সংখ্যা
![]() |
অলঙ্করণ : বিং |
বড় হওয়ার বিড়ম্বনা
মূল রচনা : মুন্সি প্রেমচাঁদ
ভাষান্তর : শুভম ঘোষ
১
আ মার দাদা ছিল আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার চেয়ে মাত্র তিন ক্লাস উপরে পড়তো সে। এর অবশ্য একটা কারন ছিল। লেখাপড়ার মতো একটা গুরুগম্ভীর বিষয়ে তাড়াহুড়ো করাটা তাঁর ধাতে ছিল না। ভিতটা মজবুত করে নিতে হবে যাতে সেই মজবুত ভিতের ওপর ইমারত গড়ে তোলা যায়— এই ছিল তাঁর নিয়ম। আর এই নিয়ম মানতে গিয়েই হত যত বিপত্তি। এক বছরের পাঠক্রম শেষ করতে তাঁর দু'বছর লেগে যেত, কখনো কখনো তো তিন বছরও লেগে যেত। হাজার হোক ভিত মজবুত করতে হবে তো, নইলে ইমারত গড়ে উঠবে কীভাবে!
আমার বয়স ছিল নয় বছর আর দাদার চোদ্দো। তাই আমাকে শাসন করাটা ছিল তাঁর জন্মসিদ্ধ অধিকার। আর তাঁকে মান্য করাটাও আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়তো।
দাদা স্বভাবতই ছিল অধ্যয়নশীল। প্রায় সর্বক্ষণই বই খুলে বসে থাকতো আর মাঝে মাঝে মস্তিষ্ককে একটু বিরাম দেওয়ার জন্য খাতায় অথবা বইয়ের পেছনের পাতায় পাখি, কুকুর, বিড়াল — এসবের ছবি আঁকতো। আবার কখনো একটাই বাক্য কিংবা একটাই শব্দ দশবার লিখে ফেলতো। একই কবিতা সুন্দর হস্তাক্ষরে বারংবার লিখতেও দেখেছি তাঁকে। কখনো আবার এমন সব উদ্ভট বাক্যরচনা করতো যাতে না থাকতো কোনো অর্থ আর না থাকতো কোনো সামঞ্জস্য। একবার আমি চুপিচুপি তাঁর খাতা খুলে দেখেছিলাম তাতে লেখা রয়েছে —
স্পেশাল, আমিনা, ভাই-ভাই, আসলে, ভাই-ভাই, রাধেশ্যাম, শ্রীযুক্ত রাধেশ্যাম, এক ঘন্টা ধরে... এর পর একটা মানুষের চেহারা আঁকা ছিল। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা চরিত্র করেও এই হেঁয়ালির সমাধান খুঁজে পাইনি আমি। দাদাকে জিজ্ঞেস করারও সাহস হয় নি। সে পড়তো নবম শ্রেনিতে আর আমি পঞ্চমে। তাঁর লেখার মর্মোদ্ধার করা আমার দুঃসাধ্য।
এবারে আমার কথা কিছু বলা দরকার। লেখাপড়ার সাথে আমার সম্পর্কটা ঠিক ওই কৌরব আর পান্ডবদের মতো। একটা ঘন্টা বই নিয়ে বসে থাকতেও ভীষণ কষ্ট হতো। সবসময় সজাগ থাকতাম, মওকা পেলেই চুপিচুপি বেড়িয়ে পড়তাম হোস্টেল থেকে। তারপর একদৌড়ে সোজা খেলার মাঠে। কখনো গুলি-ডান্ডা খেলি তো কখনো কাগজের প্রজাপতি বানিয়ে ওড়াই — এভাবেই সময় কাটতো। সঙ্গীসাথী জুটে গেলে তো কোনো কথাই নেই, অদ্ভুত ধরনের সব খেলা খেলতাম সকলে মিলে। বাড়ির পাঁচিলে চড়তাম সবাই, তারপর একসাথে সেখান থেকে নিচে লাফিয়ে পড়তাম। তারপর, দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতাম, কোনো বাড়ির সামনে ফটক দেখলেই আমাদের মধ্যে একজন তাতে চড়ে বসতো আর বাকিরা সেই ফটকটাকে সামনে পেছনে ঠেলে মোটরগাড়ির আনন্দ নিতাম। কিন্তু হোস্টেলে ফিরে দাদার রৌদ্রমূর্তি দেখে ভয়ে কাঠ হয়ে যেতাম একেবারে। আমাকে দেখে তাঁর প্রথম প্রশ্নই হত — “কোথায় ছিলি এতক্ষণ?”
