সংখ্যা
‘পুনর্যাপী ফিনিক্স’, সন্মাত্রানন্দ
প্রকাশক : ধানসিড়ি প্রকাশন • ৩২৫/-
আলোচক : দীপাঞ্জন দাস
প্রথম অংশের নাম ‘ক্যালাইডোস্কোপ’। এই অংশের প্রথম গল্প ‘জলছবি’ যেখানে একটুকরো গ্রামের ছবিতে ফুটে উঠেছে জীবনের প্রতিচ্ছবি। স্টিকারের যুগে ফিরে যাওয়া যায় জলছবির সাম্রাজ্যে। দ্বিতীয় গল্প ‘যাত্রা’। এই গল্প বাস্তবেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ছোটবেলায়। ‘জলভাত খেয়ে মাদুর বগলে…’ যাত্রা দেখতে যাওয়ার কথা মনে করায় গ্রাম্যযাপনের কথা, যে পথে বহুদিন যাওয়া হয় না। কুবাই নদীর তীরে ফেলে আসা দিনগুলি যেন ভেসে উঠবে চোখের সামনে। তৃতীয় গল্প ‘ভয়’। এই গল্পের মধ্যে ছেলেবেলার বিভিন্ন ভয়ের ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠবে। বাথরুমে যাওয়ার সময় খাটের তলা থেকে পা চেপে ধরার ভয় থেকে শুরু করে ব্রহ্মদৈত্যের আক্রমণের ভয়-শৈশবের ভয়ের সেই বিভিন্ন মুহূর্তগুলো ফুটে উঠেছে এই গল্পে। চতুর্থ ও পঞ্চম মনোগ্রাহী গল্প হল যথাক্রমে ‘চতুরঙ্গ’ ও ‘অভিমান’। ষষ্ঠ গল্প ‘ডাকাত’। এই গল্পে একটি ডাকাতির কাহিনির বর্ণনা করা হয়েছে যার আড়ালে গ্রাম-বাংলার অভাবের দিকটি প্রতিভাত হয়েছে। সপ্তম গল্প ‘নিশিরাতের অতিথি’। ডাকাতির পরেই শুরু হল গৃহরক্ষার উপায় খোঁজা। সেই প্রয়োজনেই এলেন এক পালোয়ান। সেই নিয়ে লেখা এই গল্পটিও ভালো লাগবে। অষ্টম গল্প ‘প্রতিমা’। সংসার প্রতিপালনের জন্য মৃৎশিল্পকে জীবিকা করার কাহিনির সাথে ফুটে উঠেছে পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কথা। নবম গল্প ‘ক্রান্তিকারী’-তে স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অজানা দিকের খোঁজ পাওয়া যাবে। আলোচনায় অত্যাচারী পেডি সাহেব থেকে দীনেশ গুপ্তের ফাঁসির সাজা ঘোষণাকারী গার্লিকের হত্যার কথা উঠে এসেছে। এরপরের গল্প ‘ছবির মিছিল’। বাস্তবিক এক ফেলে আসা সময়কে তুলে ধরেছেন লেখক। অভাবীর সংসার, চাষবাস- বিরতীবিহীন চলাচলের মধ্যে হেঁটে চলেছে সময়।
একাদশ গল্প ‘অফুরান’। জীবনাদর্শন ও যাপনের এক অদ্ভুত লড়াই রয়েছে এই গল্পে। আদর্শের লড়াইয়ে গতানুগতিক সাধারণ জীবন যে বৈপরিত্যের পরিচয় বহন করে, তাঁর প্রমাণ দেয় চোখের কোণে শুকিয়ে থাকা জল- ‘তাকিয়ে থাকা তার শুকায় না…’ পরবর্তী গল্প ‘সার্কাসের সোনালি’-তে গ্রাম্য সার্কাসের সম্পর্কিত একটি প্রেমের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তী গল্প ‘ইরাবতীর অ্যালবাম’, যাতে আঁকা রয়েছে কাশফুলের সুবাস, দুর্গাপুজোর সেই হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যপট। সন্দেশ-মুড়ি মাখা যেখানে আনন্দের কারণ, যেখানে গ্রামের মানুষের উপস্থিতি ছিল জ্যোৎস্নার মতোই স্নিগ্ধ। সময়ের জালে আবদ্ধ আমরা সকলেই। দূরত্ব মাপার গ্রহণযোগ্য সেই এককটির উপর ভ্রমণ করাও এক অভিনব কৌশল। কিন্তু, সেই দূরত্ব যত বাড়ে, পরিবর্তিত হয়, অবয়ব থেমে যায়, বদলে যায় নিশ্চিন্ত রাত। বাস্তবেই তাই ‘খেলনা ভেঙে যায়’। ‘ক্যালাইডোস্কোপ’ পর্বের এটিই অন্তিম গল্প।
