনি ওই ওষুধগুলো। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে সৌগত, বাঁচতে হলে এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতেই হবে। ওই অশরীরীকে নিঃশেষ না করতে পারলে তার শান্তি নেই। 


রাত বারোটা এখন। হাত শক্ত করে মুঠো করে দাঁড়িয়ে আছে সৌগত পর্দার সামনে। ঘরে হলুদ আলো তার জ্যোতি বিচ্ছুরণ করছে। বাইরে থেকে আসা হাওয়ায় দরজা সমান উঁচু জানলার পর্দা দুলছে হালকা। সাথে দুলছে সৌগতর প্রতিপক্ষ। কাঁপছে উত্তেজনায়, সৌগত বুঝতে পারছে সেটা। আজ এর শেষ দেখে তবে ছাড়বে সে। অনন্ত আক্রোশে ছুটে গেল সৌগত! টেনে হিঁচড়ে পর্দাটাকে ছেঁড়ার চেষ্টা করতে লাগল! ওপর থেকে অল্প ছিঁড়তে শুরু করেছে পর্দা। আজ এর শেষ না দেখে কিছুতেই ছাড়বে না সৌগত! 


         পরের দিন। ঋতম ঘরের কোণে চেয়ারে বসে আছে। বিছানায় বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে আছে রেশমের শ্বেতপর্দা। সে একা নয়,সে জড়িয়ে আছে সৌগতর নিথর গলায়। বীভৎস মুখটার দিকে তাকানো যাচ্ছে না সৌগতর! চোখ-মুখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে যেন! কি নিষ্ঠুর অত্যাচার নিজের ওপর! 


রুটিনমাফিক খোঁজ নিতে এসেছিল আজ ঋতম। ছিটকিনি দেওয়া ছিল না ফ্ল্যাটের দরজায়। তাই ঘরে ঢুকে এসেছিল সহজেই। কিন্তু বেডরুমের দৃশ্য দেখে দরজার সামনেই ধপ করে বসে পড়েছিল। সিলিং ফ্যান থেকে সৌগতর দেহটা ঝুলতে দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি সে। অনেক কষ্টে ধাতস্থ হয়ে পুলিশকে ফোন করে। মিনিট দশেকের মধ্যেই এসে পরে পুলিশ।


এখনো গোটা ঘর তারা খুঁজে চলেছে। যদি কোনো সুইসাইড নোট পাওয়া যায়? কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। ইন্সপেক্টর সোম তার সহকারী ইন্সপেক্টর দাসকে বললেন, “কি বুঝছো দাস? এভাবে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুর কোন কারন আন্দাজ করা যাচ্ছে?”

দাস খুঁজতে খুঁজতেই হতাশার সুরে বললেন, “না স্যার, এমন কিছুই পাইনি এখনো অবধি,যেটা কারন হিসেবে ধরা যায়।”

“ঠিক আছে। বডি পোস্টমর্টেমে পাঠিয়ে দাও। তখন হয়তো দেখবে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোচ্ছে!”

দাস একটা ফাইল নিয়ে এগিয়ে এলেন, “এটা পেলাম স্যার। মেডিকেল রিপোর্ট।”

“কি বলছে?”

“লোকটার সায়োফোবিয়া ছিল।”

“মানে...”

ঋতমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন সোম, “এব্যাপারে আপনি কিছু জানতেন?”

ঋতম ধীর কন্ঠে বলল, “জানতাম। ওর ট্রিটমেন্ট চলছিল।”

“কতদিন থেকে উনি অসুস্থ ছিলেন?”

“প্রায় সাত মাস। আমিই নিয়ে যেতাম ওকে ডাক্তারের কাছে। আমি তো জানতামও না রোগটার কথা। কখনো শুনিওনি। ডাক্তার বললেন সায়োফোবিয়া, ছায়াতঙ্ক। ছায়া দেখলেই ও পাগলের মত আচরণ করতো! সূর্যের আলো অবধি সহ্য করতে পারত না! ছায়া পড়ত যে সামনে!”

হলুদ আলোটার দিকে হাত দেখিয়ে বলল, “ওই আলোটা যত নষ্টের গোড়া। আমি অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম ওকে যে, ‘ওই আলোটার সামনে দাঁড়াস বলে তোর ছায়া পর্দায় পড়ে। ওটা তোরই ছায়া!’ কিন্তু ও কিছুতেই মানতে রাজি ছিল না! নিজের ছায়া দেখেই ভায়োলেন্ট হয়ে পড়তো। সারা ঘর সব সময় অন্ধকার করে বসে থাকত। ও যে এরকম একটা স্টেপ নিতে পারে, সেটা আমি ভাবতেই পারিনি।”



ঋতম চোখ মুছল। 

“ও বলেছিল ছায়াটাকে শেষ করেই ছাড়বে। কথা রাখল ছেলেটা। হয়তো বুঝতে পেরেছিল, নিজেকে শেষ না করলে ওই ছায়াটাকে শেষ করা যাবে না।”



এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