প্রত্যেকবার একই প্রশ্ন একই রকম গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করতো সে। জবাবে আমি কিছুই বলতে পারতাম না। ‘একটু বাইরে খেলছিলাম’ — মনের এই কথাটা, কেন জানি না, মনেই রয়ে যেত।
মাঝেমধ্যেই দাদা আমাকে লম্বা চওড়া ভাষণ দিয়ে দিত। “এইভাবে ইংরেজি পড়বি তো এক বর্ণও শিখতে পারবি না। ইংরেজি টা ছেলেখেলা নয়, এই বলে দিলাম। এর জন্য রাত-দিন চক্ষু ঠিকরে রক্ত জল করে পড়তে হয়। তারপর এই বিদ্যা রপ্ত হয়। পুরোপুরি রপ্ত কি আর হয়, কাজ চালানোর মতো হয়ে যায়। বড় বড় দিগ্বজ পন্ডিতেরাও শুদ্ধ ইংরেজি লিখতে পারে না, বলা তো অনেক দূরের বিষয়। আর কত বড় পন্ডিত তুমি যে আমাকে দেখেও শিক্ষা হয় না! বলি, আমি কত পরিশ্রম করি সেটা চোখে পড়ে তো, নাকি তাও পড়ে না? যদি না পড়ে তাহলে বলবো এই বয়সে চোখের মাথা খেয়ে বসে থাকাটা কি খুব ভালো হচ্ছে? যাক গে, যা বলছিলাম...এই যে এত মেলা হয়, পুজো হয়, আমি কোনোদিন যাই? ক্রিকেট ম্যাচ, হকি ম্যাচ, ফুটবল ম্যাচ — এসব তো লেগেই রয়েছে হরদম, আমাকে দেখেছিস কখনো যেতে? সবসময় পড়ি, তাও আবার এক-একটা ক্লাসে দু'বার তিনবার করে। আর তুই কীভাবে আশা করিস যে দিনভর লাফালাফি করে সময় নষ্ট করেও পাস করে যাবি? আমার তো তাও দু-তিন বছর লাগে, আর তোর জীবন কেটে যাবে তাও একই ক্লাসে পড়ে থাকবি। যদি এভাবেই সময় নষ্ট করার ইচ্ছা থাকে তাহলে গ্ৰামের বাড়ি চলে যা, ওখানে গিয়ে লাফিয়ে বেড়া। বাবার পয়সা বেঁচে যাবে খানিক।”
এই নিদারুণ আক্রমণে আমি পুরো দিশেহারা হয়ে পড়তাম। জবাব-ই বা কী দেবো? ভুল যখন আমি করেছি তখন তার মাশুল তো আমাকেই গুনতে হবে। তবে একটা কথা স্বীকার না করে উপায় নেই, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করায় দাদার জুড়ি মেলা ভার। এমন মোক্ষম সব শব্দবাণ ছুঁড়তো যে আমার অন্তরটা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। মাঝে মাঝে তো মনে হতো বাড়ি পালিয়ে যাই। যে কাজটা আমার সাধ্যের বাইরে, সেটা করতে গিয়ে নিজের জীবনটাকে খামোখা নষ্ট করি কেন। জীবনভর মূর্খ থাকবো তাও সই কিন্তু এত মেহনত তাও আবার লেখাপড়ার জন্য — নাঃ এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ভাবলেই মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। ঘন্টাখানেকের ভিতরেই কিন্তু নিরাশার এই ভাবটা কেটে যেত আর তখন কঠিন সিদ্ধান্ত টা নিয়েই ফেলতাম। এবার থেকে খুব পড়বো, জান লড়িয়ে দেবো! চটপট একটা টাইম-টেবিল ও প্রস্তুত হয়ে যেত। পরিকল্পনা না করে, ছক না কেটে কোনো কাজই শুরু করা উচিত নয়। আর এ তো রীতিমতো যুদ্ধ! টাইম-টেবিল লেখার সময় খেলার কথা একেবারে মুছে যেত মন থেকে। বিস্তর পরিকল্পনা করে টাইম-টেবিলের চেহারা দাঁড়ালো কতকটা এইরকম — সকাল ছ'টায় ঘুম থেকে ওঠা, তারপর মুখ হাত ধুয়ে খাবার খেয়ে পড়তে বসা। ছ'টা থেকে আটটা অবধি ইংরেজি, আটটা থেকে ন'টা অবধি অঙ্ক, ন'টা থেকে সাড়ে ন'টা ইতিহাস। তারপর স্কুল। সাড়ে তিনটেয় স্কুল থেকে ফিরে আধঘন্টা বিশ্রাম। তারপর চারটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ভূগোল, পাঁচটা থেকে ছ'টা পর্যন্ত গ্ৰামার। এরপর আধঘন্টা হোস্টেলের সামনে হাঁটাহাঁটি। আবার সাড়ে ছ'টা থেকে সাতটা পর্যন্ত ইংরেজি কম্পোজিশন। তারপর খেয়ে এসে আটটা থেকে অনুবাদ। অনুবাদ চলবে ন'টা অবধি। ন'টা থেকে দশটা অবধি হিন্দি। দশটা থেকে এগারোটা অবধি অন্য যেকোনো বিষয়। তারপর সেদিনকার মতো যুদ্ধবিরতি।