দ্বিতীয় অংশের নাম ‘কথাবস্তু’। প্রথম গল্প ‘আশমানি নেশা’। আশমানি রঙের প্রতি টান থাকে প্রত্যেক শিশুর। অথচ, যাপনের পথে সেই সূক্ষ্মতম অস্তিত্বটিই হয়ে ওঠে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। আকাশমুখো হয়ে থাকার আহ্বানই যেন এই গল্প লিখতে লেখককে উদবুদ্ধ করেছে। দ্বিতীয় গল্প ‘আদিমানবিক’। এই কাহিনিতে দুটি পৃথক জনগোষ্ঠীর কথা লেখা হয়েছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন মতাদর্শের এই দুই জাতি ওলগা ও জনটার মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের স্পন্দন। ভবিষ্যতের পরোয়া না করেও আদিমতম জ্যোৎস্নার পথে অগ্রসর হয় আদিম মানব-মানবী। তৃতীয় গল্প ‘ঘাতক’। কেবলমাত্র কোনও হত্যাকারীর চিহ্নিতকরণের জন্য এই গল্প নয়, এই গল্প প্রকৃতির এক নিয়মকেই বর্ণনা করেছে। খাদ্যশৃঙ্খল তবুও কখনও হেরে গিয়েছে, মুক্তি চেয়েছে অভিশপ্ত পেঁচকজন্ম থেকে। নদীজলে মিশে যেতে চাওয়ার আকুতি গল্পটিকে অন্যমাত্রা প্রদান করেছে। চতুর্থ গল্প ‘কুসুম কুসুম ভোর’। যে ভোরের আলোয় থাকে নিস্পাপ ছেলেবেলা, খেলনার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় মানসজন্মের ঘ্রাণ, আবার সময়ের সাথে সাথে যা স্থান নেয় স্মৃতিতে, লেখক সেই সময়ের ছবি এঁকেছেন সুনিপুণহস্তে। পঞ্চম গল্প ‘নদীতমা’। পুকুরপাড়ের কাছে গাছগাছালির সমাহারের মধ্যেই একটি এককামরার ঘরে থাকেন স্কুলশিক্ষক। মাঝে মাঝেই শুনতে পান হাসির শব্দ। তার সাথেই ঘটতে থাকে অদ্ভুত কিছু কাণ্ড। অশরীরির উৎপাত নাকি বালখিল্যতা- তা উঠে এসেছে এই গল্পে। গল্পের শেষে এই মনস্তত্বের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের একটা যোগসূত্র বাঁধা হয়েছে। আসলে, কিছু শব্দের প্রতি বিরক্তি জন্মালেও তার অনুপস্থিতি ম্লান করে দেয় সমস্ত সুখকে, প্রকৃত নির্জনতা হয়তো সেটাই… ষষ্ঠ গল্প ‘আয়না’-তে যেন দুটি ভিন্ন সময় এসে মিশেছে। অবয়ব একই, তবুও কতটা পার্থক্য থেকে যায় নিজের সাথে নিজেরই। সত্যিই কি তা নিজেরই প্রতিরূপ নাকি ভিন্ন? কে এই পলাশপ্রতীম, কে এই শোভন? একটা প্রশ্নচিহ্ন রেখেই শেষ হয় এই অসাধারণ লেখনীটি। সপ্তম গল্প ‘দুঃস্বপ্ন’। শুভব্রত ও চিত্রিতার জীবনের ভয়াবহতার চিত্র এঁকেছেন লেখক। মেয়ের হত্যার বদলা নিতে যতনবাবু নিজের জীবন বিপন্ন করলেন, তবুও চিত্রিতার জীবনের সেই