কিন্তু টাইম-টেবিল বানানো এক কথা, আর সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। অবহেলা প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত। পড়তে বসলেই খেলার মাঠের বিভিন্ন দৃশ্য ধীরে ধীরে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো। মাঠের ওপর বিছিয়ে থাকা ওই সবুজ মখমলের মতো ঘাস, মৃদুমন্দ বাতাস, মাঠের বুকে দৌড়ে বেড়ানো ওই ফুটবলটা, কবাডির ওই মারপ্যাচ— এসব আমাকে টানতো। সেই অমোঘ আকর্ষণ উপেক্ষা করার সাধ্য আমার ছিল না। অতএব সেই মারাত্মক যুদ্ধপরিকল্পনা, সমস্ত যুদ্ধাস্ত্র, না মানে বই খাতা সব পড়ে রইতো। আর আমি সোজা খেলার মাঠে। দাদা সুযোগ পেলেই আবার আমাকে ভাষণ শুনিয়ে দিত। আমি তাঁর ছায়াকেও এড়িয়ে চলতাম, পারতপক্ষে তাঁর দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকতাম না। হোস্টেল থেকে এমনভাবে পা টিপে টিপে বেড়োতাম যাতে দাদা জানতে না পারে। জানতে পারলে আর রক্ষে থাকতো না। এমন একটা অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকাতো আমার দিকে যে তাতেই আমার প্রাণ শুকিয়ে যেত। পরিস্থিতি এমন যে মনে হতো সবসময় একটা তলোয়ার ঝুলছে আমার মাথার ওপর। এতটুকু ভুল করেছি কি একেবারে ঘ্যাচাং ফু। তা সত্ত্বেও মানুষ যেমন ঘোর বিপত্তিকালেও মোহ মায়া আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে, আমিও তেমনি খেলাধূলা নিয়েই থাকতাম।
বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। দাদা যথারীতি আবার অকৃতকার্য হয়েছে। আমি পাশ করেছি। কেবল পাশই করিনি, ক্লাসে একেবারে প্রথম হয়েছি। এখন আমার আর দাদার মধ্যে কেবল দু'টো ক্লাসের অন্তর। খুব মন চাইলো দু-একটা কথা শুনিয়ে দিই এবার — কী হলো এত ঘোর তপস্যা করে? আমাকে দেখো, কেমন মজা করে খেলেওছি আবার ক্লাসে প্রথমও হয়েছি। কিন্তু দাদা এমন গোমড়া মুখ করে বসে ছিল যে তাঁর কাঁটা ঘায়ে নুন ছিটাতে আর ইচ্ছে করলো না। বরং এমন ভাবার জন্য কিঞ্চিত লজ্জিতই বোধ করছিলাম।
নিজের ওপর বেশ গর্ব হল আমার। দাদার আতঙ্ক অনেকটা কমে এসেছিল আমার মনে। এখন স্বাধীন ভাবে যখন ইচ্ছা তখন খেলতে চলে যেতাম। আগের সেই লুকোচুরির দিন এখন অতীত।
বেশ সাহস চলে এসেছিল মনে। ঠিক করে রেখেছিলাম দাদা যদি কিছু বলতে আসে তাহলে আমিও চুপ থাকবো না, বলে দেবো “তুমি দিন-রাত পড়ে কোন পাহাড়টা ভেঙেছো শুনি, আমি তো খেলে বেড়িয়েও পরীক্ষাতে প্রথম হয়েছি।”
কিন্তু বলবার সময় কিছুতেই বলতে পারতাম না। তবে আমার আচরণে এটা বেশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে দাদাকে আমি আর বিশেষ মান্য-টান্য করছি না। আর দাদারও এটা বুঝতে বেশি সময় লাগলো না।
একদিন সারা সকালটা গুলি-ডান্ডা খেলে ঠিক খাওয়ার সময় হোস্টেলে ফিরলাম। দাদা যেন তলোয়ার নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো —‘এইবার প্রথম হয়ে মনে হচ্ছে পানিপথের যুদ্ধ জিতে নিয়েছিস। এত অহংকার! কিন্তু বাবু, বড় বড় রাজা বাদশারও অহংকার ধোপে টেকেনি তো তুমি কোথাকার বাদশা? লঙ্কেশ রাবণের হাল তো খেয়ালে আছে? নাকি তাও নেই? তাঁর চরিত্র থেকে কোন উপদেশটা শিখেছো তুমি? কেবলমাত্র একটা পরীক্ষা পাশ করে যাওয়াটা কোনো কথা নয়, আসল কথা হলো বুদ্ধির বিকাশ। যেটাই পড়ো তার অন্তর্নিহিত গূঢ় অর্থটাও বোঝা দরকার। দশানন রাবণ পুরো ভূমন্ডলের মালিক ছিল। এই শ্রেনির রাজাদের বলা হয় চক্রবর্তী। আজকাল ইংরেজদের রাজ্যবিস্তার অনেকটা হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের চক্রবর্তী বলা যায় না। বিশ্বে অনেক রাষ্ট্রই ইংরেজদের আধিপত্য স্বীকার করে না। রাবণ ছিল চক্রবর্তী সম্রাট। সংসারের সকল রাজাই তাঁকে কর দিত। বড় বড় দেবতারাও তাঁর গোলামী করতো। অগ্নিদেব, বরুনদেব পর্যন্ত তাঁর দাস ছিল। কিন্তু সেই রাবণের নাশ হলো কীভাবে? অহংকার। হ্যাঁ, অহংকারের জন্যেই তাঁর পতন হয়েছিল। মরণকালে মুখে দু ফোঁটা জল দেওয়ার জন্যও কেউ ছিল না। মানুষ যতই কুকর্ম করুক না কেন, ভুলেও অহংকার যেন না করে। অভিমান করেছে কি শেষ। তুমি তো কেবল একটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো, এতেই সিংহাসনে চড়ে বসলে এগোবার পথ বন্ধ, এই বলে দিলাম। পরীক্ষায় প্রথম তুমি নিজের মেহনতে হওনি। অন্ধের হাতে লটারি লেগে গেছে। কিন্তু লটারি একবারই লাগে, বারবার না। খেলার মাঠে কোনো কোনো দিন কেউ গোল দিয়ে দেয়, কিন্তু তাতে সে ভালো খেলোয়াড় হয়ে যায় না। ভালো খেলোয়াড় সেই যার কোনো শট ব্যর্থ যায় না। আমি ফেল করেছি বটে, কিন্তু এতে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কিছু নেই। আমার ক্লাসে আসলে তোমারও ঘাম ছুটে যাবে। অ্যালজেব্রা, জিওমেট্রি আর ইংল্যান্ডের ইতিহাস পড়তে গেলে বুঝবে কত ধানে কত চাল। রাজাদের নাম মনে রাখা অত সোজা নয়। হেনরি-ই আছে আট আটটা। কোন হেনরির সময়ে কোন কান্ড হয়েছে, এসব মনে রাখা কি অতই সহজ? সপ্তম হেনরির জায়গায় অষ্টম হেনরি লিখেছো কি একেবারে শূন্য! বোঝা গেল, একেবারে শূন্য! উনি আছেন কোন খেয়ালে! একডজনের ওপর তো জেমস্ আছে, উইলিয়াম ও আছে ডজনখানেক, আর চার্লসের তো ছড়াছড়ি। মাথা ঘুরতে শুরু করবে পড়তে বসে। আর এই বোকারা নামও খুঁজে পায়নি! সবার নাম এক! আরে বাবা, চার্লসের পরে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এইসব বসালেই তো আর অন্য নাম হলো না। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমিই তো বলে দিতাম দশ লাখ নাম। আর জিওমেট্রির কথা কী বলবো... পুরো হেঁয়ালি। ত্রিভুজ ABC এর জায়গায় ACB হয়ে গেলেই হলো...পুরো নম্বর স্বহা! এখন এদের বুঝিয়ে পারা যাবে না যে ABC আর ACB এর মধ্যে ফারাক নেই। ডাল-ভাত-রুটি খাই আর ভাত-ডাল-রুটি খাই— ব্যাপার তো সেই একই নাকি। কিন্তু এই মাষ্টারজিদের বোঝাতে যাওয়াটাই ঝকমারি। ওরা খালি বই দেখে মেলাবে! বইয়ের সব লাইন একেবারে দাড়ি কমা সহ মুখস্থ করে ফেললে সবচাইতে খুশি হয় তাঁরা।