ভয়াবহ ঘটনা রয়ে গেল এক ভয়ানক স্মৃতিরূপে। অষ্টম গল্প ‘নিরুদ্দিষ্ট নায়ক’। ডায়েরির পাতায় লিপিবদ্ধ বিভিন্ন সময়কাল ও ঘটনাবলী সাক্ষ্য দেয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনাবলীর। বন্দী দেশনায়কের সম্বল বলতে টুকরো স্মৃতি। দেশ স্বাধীনের খবর জানা থাকলেও তার অলক্ষ্যে থাকা দেশনায়ক রয়ে গিয়েছে আঁধারেই। অন্তিম গল্প ‘বস্তুকথা’। জীবনের গল্প কিংবা গল্পের জীবন, যেখানে মিশে থাকে ভাঙা সেতারের আবেদন, না ঘটা কিছু স্বপ্ন-যা হয়ে ওঠে মরমি সাহিত্যবস্তু। লেখকের কথা- “এক লেখকের মৃত্যু হয়, তবু মৃত্যুর সুগম্ভীর আলাপ ও বিস্তারের ভিতর গড়ে ওঠে অন্য কোনো লেখকের কলমে জীবনযাপনের স্থায়ী ও আভোগ ব্যেপে অন্যতর কোনো ‘কথাবস্তু’।”
‘অনু কথাবস্তু’ অংশের প্রথম গল্প ‘এণাক্ষীগাথা’। সারনাথ ভ্রমণে ভেসে ওঠে কয়েকশো বছর আগের দৃশ্যপট, ভেসে ওঠে ভিক্ষু উতস্থ, ভিক্ষু সুপ্রতীকের, সংঘপ্রধান সর্বতোভদ্রের ছবি। এনাক্ষীর প্রতি প্রেমাবেশে আবদ্ধ হয়ে রচিত প্রণয় কবিতা যখন সুপ্রতীককে প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করায়, তখন নিজের মতবাদে অবিচল থেকে সংঘ পরিত্যাগ করেন সুপ্রতীক। কথক ও সেই ভিক্ষু যেন সময়ের দুই প্রান্তে দাঁড়ানো একই বৃন্তের অংশ। দ্বিতীয় গল্প ‘মল্লার’। কাহিনিতে থাকা সংবরণ ও দূর্বার নিয়মের বেড়াজালের বাইরে গড়ে ওঠা জীবনের গল্প লিখেছেন লেখক। অনঙ্গমোহনের সুরের মূর্ছনায় যেন আবিষ্কৃত হয় নূতন জীবন-‘মানুষের জীবনে এমন কোনো তন্ময় মুহূর্ত আছে, যখন সে সহসাই নিজেকে, নিজের চাওয়াপাওয়াগুলোকে অন্যরকমভাবে চিনতে পারে।’ এর পরের গল্প ‘অথ নিষাদকথা’। এসেছে একলব্যের কথা, যতুগৃহের কথা। গল্পের বিশদে বর্ণনা করবো না। কেবল একটি কথা তুলে ধরি- ‘তোমরা যাকে মৃত ধরে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছ, আমি সেই নিষাদ।’ অন্তিম গল্প ‘রাত্রিসূক্ত’-কে লেখকের লেখনী ও অসামান্য ভাবনার মেলবন্ধন বলা চলে। যেখানে এসে মিশেছে অমৃতের স্রোতধারা, রহস্যময়ী জাদুকরী ও কিছু স্তব্ধবাক মুহূর্ত।
অন্তিম অংশের নাম ‘ধীরে বহে বেত্রবতী’। এই পর্বের প্রথম গল্প ‘উত্তরা বোষ্টমির কড়চা’। এই গল্পে আছে এক সাধক ও তাঁর বোষ্টমির কথা। দু’জন মানুষের গল্প না বলে সমাজের এক করুন রূপের গল্প বললেই সঠিক হবে বলে মনে হয় যেখানে বৃষ্টিবাদলও যেন মায়ারূপে ধরে দিয়েছে। দ্বিতীয় গল্প ‘মৃৎপাত্র জাতক’। এই গল্প সিদ্ধার্থের বোধিলাভের নয়। বরং এখানে উঠে এসেছে শ্রমণের নিত্য ব্যবহৃত ভিক্ষাপাত্রের কথা যেটি ছিল সিদ্ধার্থের সাধনার অন্যতম সাক্ষী। সেটিকে আসলে কেউ ধারণ করে না। বরং, সেই নিত্যমৃত্তিকার ভিক্ষাপাত্র ধারণ করে সকলকে। তৃতীয় গল্প ‘নিঝুমপুর’। পুরাতন বাড়ি, পুরনো অভ্যাস ও কিছু অলৌকিকতা-এই হল এই গল্পের নির্যাস, যা আমার বেশ ভালো লেগেছে। চতুর্থ গল্প ‘সরগরম পেশা’। নামটিকে ব্যাঙ্গাত্মক বললে ভুল হবে না। গল্পের মধ্যে ফুটে উঠেছে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ অংশের কথা। পঞ্চম গল্প ‘মাঝরাতের সেই ফোনকল’। ছোট্ট এই গল্পটির মধ্যে রয়েছে অপরাধ, অলৌকিকতা ও ভয়। ষষ্ঠ গল্প ‘ভ্রষ্টাচারী ইঁদুর’। ইঁদুর কীভাবে কথকের বিশ্বাসের অমর্যাদা করলো, সেই নিয়েই এক ‘ব্যাচেলার’ ইঁদুরের গল্প! সপ্তম গল্প ‘জে’। এটি একটি সামাজিক গল্প। সমাজের নিয়মের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে আসা এক নারীর মুক্তির গল্প, একজন পুরুষের লড়াইয়ের গল্প। অষ্টম গল্প ‘পাঁচজন মানুষ’। এখানে লেখক তাঁর নিজের জীবন থেকে বেছে নিয়েছেন পাঁচজন মানুষকে এবং শুনিয়েছেন তাঁদের গল্প এবং স্বাভাবিকভাবেই গল্পের শেষে এসেছে মনু নদী-মন নদী। অন্তিম গল্প ‘ধীরে বহে বেত্রবতী’। কাহিনিটিতে উঠে এসেছে বেত্রবতী নদীতীরের এক সাধকের কথা। অপরিমিত ক্ষমতা প্রত্যেককেই অহংকারে নিমজ্জিত করতে পারে। ফলত, তা আত্মোন্নতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু, প্রেমাস্পদের ধারা হয়তো নদীর স্রোতের মতোই বহমান, যা ধৌত করে সমস্ত পাপরাশিকে। নদী বয়ে চলে, পড়ে থাকে খোলস।
ফিনিক্স হল গ্রিক পুরাণে বর্ণিত একটি পাখি যা নিজের ছাই থেকে লাভ করে নবজীবন। লেখকের হারিয়ে যেতে বসা লেখনীর স্পর্শে এই বইটি নবরূপ লাভ করে হয়েছে ‘পুনর্যাপী ফিনিক্স’ এবং লেখনীর স্পর্শ পাঠককে যে লেখকের কল্পভুবনে আশ্রয় দেবেই সে কথা হলফ করেই বলা যায়।
‘আনিবানি’, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশক : কলকাতা লিটেরারি প্রেস • ২০০/-
আলোচক : অরিন্দম গোস্বামী
মেয়েটা অপেক্ষায় থাকে - এবারেও আসবে বলে যে এলো না। ছবি হয়ে যাওয়া নতুন মামিমাকে দেখে তার মনে হয়, তবে কি সেও পাথর হয়ে যাবে, অহল্যার মতো? চারপাশে চোখ মেলে দেখে, ফুটপাথে শুয়ে থাকা ছেলেটার ভাতের হাঁড়িতে জল ঢালা। মনে হয় - অ আ ক খ না শিখেই রোজ রোজ এরা যুদ্ধ শিখতে বাধ্য হচ্ছে। পুজোয় শাড়ি না নিয়ে তাই কিছু বই কিনতে চায় সে।
ইতিহাসের কথা ভাবে সে। অশোকের বিশ্ববোধ, পলাশীর ধূ-ধূ মাঠ তাকে ভাবায়। তার মনে হয়, আমাদের ইতিহাস চিরকাল ক্রুশবিদ্ধ হয়। নিজের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয় ইচ্ছেগুলো শুধু কাগজের নৌকা হয়ে ভাসে। একদিন হিলহিলে লতা হয়ে হেলেদুলে যাকে ঘিরে তার কল্পনা উর্দ্ধগামী হতো, প্রিয় সেই পাউডার ঘ্রাণ কাছে আসে। প্রশ্ন জাগে - তুমি কি এখনো সেই পুরোনো সাইকেলেই, টিউশনি সারো?