এই রেখার ওপর একটা লম্ব টানো তাহলে লম্ব ভূমির দ্বিগুণ হবে। বলি, লম্ব টেনে লাভ টা কী হবে? দ্বিগুণ হোক, তিনগুণ হোক বা অর্ধেকই হোক, তাতে কী এমন লাভ হবে? কিন্তু পরীক্ষায় পাশ করতে গেলে এইসবই মনে রাখতে হবে। বলে দিল ‘সময়ের মূল্য’ বিষয়ে রচনা লেখ। এবার খাতা খুলে হাতে কলম নিয়ে তাতে কলম ঘষো! কে না জানে যে সময় অমূল্য! সময়ের মূল্য বুঝলে মানুষ সংযম শিখে যায়। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে শিখে যায়। এখন, এই বিষয়ে রচনা কীভাবে লিখবো? যেটা এক কথায় বলা যায় সেটা একপাতা জুড়ে লেখার কোনো মানে হয়? সময়ের মূল্য বুঝতে গিয়ে সময়ের অপব্যয়! যা বলার কম কথায় ঝটপট বলে দিলেই হয়, কিন্তু না, পাতার পর পাতা লেখো! আর খাতার পৃষ্ঠা গুলোও পুরো ফুলস্কেপ! এটা ছাত্রদের ওপর অত্যাচার নয় তো কী? আবার কত বড় রসিকতা, বলে কিনা সংক্ষেপে লেখো! ‘সময়ের মূল্য’ নিয়ে সংক্ষেপে চার পৃষ্ঠার একটা রচনা লেখো! সংক্ষেপ, তাই চার পাতা, বিস্তারিত বললে দু'শো পাতা লেখাতো। এই অধ্যাপকদের এতটুকু বুদ্ধি নেই! আবার নিজেদের অধ্যাপক বলে! তাই বলছি, আমার ক্লাসে আসলে এত্তসব ঝঞ্ঝাট পোহাতে হবে। নিচু ক্লাসে প্রথম হয়ে বাবুর মাটিতে পা-ই পড়ছে না। ভালো কথাই বলছি। হাজার বার ফেল করতে পারি কিন্তু বয়সে আমিই বড়। দুনিয়াটা তোমার থেকে একটু বেশি দেখেছি। তাই অভিজ্ঞতাও বেশি। যা বলছি শোনো, নইলে পরে পস্তাতে হবে।’
ভাগ্য ভালো যে স্কুল যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিল, তা না হলে এই ভাষণ যে কতক্ষণ চলতো ভগবান-ই জানেন। খেতে বসে পুরো বিস্বাদ লাগলো খাবার। পাশ হওয়ার পরও এইরকম তিরস্কার, ফেল করলে প্রাণটাই না নিয়ে নেয়। দাদা নিজের ক্লাসের যে ভয়ানক চিত্র আমার মনে এঁকে দিয়েছিল, আশ্চর্য এই যে আমি সেদিন স্কুল ছেড়ে পালিয়ে যাইনি। এত ভাষণ শুনেও কিন্তু লেখাপড়ায় আমার মন বসলো না। খেলার কোনো অবসর পেলেই লুফে নিতাম। পড়তাম, তবে খুব কম সময়ের জন্য। স্কুলে যেটুকু পড়া দিত, শুধু সেটুকুই কোনোমতে করতাম যাতে ক্লাসে বকা না শুনতে হয়। পরীক্ষায় প্রথম হয়ে নিজের ওপর যেটুকু বিশ্বাস জন্মেছিল, সেটুকুও বেমালুম উড়ে গেল। আবার সেই চোরের মতো জীবন কাটতে লাগলো।
পরের বছরের বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে গেল, রেজাল্টও বেড়িয়ে গেল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলেও অন্ধের হাতে আবারো লটারি লাগলো। পরিশ্রম কিছুই করিনি, তবু কীভাবে প্রথম হলাম জানিনা। নিজেও কম অবাক হইনি আমি। দাদা কিন্তু প্রাণান্তকর মেহনত করেছিল। সিলেবাসের প্রত্যেকটা শব্দ মুখস্থ করে ফেলেছিল; রাত দশটা পর্যন্ত একটা বিষয়, ভোর চারটে থেকে আর একটা, ছ'টা থেকে সাড়ে ন'টায় স্কুল যাওয়ার আগে পর্যন্ত শুধু পড়া আর পড়া। চেহারা একদম হতশ্রী হয়ে পড়েছিল দাদার। চোখের তলায় কালি, চুল উশকো-খুশকো। এত কিছু সত্ত্বেও দাদা এবারেও পাশ করতে অসমর্থ হলো। রেজাল্ট হাতে পাওয়ার পর কেঁদে ফেলেছিল বেচারা। তাঁর কান্না দেখে আমার চোখেও জল চলে আসছিল। পাশ করার খুশি অর্ধেক হয়ে গেল আমার। আমিও যদি ফেল করতাম, তাহলে হয়তো দাদার এতটা খারাপ লাগতো না। কিন্তু ভাগের লিখন বদলাবেই বা কে?
আমার আর দাদার মধ্যে একটা ক্লাসের অন্তর রয়ে গেল কেবল। কুটিল একটা চিন্তার উদয় হলো আমার মনে। দাদা যদি পরের বারও অনুত্তীর্ণ হয়, তাহলে আমি তাঁর সাথে একই ক্লাসে পড়বো, তাঁর সমকক্ষ হয়ে যাবো। তখন কোন ভিত্তিতে আমাকে শাসন করবে সে? কিন্তু প্রশ্রয় দিলাম না চিন্তাটাকে, লজ্জিত হয়ে একরকম জোড় করেই বের করে দিলাম মন থেকে। যতই হোক, আমার ভালোর জন্যই শাসন করে সে। এই যে আমি প্রতিবছর পাশ করে যাচ্ছি, তাও আবার এত ভালো নম্বর পেয়ে — এটা হয়তো তাঁরই শাসন আর উপদেশের প্রভাবে। কে বলতে পারে?
দাদা অনেকটা নরম হয়ে এসেছিল। আমাকে বকুনি দেওয়ার বা ভাষণ শোনানোর অনেক সুযোগ এসেছিল। দাদা কিন্তু সেসব কিছুই করলো না। সে হয়তো বুঝতে পারছিল যে আমাকে শাসন করার অধিকার তাঁর আর নেই, বা থাকলেও তা যৎসামান্যই। আমি কিন্তু সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলাম। দাদার এই শিথিলতার অনুচিত লাভ নিতে শুরু করলাম। আমার মনে এমন একটা ধারণা জন্মালো যে আমি তো পাশ করেই যাবো, পড়ি কি না পড়ি— তাতে কিছু যায় আসে না। ভাগ্যটা আমার অতি সুপ্রসন্ন। এতদিন দাদার ভয়ে যেটুকু পড়ছিলাম, সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেল। ঘুড়ি ওড়ানোর নতুন নতুন শখ হয়েছে আমার। সর্বক্ষণ ঘুড়ি উড়িয়ে বেড়াই। দাদা আমাকে শাসন না করলেও আমি কিন্তু তাঁর নজর বাঁচিয়েই চলি। ঘুড়ি তৈরি করা, দড়িতে মাঞ্জা দেওয়া, ঘুড়ি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা — সবই প্রায় গোপনে চলতে লাগলো।
একদিন সন্ধ্যায়, হোস্টেল থেকে একটু দূরে, একটা কেটে যাওয়া ঘুড়ি ধরার জন্য দৌড়োচ্ছিলাম। দৃষ্টি পথের ওপর ছিল না, ছিল আকাশের দিকে। আর মন ছিল আকাশে ভেসে যাওয়া ওই ঘুড়িটার দিকে। বাতাসের দোলায় ভাসতে ভাসতে চলেছে নিজের পতনের উদ্দেশ্যে, যেন কোনো আত্মা স্বর্গ থেকে বেড়িয়ে নতুন কোনো শরীরের খোঁজে বেড়িয়েছে। শুধু আমি না, ছেলেদের পুরো একটা দল দৌড়োচ্ছিল। হাতে তাদের বাঁশের লাঠি, তাই দিয়ে খুঁচিয়ে নামাবে ঘুড়িটাকে। সবাই দৌড়োচ্ছি, কারোরই সামনে পেছনে কোনো হুঁশ নেই। আমরা সবাই যেন ওই ঘুড়িটার সাথেই আকাশে উড়ছি, যেখানে সবটাই সমতল। সেখানে না আছে কোনো মোটরগাড়ি, না আছে কোনো ট্রাম।
দৌড়োতে দৌড়তে হঠাৎ একজনের সঙ্গে আমার ধাক্কা লাগলো। চেয়ে দেখি দাদা। বাজার থেকে ফিরছিল বোধ হয়। সে আমার হাত ধরে ফেললো। তারপর উগ্ৰস্বরে বললো —‘এই রাস্তার ছেলেদের সঙ্গে একটা ঘুড়ির জন্য দৌড়োতে লজ্জা করে না! তোর এতটুকুও খেয়াল আছে যে তুই আর ছোট ক্লাসে পড়িস না, অষ্টম শ্রেনিতে চলে এসেছিস। পরের বছর আমার ক্লাসে চলে আসবি। মানুষের তো নিজের পজিশনের খেয়াল রাখা উচিত! একটা সময় ছিল যখন অষ্টম শ্রেনি পাশ করেই লোকে তহশিলদার হয়ে যেত। কত অষ্টম শ্রেনি পাশ করা লোক আজ নেতা হয়েছে, খবরের কাগজ বা পত্রিকার সম্পাদক হয়েছে। আর তুই? তুই সেই ক্লাসে পড়াকালীন রাস্তার ছেলে-ছোকরাদের সাথে সামান্য একটা ঘুড়ির জন্য দৌড় লাগিয়েছিস! ছিঃ!