উত্তর আসে না। শুধু মনে হয় - মোমবাতি জীবন শেষ হলে, প্রজাপতি জীবন শুরু হয়। অবশেষে চাঁদ ফিরে আসে। হাসে। আর মুছে দেয় হায়নার সমস্ত নখর-চিহ্ন। দিনশেষে একবার তারা ফিরে আসবেই।
মেয়েবেলা যাপনের আপাত কথকতা সেরে এভাবেই লেখিকা সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায় এসে দাঁড়িয়েছেন বৃহত্তর জীবনের আঙিনায়। সংকলনটি আয়তনে বৃহৎ নয়। কবিতাগুলিও বেশ ছোট ছোট। কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই জীবনের সারাৎসার, জীবনের অনুভূতি বুনে দিয়ে যান তিনি। সচরাচর কবিদের মতো শেষ লাইনেই চরম অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে হবে - এই মতে তিনি সর্বত্র বিশ্বাসী নন। “সবুজ মাঠগুলো সব/ যুদ্ধ জাহাজে ভরে যায়” - এইরকম মনে রাখার মতো পংক্তি দিয়েও শুরু হয় তাঁর কবিতা। অথবা “রাবারে মুছেছি কালি/ উঠে গেছে শব্দরূপ/ ভ্যানিস হয়েছে!” এই ভ্যানিস শব্দের মধ্যে যে নির্মমতা - আপাত সরলতার ভঙ্গিতে সেটা স্বতস্ফূর্তভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই তাঁর শক্তিমত্তা, তাঁর রচনার নিজস্ব সাক্ষর।
‘বিকল্প থিয়েটারের সন্ধানে’সম্পাদক : রথীন চক্রবর্তী
প্রকাশক : নাট্যচিন্তা ফাউন্ডেশন • ১০০/-
আলোচক : দীপ দাস চৌধুরী
যেখানে জীবন মৃত্যু মুখোমুখি দাঁড়াই,
সেখানে কথা বলে থিয়েটার।
‘অন্তরঙ্গ’ (ইন্টিমেট থিয়েটার) হাতে এসে পৌঁছালো ‘নাট্যচিন্তা’ ফাউন্ডেশনের পত্রিকা, যার বিষয় ‘বিকল্প থিয়েটারের সন্ধানে’ সময়ের এক প্রামাণ্য দলিল। দুঃসময় কাটিয়ে আমরা ফিরেছি আবার নতুন ছন্দে।
এবার আসি বইয়ের কথায়। বইটি তিনটি পর্বে বিভক্ত করে লেখা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম পর্ব - বিকল্প থিয়েটারের সন্ধানে
দ্বিতীয় পর্ব - বিকল্প থিয়েটারের খোঁজে
তৃতীয় পর্ব - বিকল্প স্পেস খুঁজতেই হবে
প্রথম পর্ব : ‘বিকল্প থিয়েটারের সন্ধানে’
আমরা একটা ভয়ঙ্কর দুঃসময় পেরিয়ে নিউ নর্মাল জীবনে প্রবেশ করেছি। আর খুঁজে চলেছি নিউ নর্মাল থিয়েটার। করোনা অতিমারির পরে থিয়েটার আবার থিয়েটারের পুরোনো অবস্থানে ফিরেছে, এটা কি আমরা জোর গলায় বলতে পারি? শিল্পীর ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষের আর্তনাদের ভাষা সারা বিশ্বজুড়ে থিয়েটারের সংকটের ছবি সকলের সামনে উঠে এসেছে। এই বইতে আশিস গোস্বামীর লেখা পড়ে জানতে পারলাম, ‘শীতলপাটি’ নাটকের একটি সংলাপ - “মানুষ আর থিয়েটার বাদ দিয়ে আমার জীবন রক্ষা পেল ঠিকই, কিন্তু এই জীবনটা নিয়ে করব-টা কি ?”
সত্যিই তো, থিয়েটারের মানুষের কাছে থিয়েটার ছাড়া বাঁচাটাই তো দুঃসহ। এক্ষেত্রে, সমবেদনা জানানোর কোনো ভাষা থাকে না। তাই, ভালো-মন্দকে সঙ্গী করে থিয়েটার দলগুলির নিজেদের মতো করে গড়ে তোলা ‘অন্তরঙ্গ থিয়েটার’ এর অনন্য প্রয়াসকে সাধুবাদ না জানালে খুব ভুল হবে। করোনা অতিমারি যেমন আমাদের থেকে কেড়েছে অনেক কিছু, তেমনই আমাদের নতুন নতুন ভাবনার পথে এগিয়ে দিতে বাধ্য করেছে। অনেক নাট্যদল নিজেদের বাঁচার তাগিদে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তৈরি করেছেন এই নিজস্ব স্পেস। নাট্যকর্মীরা বুঝেছেন এর প্রয়োজনীয়তা। এপেক্স (দমদম), অমল আলো (অশোকনগর), অন্যভুবন (কৃষ্ণনগর), অন্তর প্রকাশ (বগুলা), তাপস সেন - কুমার রায় নাট্যভবন (কল্যাণী), মহিষাদল শিল্পকৃতি (মহিষাদল), আঙিনা (চাকদহ), থিয়েটার ক্যাফে (চাকদহ), অন্তহীন কলাক্ষেত্র, উদীচী আর্ট প্রেস, শান্তিপুর সাংস্কৃতিক, বেলঘড়িয়া রূপতাপস, এথিক, অঙ্গন (বেলঘড়িয়া), হাইফেন থিয়েটার (বিষ্ণুপুর), এরকম অনেক নাট্যদলের নিজস্ব অভিনয়ের স্পেস তৈরি হয়েছে। দর্শক সেখানে যাচ্ছে, অনুভব করছে তার (অন্তরঙ্গ নাট্য) গুরুত্ব, মিশে যাচ্ছে বিকল্প থিয়েটারের সঙ্গে। নির্দিষ্ট কিছু সাংস্কৃতিক মঞ্চ ছেড়ে এই নতুন ধরনকে আমাদের আরো আপন করে নিতে হবে, তবেই তো অন্তরঙ্গ থিয়েটারের সমৃদ্ধি ঘটবে। বাংলা থিয়েটার চলার পথে গত শতাব্দীর মধ্যভাগ পার করে অন্যভাবনা ও প্রয়োগের নতুন পথ খুলে দিয়েছিলেন বাদল সরকার। মূলত গত শতকের ছয়ের দশক থেকে বাদল সরকার তার নাট্যরচনা, নির্মাণ ও প্রয়োগ আধুনিক বাংলা নাট্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই বই পড়েই জানতে পারলাম -
বাদল সরকারের পথ ধরেই শ্রী প্রবীর গুহ প্রথমে লিভিং থিয়েটার (খড়দহ), পরে অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটার (মধ্যমগ্রাম), পথসেনা এবং আরো অনেক দল বিকল্প পথ বেছে নিয়েছিলেন।
অশোকনগর থেকে দমদম, গোবরডাঙ্গা থেকে কৃষ্ণনগর, বগুলা থেকে বোলপুর, চাকদহ থেকে বহরমপুর -এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে থিয়েটার নিয়ে আরো বেশি নতুন ভাবনা চিন্তার সঞ্চার হচ্ছে , যা থিয়েটারের নতুন পথের দিকনির্দেশ। এই নাট্যচর্চা থিয়েটারের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গুণমান বৃদ্ধি করবে এবং অন্যান্য নানা বিষয়ে (যেমন- শিল্পীর অভিজ্ঞতা, বোধ) আরো স্পষ্ট ধারণা তৈরি করবে বলে সকলেই আশাবাদী। অতীতের পরিস্থিতি থেকে সংগৃহীত ভয়ঙ্কর শব্দ ‘পজিটিভ’, সেক্ষেত্রে অতিমারির পরবর্তীতে থিয়েটারকর্মী ও দর্শকের কাছে এই ‘পজিটিভ’ শব্দটি থিয়েটারের সামগ্রিক চর্চায় নতুন রূপে ধরা দিতে পারে। এই বইয়ে বসন্ত পাথ্রডকরের লেখায় উঠে এলো দক্ষিণ কোরিয়ায় মহামারীকালে থিয়েটারের কথা।
‘আর্ট কাউন্সিল কোরিয়া থিয়েটার’ -এর ব্যবস্থাপনার অভিনবত্ব নতুন নজির সৃষ্টি করেছিল। মহামারীকালেও থিয়েটার নিয়ে এরকম ভাবনা, নাট্যদল ও নাট্যপ্রিয় মানুষকে নতুন করে ভাবাবে। চলমান জীবনের আনন্দ, দুঃখ, সংগ্রাম, শোক, একাকীত্ব, যন্ত্রণা, প্রতিবাদের ভাষা থিয়েটার। নিঃসন্দেহে এটি একটি জোরালো মাধ্যম।