আমার দুঃখ হয় তোর এই নির্বুদ্ধিতায়। যদি তুই ভেবে থাকিস যে আমার চেয়ে মাত্র এক ক্লাস নিচে পড়িস তুই, তাই আমি আর কিছু বলতে পারবো না তোকে, তাহলে সেটা তোর ভুল। আমি তোর চাইতে পাঁচ বছরের বড়। তুই হয়তো আগামী বছর আমার ক্লাসে চলেও আসবি, কিন্তু তার সত্ত্বেও তোর আর আমার মধ্যে পাঁচ বছরের ফারাক টা থেকেই যাবে।
তুই তো কোন ছাড়, কোনো দেব-দেবীও এই ফারাকটা মুছে দিতে পারবে না। দুনিয়াদারির যে অভিজ্ঞতা আমার আছে, তুই তাকে টক্কর দিতে পারবি না, সে যতই তুই এম.এ, এম.ফিল ডিগ্ৰি অর্জন করে ফেলিস না কেন। বোধ বুদ্ধি কেবল ডিগ্ৰি থেকেই আসে না। আমাদের ঠাকুমা দিদিমা-রা ক'টা ক্লাস পাশ করেছে? আমাদের ঠাকুরদাও পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শ্রেনির বেশি পড়েনি। তাই বলে আমরা শ'খানেক ডিগ্ৰি অর্জন করি না কেন, আমাদের শাসন করবার অধিকার কিন্তু তাঁদের রয়েই যাবে। কেবল এই জন্য নয় যে তাঁরা আমাদের গুরুজন, আসল কারণ টা হলো তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের চেয়ে বেশি, ঢের ঢের বেশি। আমেরিকাতে কী ধরনের শাসন ব্যবস্থা চলে, অষ্টম হেনরি কতগুলো বিবাহ করেছে অথবা আকাশে কতগুলো নক্ষত্র আছে — এসব তাঁরা না-ই জানতে পারে, কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে যেখানে তাঁরা আমার বা তোর চেয়েও অনেক বেশি খবর রাখেন।
আজ যদি আমি কঠিন কোনো অসুখে সজ্জাশায়ী হয়ে পড়ি তাহলে তোর তো হাত-পা ফুলে যাবে। কূলকিনারাই পাবি না কোনো। বাড়িতে খবর পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কিন্তু তোর জায়গায় যদি বাবা অথবা ঠাকুরদা থাকেন, তাহলে তাঁরা কিন্তু ঘাবড়াবে না। কাউকে খবর পাঠানোরও প্রয়োজন পড়বে না তাঁদের। রোগ-বালাই তাও তো অনেক বড় বিষয়, তুই-আমি তো এটাও জানি না যে বাড়ির খরচ কীভাবে চলে, খাবারই বা কোন পথে আসে? বাড়ি থেকে যা টাকা আসে, মাসের কুড়ি-বাইশ তারিখের মধ্যেই তার সবটা খরচ হয়ে যায়। তারপর? তারপর এক-একটা পয়সার জন্যে ধার করতে হয়। একবেলার খাওয়া বন্ধ হওয়ার যোগাড় হয়; ধোপা, নাপিত — এদের সাথে চোখাচোখি হলেই পালিয়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু আজকে আমি তুই যতটা খরচা করছি, তার অর্ধেকেই আমাদের বাবা,ঠাকুরদা তাঁদের জীবনের বড় একটা অংশ কাটিয়ে দিয়েছেন। সুনাম আর ইজ্জতের সাথেই কাটিয়েছেন। সেইসঙ্গে কুটুম্বতাও বজায় রেখে গেছেন বরাবর। আমাদের হেডমাস্টার মশাইকেই দ্যাখ, এম.এ ডিগ্ৰি আছে, তাও আবার এখানকার এম.