দ্বিতীয় - ‘বিকল্প থিয়েটারের খোঁজে’
সুখ - দুঃখের সুতোয় বোনা নকশি কাঁথায় এসময়ের নানা ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন নাট্যকারেরা। নাটকগুলি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে জীবন প্রবাহের এক খন্ডচিত্র। যা অতিমারী, আতঙ্ক, ঘরছাড়া মানুষ, ভবিষ্যতের চিন্তা, শাসকের ব্যর্থতা, লোভ, অনটন, বৈষম্য, হিংসা, ধর্ষণ, শোষণের রঙে আঁকা বিশৃঙ্খল সময়ের চলচিত্র। নাটকগুলি নাড়া দেয় চেতনার গভীরে। জন্ম দেয় বিষন্নতা। ভালো না থাকার ইঙ্গিত। থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত মানুষের পেশা বদল, লকডাউনে গৃহবন্দী অবস্থা তাদের টেনে নিয়ে গিয়েছে অবসাদের দোরগোড়ায়, এখন তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় এই থিয়েটার। সেই ছবিই নাটকগুলিতে আরো স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে। এই নাটকগুলি অন্যধারার এই থিয়েটারকে আরো বেশি করে সমৃদ্ধ করতে পারে।
তৃতীয় পর্ব - 'বিকল্প স্পেস খুঁজতেই হবে'
এই বইয়ের সংকলিত, নাটকের দল ‘অশিক্ষিত’-এর প্রিয়া সাহা রায় ‘লেখা বাড়ির ছাদেই নামছে নাটক’, ‘অশোকনগর অভিমুখ’ এর অভি চক্রবর্তীর লেখা ‘মহলাকক্ষই হয়ে গেল শিল্পশালা’, ‘কৃষ্ণনগর সিঞ্চন’ দলের সুশান্ত হালদারের লেখা ‘একটি স্পেস , অন্য ভুবন’, বগুলা সূচনার সৃজন মন্ডলের লেখা ‘স্পেস আরও একটি, অন্তর প্রকাশ’, ‘সংশপ্তক’ দলের পলাশ শিকদার ও পৌলোমী চক্রবর্তীর লেখা ‘নাটক শুরু পশ্চিমের বারান্দায়’, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের ‘নির্বাসিতের জার্নাল, লকডাউন নাট্য’ - এই লেখাগুলো পড়ে আমি থিয়েটারের নিজস্ব স্পেসগুলিতে হারিয়ে গেলাম। আমি দেখছি, প্রতিটি নাট্যগোষ্ঠীর অন্তরঙ্গ নাট্যমঞ্চে অভিনয় হচ্ছে। সামনে দর্শক আসনে বসে তাদের নতুন নতুন সৃষ্টির সঙ্গে নিজে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলছি। মন আনন্দে নেচে উঠছে। বারবার মনে হচ্ছে, এতদিনে বোধহয় হারিয়ে যাওয়া কোনো কিছু আবার খুঁজে পেলাম। শরীরের মধ্যে এ এক অদ্ভুত অনুভূতি।
আমার মতো অনেকেই হয়তো পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা এই নিজস্ব স্পেসগুলিতে ঘুরে ঘুরে থিয়েটার দেখতে পারবো না, তাদের জন্য এই বইটি দেখার, বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে। আশা রাখি, গবেষক ও থিয়েটারপ্রেমী মানুষের কাছে বইটি অবশ্যই সাদরে গ্রহণযোগ্য হবে।
এই বইয়ে সংকলিত বিভিন্ন নাট্যদলের নিজস্ব স্পেস গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ও অভিজ্ঞতা জানার ফলে প্রতিটি নাট্যদল তাদের নিজস্ব স্পেসগুলি নিয়ে আরও বেশি করে উন্নতির পথে অগ্রসর হবে এবং যে সমস্ত নাট্যদল এখনও নিজস্ব স্পেস তৈরীর পরিকল্পনা করছে, তাদের ক্ষেত্রে অনেকাংশে সুবিধা হবে বলে আমার মনে হয়।
নাট্যচিন্তার এরকম একটি সংকলন পড়ে, খুবই ভালো লাগলো। বইটির শুরুতেই বই সম্বন্ধীয় যে দু-চারটি বাক্য লেখা আছে, তা প্রশংসনীয়। বইটিতে যে হরফ ব্যবহৃত হয়েছে, তা খুব সুন্দরভাবে সাজানো, পড়তে গেলে অসুবিধা হবে না।
তবে ব্যক্তিগত মত, বইটিতে কিছু অংশ যুক্ত ও পরিবর্তন হওয়ার প্রয়োজন আছে।
• কোনো বইয়ের প্রচ্ছদ, সেই বইটি পড়তে পাঠককে আরো বেশি আগ্রহী করে তোলে। বলা চলে, প্রচ্ছদই কোনো বই এ প্রবেশের প্রথম আকর্ষণ। কিন্তু, এই বইটিতে সুন্দর প্রচ্ছদ থাকলেও দুর্ভাগ্যক্রমে প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম লেখা নেই। সম্পাদক মহাশয়কে আমি আবেদন জানাবো, ভবিষ্যতে যেন আমরা প্রচ্ছদশিল্পীর নাম পাই।
• প্রথম পর্বে : ‘বিকল্প থিয়েটারের সন্ধানে’ প্রত্যেক লেখকের লেখার শেষে খুব সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি থাকলে আমরা আরো বেশি সমৃদ্ধ হতাম।
• দ্বিতীয় পর্বে - ‘বিকল্প থিয়েটারের খোঁজে’ - এই পর্বে নাটকগুলির মধ্যে কয়েকটি নাটক সুখপাঠ্য ও মানের দিক থেকে সাহিত্যগুণসমৃদ্ধ হলেও, কয়েকটি নাটক সাহিত্য মানকে বজায় রাখতে পারেনি।
• তৃতীয় পর্বে - ‘বিকল্প স্পেস খুঁজতেই হবে’ - এই পর্বে প্রত্যেকটি লেখার শেষে নাট্যদলের নাম থাকলেও, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের লেখার শেষে নাট্যদলের নাম পেলাম না।
• নাট্যগোষ্ঠীগুলির নামের সঙ্গে যদি তাদের প্রতিষ্ঠাকাল ও তাদের সম্পর্কে কিছু তথ্য, কোভিড পরবর্তীতে তাদের ভাবনা, অন্তরঙ্গ থিয়েটারে তারা কি কি সুবিধা ও অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে, এরকম আরো কিছু বিষয় যদি জানতে পারতাম, তাহলে আরো ভালো লাগতো।
• বইটিতে অনেক বানান ভুল আছে, যা দৃষ্টিকটু লাগছিল। তাই বানানের ব্যাপারে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরী।
• বইটিতে লেখাগুলির সাথে প্রাসঙ্গিক কোনো ছবি নেই। সুন্দর লেখাগুলির সঙ্গে এই সময়ে গড়ে তোলা নবনির্মিত স্পেসগুলির ছবি কিংবা তাদের অভিনয়ের কিছু মুহূর্ত লেখার মাঝে কিংবা শেষে যুক্ত হলে তা আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতো।
• বইটির একদম শেষে আছে কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি ছোট পুতুল নাটক ‘মাধবী ফুটেছে ওই’, এটি ‘বিকল্প থিয়েটারের খোঁজে’ এই পর্বে থাকলেই বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতো।
অতীত ও বর্তমান সময়ের নাট্যচর্চার যে আলোচনা বইটিতে স্থান পেয়েছে, তা আমার মতো খুদে দর্শক ও অন্যান্যদের তথ্যসমৃদ্ধ ও আরো নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির হদিশ দিতে পারে। আমরা পার করেছি ভয়াবহ সংকটকালীন পরিস্থিতি। তবুও, কবি শঙ্খ ঘোষের কথাই বলতে হয় -
“কিছুই কোথাও যদি নেই
তবু তো ক'জন আছি বাকি
আয় আরো হাতে হাত রেখে
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।”
তাই, সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করি - আমাদের সকলকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে, অসত্য থেকে সত্যের দিকে নিয়ে চলো। বেঁচে থাকুক এই বিকল্প থিয়েটার, আবার নতুন করে শ্বাস নেবে পৃথিবী।
এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