এ না, অক্সফোর্ডের। একহাজার টাকা বেতন পান, একহাজার! তাও তাঁর ঘর-দোর কে সামলান? তাঁর বৃদ্ধা মা। এইখানে হেডমাস্টারের অক্সফোর্ডের ডিগ্ৰি পুরো বেকার। প্রথম প্রথম তো নিজেই সামলাতেন। কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারতেন না, ধার-দেনা করে বসতেন কখনো কখনো। যেদিন থেকে তাঁর মা এসে সমস্ত দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিলেন, সেদিন থেকে যেন তাঁর ঘরে লক্ষ্মীর বাস হলো। তাই বলছি ভাইজান, এই অহংকার ঝেড়ে ফেলো মন থেকে যে তুমি আমার চেয়ে মাত্র এক ক্লাস নিচে পড়ো। আর নিজেকে একেবারে স্বাধীন ভাবাও বন্ধ করো। আমার চোখ এড়িয়ে কিছুতেই বিপথে যেতে পারবে না তুমি। যদি আমার কথা না মানো তাহলে থাপ্পর প্রয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করবো না এই বলে দিলাম। বুঝতে পারছি কথাগুলো বিষের মতো লাগছে...’
দাদার এই অভূতপূর্ব যুক্তির সামনে আমি পুরো নতমস্তক হয়ে গেলাম। আমি কত ছোট, সেটা আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। আর সেইসঙ্গে মনে দাদার প্রতি শ্রদ্ধা জেগে উঠলো। সজল নেত্রে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, “না না বিষ লাগছে না। আমাকে শাসন করার পূর্ণ অধিকার তোমার আছে।”
দাদা আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বললো, “আমি ঘুড়ি ওড়াতে বারণ করছি না। আমারও মন চায়, কিন্তু কী করবো, আমিই যদি মজা করি তাহলে তোকে সঠিক পথ কে দেখাবে? এটা তো আমারই দায়িত্ব।”
ঠিক এই মুহূর্তে, দৈবের প্রভাবে কিনা কে জানে, আর একটা কাটা ঘুড়ি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। ঘুড়িটার সুতো নিচে ঝুলছিল। ছেলেদের একটা দল সুতোটা ধরার জন্য দৌড়ে আসছিল। দাদার উচ্চতা খুব একটা কম নয়, সে লাফিয়ে ধরে ফেললো সুতোটা। তারপর দৌড় লাগালো হোস্টেলের দিকে। কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব থেকে আমিও তাঁর পিছুপিছু দৌড় লাগালাম।
মুন্সি প্রেমচাঁদ (১৮৮০-১৯৩৬): আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের একজন দিকপাল লেখক মুন্সি প্রেমচাঁদ। তাঁর আসল নাম ধনপৎ রাই শ্রীবাস্তব। মূলত তাঁর হাত ধরেই হিন্দি এবং উর্দু সাহিত্যে সামাজিক কাহিনীর ধারার সূচনা হয়। ১৮৮০ সালের ৩১ শে জুলাই তাঁর জন্ম হয় বেনারসের লমহি গ্ৰামে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। ভারতীয় সমাজ এবং জীবন কে অনেক কাছ থেকে দেখেছেন তিনি এবং সেই গভীর পর্যবেক্ষণই ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। তাঁর সমস্ত রচনায় ভারতীয় সমাজের রূপ-রস-গন্ধ পূর্ণ মাত্রায় রয়েছে। ছোটগল্পের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি উপন্যাস তিনি রচনা করেছেন। ‘গোদান’, ‘কর্মভূমি’, ‘রঙ্গভূমি’, ‘বরদান’, ‘নির্মলা’ প্রভৃতি অন্যতম।
এবং খোঁজ | বর্ষ ৫, শারদ সংখ্যা | ১৪৩০-৩১ বঙ্গাব্দ